Image description

প্রতিদিনকার ব্যবহারের জনপ্রিয় গেম, ভিডিও বা ছবি এডিটিং অ্যাপের মাধ্যমে আপনার সব তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে ইসরায়েলি গোয়েন্দারা। যে টাকা দিয়ে আপনি এসব অ্যাপ কিনছেন, তা আবার যাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনীর পকেটে।

অ্যানড্রয়েড ফোনের প্লে-স্টোর ও আইফোনের অ্যাপ স্টোরের শত শত জনপ্রিয় অ্যাপের নেপথ্যে রয়েছে ইসরায়েলি গোয়েন্দার হাত। ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্স বা আইডিএফ তাদের কর্মকর্তাদের নামে-বেনামে কোম্পানি খুলে এসব অ্যাপ পরিচালনা করছে। সম্প্রতি একটি অনুসন্ধানে এমন ভয়ংকর তথ্য উঠে এসেছে।

গুগল প্লে-স্টোর কিংবা অ্যাপল অ্যাপ স্টোরে থাকা শত শত জনপ্রিয় অ্যাপের নেপথ্যে রয়েছে ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের সম্পৃক্ততা। আর এসব অ্যাপ থেকে অর্জিত কোটি কোটি ডলার ইসরায়েলের অর্থনীতিকে গণহত্যামূলক যুদ্ধের সময়ে ব্যাপক শক্তিশালী করছে। যার একটি মোটা অঙ্ক ব্যবহৃত হচ্ছে নিজেদের অবৈধ স্বার্থে।

এই অ্যাপগুলোর মধ্যে সাধারণ ছবি ও ভিডিও এডিটিং অ্যাপ থেকে শুরু করে বিভিন্ন গেম অ্যাপও রয়েছে। অধিকাংশ ব্যবহারকারী জানেই না নিজেদের ফোনে ইসরায়েলি মালিকানাধীন বা শেয়ার থাকা প্রোগ্রামগুলো ইনস্টল করা আছে। এই অ্যাপ নির্মাতাদের অনেকেই পর্দার আড়ালে কাজ করছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, অ্যাপগুলোর নির্মাতাদের অধিকাংশই ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাদের মালিকানা কাঠামো এতটাই গোপনীয় যে, এ সম্পর্কে সহজে জানা খুব একটা সম্ভব নয়।

 

দ্য গ্রেজোনে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। দ্য গ্রেজোন হলো আমেরিকান সাংবাদিক ম্যাক্স ব্লুমেন্থাল কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত একটি বামপন্থি সংবাদমাধ্যম, যা মূলত আন্তর্জাতিক রাজনীতি, মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি এবং অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

 

তাদের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জিপোঅ্যাপস (ZipoApps)-এর মতো বড় মাপের অ্যাপ কোম্পানিগুলোর প্রায় সব কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা বা মালিকানাই ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা ‘ইউনিট ৮২০০’-এর সাবেক সদস্য। ইউনিটটি মূলত সাইবার নজরদারি এবং সিগন্যাল ইনটেলিজেন্সের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। সাধারণ ছবি ও ভিডিও এডিটিং অ্যাপগুলো কয়েকশ কোটি বার এখান থেকে ডাউনলোড হয়েছে। অথচ ব্যবহারকারীরা জানেই না।

 

অ্যাপগুলো চিহ্নিত হওয়ার ফলে ‘বয়কট, ডাইভেস্টমেন্ট, স্যাংকশনস’ (বিডিএস) আন্দোলনে একটি নতুন মাত্রা যুক্ত হতে পারে। বিডিএস ফিলিস্তিনি নেতৃত্বাধীন ইসরায়েলি পণ্য বর্জন, বিনিয়োগ প্রত্যাহার এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার জন্য একটি অহিংস আন্দোলন।

 

অ্যাপল অ্যাপ স্টোর ও গুগল প্লে-স্টোরে এই অ্যাপগুলোর ব্যাপক উপস্থিতির মাধ্যমে গোপনীয়তা এবং ব্যক্তিগত তথ্য চুরির প্রশ্নও তুলছে। ইসরায়েলি প্রযুক্তির বিতর্কিত অতীত এবং স্পাইওয়্যার কেলেঙ্কারির প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্নগুলো বেশি জোরালো হচ্ছে।

