ডিজিটাল যুগে মানুষের জীবনের বড় অংশ হয়ে উঠেছে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, মেসেঞ্জার, ইমো, টিকটকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। খোঁজ-খবর, যোগাযোগ, ব্যবসা, বিনোদন ও মতপ্রকাশের ক্ষেত্র হিসেবে এগুলোর ব্যবহার বেড়েছে বহুগুণ। সেইসঙ্গে বেড়েছে নারীদের জন্য এই প্ল্যাটফর্মগুলো কতটা নিরাপদ তা নিয়ে উদ্বেগ।
সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ব্যক্তিগত আক্রমন, অপপ্রচার, চরিত্রহনন, অশ্লীলতার মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে গেছে। ছেলে থেকে বুড়ো- এ আক্রমন থেকে কেউ নিস্তার পাচ্ছে না। তবে নারীদের প্রতি সামাজিক মাধ্যমে নানারকম আক্রমন জাতি হিসেবেই কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর উপক্রম হয়েছে।
গত ১৫ এপ্রিল রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে রাব্বি নামে এক প্রতারক ও ধর্ষককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তার মাধ্যমে বেরিয়ে আসে ভয়ংকর এক তথ্য। ফেসবুকে বন্ধুত্ব করার মাধ্যেমে প্রতারণা করে অন্তত ১৩জন মেয়েকে ধর্ষণ করেছে সে। এবং সেই ভিডিও ধারণ করে মেয়েগুলোকে ব্ল্যাকমেইল করে ফোন, টাকা-পয়সা, গয়না ছিনিয়ে নেয়। এমনকি ভুক্তভোগী মেয়েদের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে, সেই ফেসবুকে থাকা অন্য মেয়েদের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলে রাব্বি।
সরাসরি এমন প্রতারণার চেয়ে এখন অবশ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে চরিত্রহনন ও ব্ল্যাকমেইল বেশি হচ্ছে। ফেসবুক থেকে নারীর ছবি নিয়ে সেটার মাথা কেটে কোন পর্ণস্টারের ছবির সাথে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। বা এআই দিয়ে নগ্ন ছবি তৈরি করা হচ্ছে। এভাবে সামাজিক মাধ্যমে নানাভাবে হেনস্তার শিকার হচ্ছেন নারীরা। এর ফলে সম্মান রক্ষায় বা মানসিক যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে কেউ কেউ আত্মহত্যার পথও বেছে নেন।
ডাকসু নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের নানারকম সাইবার আক্রমন সহ্য করতে হয়েছে। সবশেষ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসনে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজকে নিয়েও সামাজিক মাধ্যমে অশালীন ছবি ছড়ানো হয়েছে। উচ্চ পর্যায়ের নারীরাই যখন এমন পরিস্থিতির শিকার, তখন সাধারণ নারীদের অবস্থা সহজেই অনুমান করা যায়।
শনিবার ( ০২ মে) রাজধানীর এক বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, তার ছবি ব্যবহার করে ভুয়া ফেসবুক আইডি খুলে অশ্লীল পোস্ট দেওয়া হয়। পরে তার কাছে ও তার আত্মীয়-স্বজনদের কাছে মেসেজের মাধ্যমে টাকা দাবি করা হয়। ঘটনাটি তার ব্যক্তিগত জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন বলে জানান তিনি।
আরেক তরুণী জানান, “আমি শুধু নিজের ছবি পোস্ট করেছিলাম। এরপর অচেনা শত শত আইডি থেকে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, অশ্লীল ইনবক্স ও বিয়ের প্রস্তাব আসতে থাকে। প্রতিবাদ করলে আরও খারাপ ভাষায় আক্রমণ করা হয়।”
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী জানান, “ক্যাম্পাসে থাকা অবস্থায় আমার ফেসবুক, মেসেঞ্জার, গুগল একাউন্ট পুরোটা হ্যাক হয়ে যায়। কোনও কিছুতেই আমি লগইন করতে পারছিলাম না। ১ ঘণ্টা পর দেখি আমার আইডি থেকে অনেক অশালীন পোস্ট করা হচ্ছে। সেদিন রাতে থানায় গিয়ে জিডি করলাম কিন্তু কিছু হলো না। পরের দিন মামলা করলাম এগুলো থেকে বাঁচতে। এই মামলা আজ ১ বছর পার হয়ে গেলেও আমি বিচার পেলাম না। মেয়েদের ক্ষেত্রে এই সাইবার আইন মজবুত না হলে আমরা কোথায় যাবো?”
সাইবার অপরাধ সংশ্লিষ্ট ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) এক কর্মকর্তা আরটিএনএন’কে জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের হয়রানি সংক্রান্ত অভিযোগ দিন দিন বাড়ছে। বর্তমানে একটি বড় ঝুঁকি হলো ব্যক্তিগত ছবির অপব্যবহার। কারও ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম থেকে ছবি নিয়ে ভুয়া আইডি খোলা, সম্পাদনা করে বিভ্রান্তিকরভাবে ছড়ানো কিংবা সেই ছবি দেখিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা ঘটে। এতে ভুক্তভোগীরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।
আরেকটি সাধারণ অপরাধ হলো সম্পর্কের ফাঁদে ফেলে প্রতারণা। দীর্ঘদিন কথা বলে বিশ্বাস অর্জনের পর অনেক সময় ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি বা ভিডিও সংগ্রহ করা হয়। পরে সেগুলো ব্যবহার করে টাকা দাবি, সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়ার চাপ বা মানসিক ব্ল্যাকমেইল করা হয়- যোগ করেন ডিবির কর্মকর্তা।
পরিসংখ্যান বলছে, এ বছরের জানুয়ারি থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সিআইডির সাইবার সাপোর্ট সেন্টারে অভিযোগ জমা পড়েছে ২৩৭টি। এরমধ্যে অনুসন্ধানের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়েছে ১২৪টি। আর অভিযোগ মামলায় রূপান্তরিত হয়েছে ২১টি। ২০২৫ সালে সাইবার সাপোর্ট সেন্টারে অভিযোগ জমা পড়েছিল ৪৮০টি। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, সাইবার অপরাধের মাত্রা ক্রমশ বাড়ছে।
তবে সাইবার অপরাধে ভুক্তভোগীদের বিশ্লেষণ করে দেখা যায়- অধিকাংশ নারী সামাজিক লজ্জা, নানা সীমাবদ্ধতায় পরিবারকে জানাতে সংকোচ, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় কিংবা হয়রানি আরও বাড়তে পারে- এই আশঙ্কায় আইনি পদক্ষেপ নেন না। ফলে বহু ঘটনা আড়ালেই থেকে যায়।
তথ্য-প্রযুক্তি মানুষের জীবন সহজ করেছে, পৃথিবীকে ছোট করে এনেছে মানুষের জন্য। কিন্তু ব্যক্তিগত নিরাপত্তাহীনতাও বাড়িয়েছে। যার ফলে নারীদের জন্য সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই প্রশ্ন উঠছে- নারীরা কি সোশ্যাল মিডিয়ায় স্বাধীনভাবে নিজেদের প্রকাশ করতে পারবেন আর কখনো, নাকি প্রতিনিয়ত অদৃশ্য ভয় নিয়ে ব্যবহার করতে হবে এসব প্ল্যাটফর্ম?