Image description

বিশ্বের সরকার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পঙ্গু করে দিতে সক্ষম, এমন উচ্চ প্রযুক্তির ফ্রন্টিয়ার এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) খুব দ্রুতই বাস্তব রূপ নিতে যাচ্ছে। এ বিষয়ে এই সপ্তাহে একটি বিরল যৌথ সতর্কবার্তা জারি করেছে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী গোয়েন্দা জোট ফাইভ আইজ। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চীন ও জাপানের তৈরি এআই মডেলগুলোর দ্রুত উত্থানই মূলত তাদের এই জরুরি অবস্থা ও ভীতির মূল কারণ।

বর্তমানে অ্যানথ্রোপিক-এর তৈরি ‘মিথোস’ মডেলটিকে বিশ্বের সবচেয়ে মারাত্মক সাইবার হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপেনএআই-ও এর খুব কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পূর্বাভাসের চেয়েও অনেক দ্রুত এবং অত্যন্ত কম খরচে চীন ও জাপান এই প্রযুক্তির শীর্ষ স্তরের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউ জিল্যান্ডকে নিয়ে গঠিত বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এই গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক সতর্ক করে বলেছে, ‘এই সময়রেখা বছরের নয়, বড়জোর কয়েক মাসের’।

ক্ষয়িষ্ণু মার্কিন আধিপত্য ও তিনটি বড় আঘাত

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্য অ্যাক্সিওস শো-তে মার্ক কাপুটোকে বলেছিলেন, এআই প্রযুক্তিতে ‘আমরা চীনের চেয়ে অনেক এগিয়ে আছি’। কিন্তু মার্কিন নেতা ও ব্যবসায়ীরা এত দিন যে আধিপত্যের ওপর ভরসা রাখছিলেন, তা এখন দ্রুত ক্ষুণ্ন হচ্ছে। তিনটি নতুন বড় ধাক্কায় এটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

আমেরিকার প্রযুক্তিগত অগ্রগতির চারপাশে দেয়াল তুলে রাখা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। টোকিওভিত্তিক প্রতিষ্ঠান সাকানা এআই ‘ফুগু আল্ট্রা’ নামের একটি অর্কেস্ট্রেটর চালু করেছে। তাদের দাবি, এটি রফতানি নিয়ন্ত্রণের কোনও ঝুঁকি ছাড়াই সর্বাধুনিক ফ্রন্টিয়ার সুবিধা দিতে সক্ষম। মার্কিন ল্যাবগুলোর তৈরি উন্মুক্ত এআই মডেলগুলোকে নিজেদের অবকাঠামো হিসেবে ব্যবহার করে তারা ‘মিথোস’ সমমানের পারফরম্যান্স অর্জন করতে পারে।

আমেরিকার সেরা কাজগুলো চুরি করে মার্কিন আধিপত্যে থাবা বসাচ্ছে চীন। গত ফেব্রুয়ারিতে অ্যানথ্রোপিক অভিযোগ করেছে যে, ডিপসিক, মিনিম্যাক্স এবং মুনশট নামের চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো ‘ডেস্টিলেশন’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অবৈধভাবে তাদের নিজস্ব মডেলকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। তারা হাজার হাজার অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে ক্লদ-এর সঙ্গে লাখ লাখ বার তথ্য আদান-প্রদান করেছে, যা আমেরিকার বছরের পর বছর ধরে করা ব্যয়বহুল গবেষণার একটি সস্তা শর্টকাট সংস্করণ।

ফ্রন্টিয়ার মডেল তৈরি করা আসলেই কতটা ঝুঁকিমুক্ত, তা নিয়ে এখন খোদ মার্কিন ল্যাবগুলোই ভাবনায় পড়েছে। দুই সপ্তাহ আগে মার্কিন বাণিজ্য বিভাগ অ্যানথ্রোপিকের ‘ফেবল ৫’ এবং ‘মিথোস ৫’ মডেলের ওপর রফতানি নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এর ফলে কোম্পানিটি সবার জন্য এর অ্যাক্সেস বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। সরকারি হস্তক্ষেপের ভয়ে শীর্ষস্থানীয় মার্কিন এআই কোম্পানিগুলো এখন তাদের সর্বোচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন মডেলগুলো প্রদর্শন করতে ভয় পাচ্ছে।