 

ইসরায়েলি অ্যাপ ডেভেলপারদের মধ্যে অন্যতম বড় কোম্পানি হলো জিপোঅ্যাপস। কোম্পানিটি বড় পরিসরে অ্যাপ কিনে সেগুলোকে ট্র্যাকার ও বিজ্ঞাপনযুক্ত করে। জিপোঅ্যাপস-এর মালিকানাধীন কোলাজম্যাকার ফটো এডিটর (Collage Maker Photo Editor) এবং ইনস্টাস্কয়ার ফটো এডিটর (Instasquare Photo Editor)-এর মতো অ্যাপগুলো গুগল প্লে-স্টোর থেকে ৫০ মিলিয়নেরও বেশি বার ডাউনলোড হয়েছে।

 

২০২২ সালে কোম্পানির সিইও গাল আভিদর এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেন, এই কোম্পানির সব প্রতিষ্ঠাতাই ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা ‘ইউনিট ৮২০০’-এর প্রাক্তন সদস্য।

 

অ্যানড্রয়েড ফোনের প্লে-স্টোরের অন্যতম এআইভিত্তিক ফটো এডিটিং অ্যাপ হলো বাজারাট (Bazaart)। এই অ্যাপের মালিকানায় রয়েছেন ড্রোর ইয়াফে এবং স্টাস গোফারম্যান। তারা দুজনই ইসরায়েলি প্রতিরক্ষাবাহিনীর (আইডিএফ) সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা। গোফারম্যান এক দশক আইডিএফে কাজ করেছেন, ২০১১ সালে তিনি চাকরি থেকে অব্যাহতি নেন।

 

ফেসটিউন (Facetune) হলো অ্যানড্রয়েড এবং আইফোন উভয় প্রোগ্রামের জন্য জনপ্রিয় অ্যাপ। এটি লাইটট্রিক্স নামের অ্যাপ কোম্পানির পণ্য। অ্যাপটির ডাউনলোড সংখ্যা ৫ কোটির বেশি। অ্যাপল স্টোরের ব্যবহারকারীরা একে প্রতারণা হিসেবে অভিহিত করেছেন। কারণ এটি ব্যবহারকারীর ইউনিক আইডি এবং লোকেশন অ্যাক্সেস দাবি করে। লাইটট্রিক্সের সহপ্রতিষ্ঠাতা ইয়ারন ইনগার ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা ইউনিট ৮২০০-এ পাঁচ বছর কর্মরত ছিলেন।

 

মোবাইল গেমিং জগতে সুপারসনিক (Supersonic) নামের ইসরায়েলি কোম্পানি অন্যতম বৃহত্তম নাম। এই কোম্পানির বার্ষিক আয় প্রায় ২৩ মিলিয়ন ডলার। কোম্পানিটির বিল্ড এ কুইয়ন (Build a Queen), গোয়িং বলস (Going Balls) ও ব্রিজ রেস (Bridge Race) বিশ্বের সেরা দশটি ডাউনলোড হওয়া গেমের তালিকায় রয়েছে। কনকোয়র কানট্রিস (Conquer Countries) নামে এই কোম্পানির একটি গেম রয়েছে যা লাখ লাখ বার ডাউনলোড করা হয়েছে। অ্যাপটির বিজ্ঞাপনী ছবিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি কার্টুন সংস্করণ ব্যবহার করা হয়েছে। কোম্পনিটির প্রতিষ্ঠাতা নাদাভ আশকেনাজি, তিনি সাড়ে সাত বছর আইডিএফের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এ ছাড়া তিনি ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর অপারেশনাল প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

 

অন্যদিকে, ২.৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি রাজস্ব আয় করা কোম্পানি প্ল্যাটিকা (Playtika) সরাসরি যুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে অভিযোগ উঠেছে। নাসডাক শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিটি জানিয়েছে, তাদের মোট কর্মীর ১৪ শতাংশ বর্তমানে গাজা অভিযানে ‘রিজার্ভিস্ট’ হিসেবে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে অংশ নিচ্ছেন। কোম্পানিটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আইডিএফের সাবেক প্রধান আমনন লিপকিন-শাহাকের ছেলে উরি শাহাক। কোম্পানির সিইও রবার্ট আনটোকল প্রকাশ্যেই বলেছেন, ইসরায়েলি অর্থনীতির প্রতি তাদের বিশেষ দায়বদ্ধতা রয়েছে।

