কোনো সমীক্ষা ছাড়া অভ্যন্তরীণ রুটে বিমান পরিচালনার ক্ষেত্র বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে সরকারি সিদ্ধান্তের সুফল ঘরে তোলা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ অবকাঠামো ও যাত্রী পরিবহন— এ দুটির সমন্বয় করা ছাড়াই এমন সিদ্ধান্ত সরকারের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে, রয়েছে লোকসানের ঝুঁকিও।
অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, দেশের সাতটি অব্যবহৃত বিমানবন্দরের দুয়েকটি বিমানবন্দর চালু লাভজনক হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও বাকিগুলোতে লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে। সড়ক যোগাযোগ উন্নত হওয়ায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সঙ্গে যোগাযোগ আগের তুলনায় সহজ হয়েছে।
পদ্মা সেতু চালুর পর দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে বাস সার্ভিস উন্নত হয়েছে এবং দ্রুততম সময়ে যাত্রীরা গন্তব্যে পৌঁছে যাচ্ছে। সেসব এলাকায় বিমানবন্দরগুলো চালু কতটা লাভজনক হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সূত্র জানায়, বগুড়ায় বিমানবন্দর তৈরির সমীক্ষার জন্য পরামর্শক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। অন্যগুলোর ক্ষেত্রে এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ এখনো নেওয়া হয়নি। তার আগেই প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের তোড়জোড় শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঈশ্বরদী বিমানবন্দর চালু হলে এটি লাভজনক হতে পারে। কারণ এখানে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে প্রচুর মানুষ আসা-যাওয়া করে থাকে।
ইতোমধ্যে বগুড়ায় আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) বোর্ড সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পেয়েছে। পাশাপাশি ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দরও পুনরায় চালুর উদ্যোগ জোরদার করা হয়েছে। দেশের অব্যবহৃত সাতটি বিমানবন্দর পর্যায়ক্রমে চালুর মহাপরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। বাংলাদেশের অ্যাভিয়েশন নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করা, আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং বাণিজ্য সহজ করার লক্ষ্যে রাজশাহী, কক্সবাজার, যশোর ও সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক গেটওয়ে হিসেবে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।
অগ্রাধিকারে বগুড়া
বগুড়ায় ২০৫০ একর জায়গা নিয়ে তৈরি হচ্ছে বিশাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। প্রকল্পের ডিজাইন ও কারিগরি সমীক্ষার জন্য পরামর্শক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। পরামর্শক নিয়োগের পর ছয় মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ নকশা ও ডিপিপি প্রস্তুতের লক্ষ্য রয়েছে। এজন্য বুয়েট ও বিমান বাহিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টকে ফিজিবিলিটি স্টাডির জন্য প্রপোজাল দিতে বলা হয়েছে। এর মধ্যে যাদের প্রপোজাল অধিকতর গ্রহণযোগ্য হবে, তাদেরই কাজটি করার জন্য মনোনীত করা হবে।
এ বিষয়ে সিভিল অ্যাভিয়েশনের প্রকৌশলী আমিনুল হাসিব আমার দেশকে জানান, বগুড়া হবে আধুনিক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এতে বোয়িং ৭৩৭-৮০০ ধরনের উড়োজাহাজসহ দেশি-বিদেশি যাত্রী ও কার্গো বিমান সহজে অবতরণ করতে পারবে। প্রকল্পে চারতলা আধুনিক টার্মিনাল, ফায়ার ব্রিগেড, কন্ট্রোল টাওয়ার, কার্গো কমপ্লেক্স এবং আইএলএস ক্যাট-৩বি প্রযুক্তি যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা ঘন কুয়াশাতেও নিরাপদ উড্ডয়ন-অবতরণ নিশ্চিত করবে।
তিনি উল্লেখ করেন, বগুড়া বিমানবন্দরে দুটি রানওয়ে করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এজন্য জমি বেশি অধিগ্রহণ করতে হবে। প্রথমে একটি রানওয়ে চালু করা হবে। পরবর্তী সময়ে চাহিদা অনুসারে দ্বিতীয় রানওয়েটি চালু হবে। বিমানবন্দরটি ২০২৮ সালের মার্চে চালু হতে পারে।
অপর এক সূত্র জানায়, প্রকল্প বাস্তবায়নে ৪০০-৬০০ একর অতিরিক্ত জমি অধিগ্রহণ প্রয়োজন হতে পারে। বিমান বাহিনীর সঙ্গে সমঝোতা স্মারক নবায়ন এবং রানওয়ে সেফটি এরিয়া উন্নয়নও প্রক্রিয়াধীন। সব মিলিয়ে প্রকল্প ব্যয় দাঁড়াতে পারে তিন হাজার কোটি টাকার বেশি।
এ বিষয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম (রীতা) আমার দেশকে বলেন, পরিত্যক্ত বিমানবন্দরগুলো চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। দেশের স্বার্থ ও যাত্রীসেবা বিবেচনায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে এগুলোর কাজ শুরু হবে।
তিনি আরো বলেন, বগুড়ায় একটি ফ্লাইং একাডেমি করা হচ্ছে, যেখানে সাধারণ মানুষের সন্তানরাও পাইলট হওয়ার সুযোগ পাবে। তাদের পড়াশোনার খরচও বহন করবে বিমান মন্ত্রণালয়।