পর্দার অন্তরালে চীনের দ্রুত অগ্রগতি

চীনের ওপেন সোর্স মডেলগুলো খুব দ্রুত মাঠ নিজেদের দখলে নিচ্ছে। এর মধ্যে ‘জেড.এআই’-এর তৈরি ‘জিএলএম-৫.২’  মডেলটি বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। আর্টিফিশিয়াল অ্যানালাইসিস নামের একটি বেঞ্চমার্কিং কোম্পানির তৈরি লিডারবোর্ডে এই চীনা মডেলটিকে ওপেনএআই-এর ‘জিপিটি-৫.৫’-এর সমকক্ষে স্থান দেওয়া হয়েছে, অথচ এটি চালাতে খরচ হয় মাত্র পাঁচ ভাগের এক ভাগ। কোডিংয়ের ক্ষেত্রে অ্যারেনা’স ওয়েব ডেভেলপমেন্ট র‍্যাংকিং অনুযায়ী, এই চীনা মডেলটির অবস্থান ‘ফেবল’-এর পরেই দ্বিতীয়। অর্থাৎ, এটিই বর্তমানে ব্যবহারযোগ্য সেরা পারফর্মিং মডেল।

ফেসবুকের সাবেক প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা অ্যালেক্স স্ট্যামোস বলেন, এটি খুবই সম্ভব যে চীনাদের কাছে গোপনে এমন কিছু প্রযুক্তি রয়েছে যা আসলেই অসাধারণ। তিনি মন্তব্য করেন, আমরা আমেরিকান বলেই যে আমাদের কাছে সেরা জিনিস থাকবে, এমনটা ভাবা অহংকার এবং বোকামি।

তিনি আরও বলেন,  আমেরিকানরা যেভাবে নিজেদের মধ্যে লড়াই করছে এবং একে অপরের পথ বন্ধ করছে, তা দেখে চীনা সামরিক হ্যাকাররা সম্ভবত এখন হিলহিল করে হাসছে।

ইউরোপের এআই ফেরারি

আমেরিকার এই আধিপত্যের লড়াই কেবল এশিয়ায় সীমাবদ্ধ নয়, ইউরোপেও ছড়িয়ে পড়েছে। ইতালির মিলানভিত্তিক এআই কোম্পানি ‘ডমিন’ গত সপ্তাহে ঘোষণা করেছে যে, তাদের ‘ইউরোপা’ প্রজেক্টটি একটি ফ্রন্টিয়ার ওপেন সোর্স এআই মডেল, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সবকটি (২৪টি) সরকারি ভাষাকে সমর্থন করবে। ডমিন (যার পূর্বনাম ছিল আইজিনিয়াস এবং যাকে এআই-এর ফেরারি বলা হতো) চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়া-র সঙ্গে যৌথভাবে ‘কলোসিয়াম’ তৈরি করেছে, যা ইউরোপের বৃহত্তম এআই সুপারকম্পিউটার হিসেবে পরিচিত।

কোন পথে গড়াচ্ছে এআই যুদ্ধ

ক্রমবর্ধমান সাইবার ঝুঁকি মোকাবিলায় ফাইভ আইজ জোট পুরো সমাজের একটি সমন্বিত সাড়ার আহ্বান জানিয়েছে। জোটের বুলেটিনে বলা হয়েছে, করপোরেট বোর্ড ও নির্বাহীদের নিশ্চিত করতে হবে যেন যেকোনো চাপের মুখেও তাদের সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা অটুট থাকে। নেতাদের কেবল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকলেই চলবে না, বরং আসল সংকটের সময় সেই নিয়ন্ত্রণগুলো সঠিকভাবে কাজ করবে কি না, তা নিয়ে আত্মবিশ্বাসী হতে হবে। এর জন্য প্রথাগত আপস বা বাণিজ্যিক সুবিধা-অসুবিধার হিসাব নতুন করে মূল্যায়ন করতে হবে এবং এআই-কে কেবল কাজের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য নয়, বরং প্রতিরক্ষাকে শক্তিশালী করার জন্য সচেতনভাবে ব্যবহার করতে হবে।

এআই প্রযুক্তিতে আমেরিকার আধিপত্য এখনও বাস্তব, তবে তা ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হচ্ছে। এই আধিপত্য সুরক্ষিত রাখার জন্য নেওয়া প্রতিটি পদক্ষেপ উল্টো প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য নতুন বিকল্প পথ খোঁজার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আর এই সবকিছুর মধ্যেই ফাইভ আইজ-কে আতঙ্কে রাখা সর্বাধুনিক সক্ষমতার প্রযুক্তিগুলো ইতোমধ্যে উন্মুক্ত হয়ে গেছে, যা ডাউনলোডযোগ্য এবং একে আর কোনোভাবেই ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।

সূত্র: অ্যাক্সিওস