 

ক্র‌্যাজি ল্যাবস (Crazy Labs) অ্যাপ কোম্পানির বার্ষিক আয় প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার। কোম্পানিটির অ্যাপগুলো কয়েকশ কোটিবার ডাউনলোড করা হয়েছে। তাদের জনপ্রিয় গেমগুলোর মধ্যে রয়েছে ফোন ক্যাস ডিআইওয়াই (Phone Case DIY), মিরাকিউলাস ল্যাডিবাগ এন্ট ক্যাট নইর (Miraculous Ladybug & Cat Noir) ও স্কালপট পিপল (Sculpt People)। এই কোম্পানির আয় করা অর্থ সরাসরি যুক্ত হচ্ছে ইসরায়েলি অর্থনীতিতে। কোম্পানিটির প্রতিষ্ঠাতা সবাই আইডিএফ-এর সাবেক সদস্য, তাদের মধ্যে সাগি শ্লিসারও রয়েছেন। তিনি আট বছর আইডিএফ-এর ডিজিটাল আর্কিটেকচার তৈরিতে কাজ করেছেন।

 

বিশ্বের প্রায় ১০০ কোটি মানুষ যাতায়াতের তথ্যের জন্য মুভিট (Moovit) অ্যাপটি ব্যবহার করে থাকেন। মাইক্রোসফটের সঙ্গেও অ্যাপটির অংশীদারত্ব রয়েছে। অ্যাপটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা নির ইরেজ। তিনি ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সাইবার ইউনিটের বিশেষায়িত কম্পিউটিং সেন্টার মামরামে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। একইভাবে, স্প্যাম কল থেকে বাঁচতে ব্যবহৃত কলঅ্যাপ (CallApp)-এর প্রতিষ্ঠাতা অমিত অন ছিলেন ইউনিট ৮২০০-এর সদস্য।

 

যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েলভিত্তিক একটি জনপ্রিয় রাইড-হেলিং বা গাড়ি ভাড়ার জন্য গেট (Gett) অ্যাপ অন্যতম। অ্যাপটি প্রতিষ্ঠা করেছেন ইউনিট ৮২০০-এর সাবেক সদস্য রোই মোর এবং শাহার ওয়াইজার। এছাড়া গত দশকের সবচেয়ে বিখ্যাত ইসরায়েলি অ্যাপ হলো জিপিএস নেভিগেশন অ্যাপ ওয়েইজ (Waze)। ২০১৩ সালে গুগল ১.৩ বিলিয়ন ডলারে কিনে নেয় অ্যাপটি।

 

আরেকটি দ্রুত বর্ধনশীল ইসরায়েলি অ্যাপ হলো ফুডুক্যাট (Fooducate)। অ্যাপটি নিয়ে ওপেরা উইনফ্রে শো, নিউইয়র্ক টাইমস এবং সিএনএন-এ ফিচার করা হয়েছে। এর প্রতিষ্ঠাতা হেমি ওয়াইনগার্টেন ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর একজন সাবেক পাইলট।

 

এই অনুসন্ধান প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, আমাদের ডিজিটাল জীবনে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রভাব কতটা গভীরে প্রোথিত। তদন্তে দেখা গেছে, ইসরায়েল মূলত ফিলিস্তিনিদের ওপর আধিপত্য বজায় রাখার ওপর জোর দিচ্ছে। ইসরায়েলিদের একমাত্র মূল্যবান পণ্য হলো সাবেক আইডিএফ কর্মকর্তাদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এই টেক কোম্পানিগুলো। নাগরিকদের গোয়েন্দা ও সৈনিক হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর দমন-পীড়ন চালানোর সুযোগ না থাকলে ইসরায়েলি অর্থনীতি ধসে পড়বে।

 

অথচ সাধারণ মানুষ সরল বিশ্বাসে এই অ্যাপগুলো ব্যবহার করে তাদের দখলদারিত্ব ও বর্ণবাদী অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই অ্যাপগুলো বিপুল পরিমাণ ব্যক্তিগত ছবি ও তথ্য সংগ্রহ করে ইসরায়েল সমর্থকদের হাতে পৌঁছে দিচ্ছে।