জানতে চাইলে বিমান প্রতিমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, বহির্বিশ্বের সঙ্গে আকাশ যোগাযোগব্যবস্থার প্রসারে চারটি নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চালু করা হবে। এটি বর্তমান সরকারের অঙ্গীকার । আমরা সে লক্ষ্যে কাজ করছি।
অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ও বেসরকারি বিমান সংস্থা নভোএয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান আমার দেশকে বলেন, বগুড়া স্টলপোর্ট হতে পারে। এমন একটি বিশেষায়িত বিমানবন্দর, যা খুব ছোট রানওয়ে ব্যবহার করে স্বল্প দূরত্বের ১৯-২৫ সিটের উড়োজাহাজ ওঠানামা করে থাকে। এগুলো পলিটিক্যাল কমিটমেন্ট। এ সরকার করছে, আরেক সরকার এসে বন্ধ করে দেবে। তাছাড়া যে বিমানবন্দরগুলো চালু রয়েছে, সেগুলো সরকার নানা প্রতিকূলতার কারণে চালাতে পারছে না। আবার বন্ধ বিমানবন্দর নতুন করে চালু করা হলে লাভ কী।
অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ওয়াহিদুল আলম আমার দেশকে বলেন, বাংলাদেশের অ্যাভিয়েশন নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করা, আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং বাণিজ্য সহজ করার লক্ষ্যে রাজশাহী, কক্সবাজার, যশোর ও সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক গেটওয়ে হিসেবে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। তবে তা কতটা যুক্তিযুক্ত তা প্রথমে চিন্তা করতে হবে। ঈশ্বরদী বিমানবন্দরটি চালু হলে এটি লাভজনক হবে। কারণ এখানে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রর কারণে প্রচুর মানুষ আসা-যাওয়া করে। তবে কক্সবাজার লাভজনক হবে না। কারণ এখানে বিদেশি পর্যটকরা আসবে না। বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য যে বিনোদনমূলক ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, তা এখানে নেই। বাকি রুটগুলোও আমার মতে লাভজনক হবে না।
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) কামরুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, যত বেশি বিমানবন্দর হবে, ততই দেশের জন্য লাভ। বিজনেস হাব হিসেবে গড়ে উঠবে। যাত্রীরা পছন্দ ও সময় অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিয়ে নির্দিষ্ট গন্তব্যে যেতে পারবেন। আন্তর্জাতিকভাবেও কানেকটেড হওয়ার সুযোগ থাকবে। আসল হলো পরিকল্পনা ও ফ্লিট প্ল্যানিং।
ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দরের দীর্ঘ অচলাবস্থা
ঠাকুরগাঁও সদরের শিবগঞ্জে ১৯৪০ সালে ৫৫০ একর জমির ওপর বিমানবন্দরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের সময় এটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৯৭৭ সালে রানওয়ে সংস্কার হলেও যাত্রী সংকটে ১৯৮০ সালে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। পরে সীমিত সংস্কার হলেও নিয়মিত ফ্লাইট চালু হয়নি। বর্তমানে অবকাঠামো জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। টার্মিনাল ও কন্ট্রোল টাওয়ার প্রায় অকার্যকর, নেই অগ্নিনির্বাপণ ও বিদ্যুৎব্যবস্থা। ছয় হাজার ফুট রানওয়ে থাকলেও আধুনিক লাইটিং ও নেভিগেশন সুবিধা নেই।
বেবিচকের এক উপস্থাপনায় জানানো হয়, বিমানবন্দর আধুনিকায়নে প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় লাগবে তিন বছর। প্রথম ধাপে ৫৮২ একর জমি অধিগ্রহণ, রানওয়ে সম্প্রসারণ, নতুন টার্মিনাল, কন্ট্রোল টাওয়ার ও নিরাপত্তা অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে রানওয়ে ৯ হাজার ফুটে উন্নীত করা হবে। গত ২০ মে মন্ত্রণালয় ও বেবিচকের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর সরেজমিন পরিদর্শন করে।
অন্য বিমানবন্দরও তালিকায়
বেবিচকের বোর্ডসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, লালমনিরহাট, ঈশ্বরদী, মৌলভীবাজারের শমশেরনগর, বাগেরহাটের খানজাহান আলী ও পটুয়াখালীসহ সাতটি অব্যবহৃত বিমানবন্দর ধাপে ধাপে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর আগে সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে কোন বিমানবন্দর আগে চালু হবে, তা নির্ধারণ করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব বিমানবন্দর চালু হলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে কর্মসংস্থান বাড়বে, কৃষি ও পর্যটন খাতে গতি আসবে এবং আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসবে। তবে দীর্ঘমেয়াদি টেকসই পরিকল্পনা, যাত্রী চাহিদা ও বাণিজ্যিক কার্যকারিতা নিশ্চিত না হলে প্রকল্পগুলো ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক আমার দেশকে বলেন, অব্যবহৃত বিমানবন্দরগুলো পর্যায়ক্রমে চালুর জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সম্ভাব্যতা বিবেচনা করে কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে।
বর্তমানে দেশে তিনটি আন্তর্জাতিক ও পাঁচটি অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর নিয়মিত কার্যক্রম চালাচ্ছে। কক্সবাজার বিমানবন্দরকে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মর্যাদা দেওয়া হলেও সেটি এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি।