Image description

ছোট্ট শেহজাদী। মুখ থেকে গড়িয়ে দুধে নাক-গা ভরে যাচ্ছে। অঝোরে কাঁদলেও বেখেয়াল মা তাবাসসুম আক্তার। তিনি সন্তানের মুখে ফিডার চেপে বসে আছেন। দৃশ্যটি ফেসবুক ভিডিওর। পোস্টদাতা খোদ তাবাসসুম আক্তার। ভিডিও ২৬ হাজারের বেশি মানুষ দেখেছেন; কয়েকশ’ ফেসবুক ব্যবহারকারী মন্তব্য ও পোস্টটি শেয়ার করেছেন।

স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসে–এই মা কি মানসিক ভারসাম্যহীন? তাঁর আইডিতে এমন ভিডিও কীভাবে এল? স্ট্রিম যোগাযোগ করলে তাবাসসুম জানান, পরিবার নিয়ে তিনি রাজধানীতে বসবাস করছেন। নিজেই ভিডিওটি করে ফেসবুকে দিয়েছেন। নিয়মিত মেয়েকে নিয়ে ভিডিও দেন, টাকা আসে। বিভিন্ন সময়ে আসা ডলারের স্ক্রিনশটও তাবাসসুম আইডিতে দিয়েছেন।

শুধু তাবাসসুম নন, সামাজিক মাধ্যমে ‘বিকারগ্রস্ত’ এমন মানুষ দিনকে দিন বাড়ছে। ভাইরাল হয়ে সামাজিক মাধ্যম থেকে আয়ের জন্য তাঁরা ভিডিওর নামে শিশুদের নির্যাতন করছেন। এজন্য কখনো শিশুর মুখে আঙুল কিংবা ফিডার ঢুকিয়ে জোর করে খাবার দিচ্ছেন। এমন পোশাক পরিয়ে গোসল করাচ্ছেন, যাতে অবয়র স্পষ্ট হয়। আবার এমনও ঘটছে, ইনজেকশনে শিশুর শরীর থেকে ফিনকি দিয়ে বের হওয়ার রক্তের ভিডিও পোস্ট করে ভিউ কামাচ্ছেন।

এক প্রশ্নের জবাবে তাবাসসুম আক্তার স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমার বেবিকে নিয়ে ভিডিও লাখ লাখ ভিউ হয়। মানুষ কমেন্ট করে, আমি নাকি আমার বেবিকে অত্যাচার করি। এসব বাজে কথা। আসলে আমার আইডি ভাইরাল, অনেক ভিউ হয়। লোকজন হিংসা থেকে এসব বাজে কমেন্ট করেন।’

আইন আছে, বাস্তবায়ন নেই

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া স্ট্রিমকে বলেছেন, ‘এই ধরনের কন্টেন্টের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টরা মানহানি, তথ্যের অপ্রোয়োগ, প্রাইভেসি লঙ্ঘন এবং মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করছেন। আইনে এমন কন্টেন্টের ক্ষেত্রে ২ থেকে সর্বোচ্চ ৫ বছরের শাস্তির বিধান রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘এসব কন্টেন্ট প্রথমত রাইট টু প্রাইভেসির ধারণা সিরিয়াসলি লঙ্ঘন করে। শিশুদের বেলায় কনসেন্টের প্রশ্ন আসে। শিশু কনসেন্ট দিলেও, তা গ্রহণযোগ্য হবে না। কারণ, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা শিশুর নেই। ফলে এগুলো পরিবারের সদস্য করল নাকি অন্য কেউ, তাতে কিছু যায় আসে না।’

দেশে আইন থাকলেও প্রয়োগ নেই উল্লেখ করে জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, ‘বিটিআরসিসহ বিভিন্ন সংস্থা এসব নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। কিন্তু সংস্থাগুলো শুধু রাজনৈতিক স্বার্থে কাজ করে। সাধারণ মানুষের কল্যাণ নিয়ে ভাবাও কঠিন।’ আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘সরকার কম দামে মানুষের হাতে ফোন দিয়েছে। কিন্তু ব্যবহার শেখায়নি। সিটিজেনের জায়গায় নেটিজেন তৈরির কোনো প্রকল্প দেশে কোনো সরকার নেয়নি। এমন চেষ্টাও খুব একটি নেই।’

ভিউয়ের জন্য প্রতিবন্ধী ছেলের আপত্তিকর ভিডিও

চেহারা বোকাসোকা, বয়স বড়জোর ১৪। কথা বলতে পারে না মোহাম্মদ জোবায়ের। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন এই শিশুকেও ভিউ ব্যবসার জন্য ব্যবহারের করা হয়েছে। কাজটি করছেন স্বয়ং তার বাবা মোহাম্মদ পলক ইসলাম ওরফে আজাদ। নিজের পেজে এখন পর্যন্ত শতাধিক ভিডিও পোস্ট করেছেন পলক, যেগুলোর অধিকাংশ জোবায়েরকে নিয়ে। এসব ভিডিওতে জোবায়েরকে আপত্তিকরভাবে উপস্থাপন থেকে শারীরিক নির্যাতন পর্যন্ত করেছেন তিনি।

গত ২৮ এপ্রিল জোবায়েরের সঙ্গে একটি ভিডিও আপলোড করেন পলক। দেড় লাখের বেশি মানুষ এটি দেখেছেন। ভিডিওটিতে ছেলেকে তিনি এমনভাবে চুমু দিচ্ছেন, যা সাধারণত প্রাপ্তবয়স্ক যুগলের ক্ষেত্রে খাটে। গোসল থেকে শুরু করে জোবায়েরের বিশেষ অঙ্গ স্পষ্ট হয়– এমন ভিডিও আপলোডেও দ্বিধা করেননি পলক। এসব ভিডিওতে অনেকে তাঁকে গালাগাল করেছেন; বাবা হিসেবে জানিয়েছেন ধিক্কার।

এই ব্যাপারে পলকের সঙ্গে যোগাযোগ করে মন্তব্য পায়নি স্ট্রিম। তবে বিভিন্ন সময়ে পোস্ট করা ভিডিওতে পলক জানিয়েছেন, কারও কমেন্ট গায়ে মাখেন না তিনি, ‘আমার ছেলেকে আমি আদর করব। যেভাবে খুশি সেভাবে করব। আমার ছেলেকে আমারই পালতে হবে।’

শিশু অধিকার নিয়ে সোচ্চার ‘শিশুরাই সব’– এর আহ্বায়ক লায়লা খন্দকার স্ট্রিমকে বলেন, মা-বাবা চাইলেই শিশুসন্তানের সঙ্গে যেমন খুশি তেমন আচরণ করতে পারেন না। ইদানীং ফেসবুকে বা কন্টেন্টের নামে শিশু নির্যাতনের ভয়ংকর প্রবণতা দেখা দিয়েছে। অনেক সময় মা-বাবাও করছেন। কারণ, মা-বাবা ধরেই নেন– শিশুসন্তান তাঁদের নিজস্ব সম্পদ। কিন্তু শিশুর তো অধিকার আছে। আইনের প্রয়োগের অভাবে শিশু নির্যাতন বেড়েই চলেছে।

ভাইরালের নেশা

গত ৮ মে নাটোরের লালপুরের গ্রিন ভ্যালি পার্কে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের দুই বিদেশি কর্মকর্তাকে হেনস্তার ঘটনা ঘটে। পার্কে সেদিন ‘টিকটক বন্ধু মেলা-২০২৬’ নামে অনুষ্ঠান চলছিল। দুই বিদেশি পার্কে বেড়াতে এলে কয়েক টিকটকার পথরোধ করে ইংরেজিতে অশালীন মন্তব্য করেন। এই ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ওই কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের নামে মামলা হয়। পুলিশ প্রধান আসামি আকাশকে গ্রেপ্তার করে।

শুধু মানুষ নন, ‘ভাইরাল নেশাগ্রস্তদের’ কাছ থেকে পশুপাখিও রেহাই পাচ্ছে না। স্ট্রিম অনুসন্ধানে ফেসবুকের অন্তত ৫০টি আইডি ও পেইজ পেয়েছে, যেখানে কন্টেন্টের প্রধান উপজীব্য হয়রানি-নির্যাতন। হোক তা মানুষ কিংবা পশুপাখি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নাটোরের ঘটনায় মামলা-গ্রেপ্তার হয়েছে সত্যি। কিন্তু এসব ঘটনায় অধিকাংশ সময় অভিযোগ পর্যন্ত কেউ দেন না। এসব কন্টেন্ট দেখভালে সরকারি সংস্থা পর্যন্ত নেই। হয়রানি, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস ও নির্যাতনমূলক কন্টেন্টের ব্যাপারে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশনও (বিটিআরসি) কোনো ব্যবস্থা নেয় না।

জানতে চাইলে বিটিআরসির সিনিয়র সহকারী পরিচালক (মিডিয়া উইং) আবদুল হালিম স্ট্রিমকে বলেন, ‘এসব বিষয় দেখার জন্য আমাদের আলাদা সেল আছে। ব্যক্তিগত অভিযোগ গ্রহণে আমাদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কিছু করিও না। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থেকে অভিযোগ এলে ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।’

ঢাকা মেট্রোপলিটন গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘যেসব কন্টেন্ট ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে, সেখানে কাউকে হয়রানি করা হলে আমরা ব্যবস্থা নিই। তবে ইচ্ছে করে কিছু করি না। কেউ ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অভিযোগ দিলেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’