Image description

ধানমন্ডি থেকে আপনি যাবেন মতিঝিলের এক অফিসে; কিন্তু আপনি বুঝতে পারছেন না যাওয়াটা ঠিক হবে কি না। শুনেছেন, মতিঝিলে কী একটা নিয়ে মারামারি হচ্ছে। সকালের বৃষ্টিতে জমা পানিও নাকি তখনো সরেনি শাপলা চত্বরের আশপাশ থেকে। রাস্তায় তীব্র যানজট।

আপনি মতিঝিলের ওই অফিসে ফোন করে জানিয়ে দিলেন, ‘ভাই, আপনাদের ওদিকে নাকি পরিস্থিতি ভালো নয়। আজ আসছি না।’ কিন্তু তারা বলছে, মতিঝিলে কোনো সমস্যা নেই, সব ঠিকঠাক। আপনার মনে তবু সংশয়। আপনাকে আশ্বস্ত করতে তখন তারা একজনকে দায়িত্ব দিল রাস্তায় নেমে পরিস্থিতি বুঝে জানাতে। তিনি গিয়ে দেখবেন মতিঝিলে সত্যিই কি গোলমাল! রাস্তায় কি আসলেই পানি জমে আছে? সব দেখেশুনে তিনি ওই অফিসকে জানাবেন মতিঝিল আর রাস্তাঘাটের প্রকৃত পরিস্থিতি। তারা তখন আপনাকে জানাবে—এই হলো অবস্থা। সব জেনেবুঝে মতিঝিলে যাবেন কি না, সে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করবেন আপনি।

এটি বিশেষ পরিস্থিতিতে আপনাকে আশ্বস্ত করতে ওই অফিসের নেওয়া বিশেষ ব্যবস্থা। আবার এমনও হতে পারে, ওই অফিসের সঙ্গে আপনার এ রকম একটা শর্তই আছে যে আপনি মতিঝিলে যাওয়ার আগে সব সময় তারা তৃতীয় কাউকে দিয়ে মতিঝিলের অবস্থা সম্পর্কে আপনাকে জানাবে। তারপর আপনি ঠিক করবেন মতিঝিলে যাবেন কি যাবেন না। বা আপনার নিরাপদে সেখানে যাওয়ার জন্য কী ব্যবস্থা নিতে হবে, সেটা ওই অফিসকে জানাবেন।

আসন্ন টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এখানে আপনি হলেন বাংলাদেশসহ বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাওয়া সব ক্রিকেট বোর্ড, মতিঝিলের অফিসটি আইসিসি আর যে ব্যক্তিকে মতিঝিলের ওই অফিস পরিস্থিতি বোঝার দায়িত্ব দিয়েছিল, সে আইসিসির স্বাধীন নিরাপত্তা বিশ্লেষক দল।

ইন্টারনাল থ্রেট অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট শুধু সংশ্লিষ্ট স্বাগতিক দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতিটাই তুলে ধরে। পরিস্থিতির আলোকে কী করা উচিত আর কী করা উচিত নয়, তা এই রিপোর্টে বলা হয় না। সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট বোর্ডের।

আইসিসির কোনো ইভেন্টের আগে এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক দলই স্বাগতিক দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে ‘ইন্টারনাল থ্রেট অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট’ তৈরি করে, যা থেকে অংশগ্রহণকারী বোর্ডগুলো বুঝতে পারে, টুর্নামেন্টের স্বাগতিক দেশে তাদের দল কতটা নিরাপদ থাকবে এবং সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয়। কখনো না যাওয়ার সিদ্ধান্ত, কখনো জানায়, ‘এই এই জায়গায় আমাদের নিরাপত্তা বাড়াতে হবে।’ কোনো কোনো দেশ অবশ্য দ্বিপক্ষীয় সিরিজের আগেও যে দেশ সফরে যাবে সে দেশে এমন নিরাপত্তা পর্যবেক্ষক দল পাঠায়।

ইন্টারনাল থ্রেট অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট শুধু সংশ্লিষ্ট স্বাগতিক দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতিটাই তুলে ধরে। পরিস্থিতির আলোকে কী করা উচিত আর কী করা উচিত নয়, তা এই রিপোর্টে বলা হয় না। সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট বোর্ডের। টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপকে সামনে রেখে আইসিসির নিরাপত্তা বিভাগের যে ইন্টারনাল থ্রেট অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট নিয়ে এখন তুমুল আলোচনা, তাতে যেমন বলা হয়নি, নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে ছাড়া বাংলাদেশকে ভারতে যেতে হবে। মোস্তাফিজ প্রসঙ্গে এতে শুধু ধারণা দেওয়া হয়েছে, যেহেতু তাঁকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়া নিয়ে এত কিছুর শুরু; সেহেতু তাঁর উপস্থিতি নিরাপত্তা নিয়ে ইস্যু তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশের যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল
বাংলাদেশের যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুলপ্রথম আলো

অন্য দুটি প্রসঙ্গেও এ রকম দুটি পর্যবেক্ষণের কথাই বলা হয়েছে। এক. ভারতে বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখতে গিয়ে বাংলাদেশের দর্শক–সমর্থকেরা বাংলাদেশের জার্সি গায়ে ঘোরাফেরা করলে সমস্যা তৈরি হতে পারে এবং দুই. বাংলাদেশের নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, বাংলাদেশকে নিয়ে ভারতে ততই উত্তেজনা বাড়বে এবং ভারতে থাকলে এর আঁচ লাগতে পারে বাংলাদেশ দলের গায়েও। রিপোর্টে যেমন এসব ঝুঁকি মাথায় নিয়েও বাংলাদেশকে ভারতে খেলতে যেতে বলা হয়নি, আবার এটাও বলা হয়নি যে যাওয়াটা ঠিক হবে না। এটা বলার দায়িত্ব স্বাধীন নিরাপত্তা বিশ্লেষক দলের নয়ও।

তবে এ ধরনের ঝুঁকি যেখানে আছে, সেখানে বাংলাদেশ দলের খেলতে না যাওয়াটাই যুক্তিসংগত। যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুলও কাল সেটিই আরেকবার জোর দিয়ে বলেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘আইসিসির সিকিউরিটি টিমের এই বক্তব্য সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করেছে যে ভারতে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলার কোনো রকম পরিস্থিতি নেই।’

তা ছাড়া বিশ্বকাপ উপলক্ষে ভারতের নিরাপত্তা নিয়ে ইন্টারনাল থ্রেট অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্টটি যারা তৈরি করেছে, তারা আইসিসির নিয়োগ করা একটি স্বাধীন নিরাপত্তা বিশ্লেষক দল। এ রকম নিরাপত্তা বিশ্লেষক দলে আইসিসির নিরাপত্তাবিশেষজ্ঞদের সঙ্গে স্বাগতিক দেশের বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার প্রতিনিধিরাও থাকেন। অনেক সময় আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলোও এতে ভূমিকা রাখে।

আইসিসির নিরাপত্তা বিভাগের চিঠিকে উদ্ধৃত করে যে তিনটি পরিস্থিতিতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সময় ভারতে বাংলাদেশ দলের নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়তে পারে বলে ক্রীড়া উপদেষ্টা জানিয়েছেন, সেসব বিষয়ে ভারতের বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থারও শঙ্কা থাকাটা তাই অস্বাভাবিক নয়।

আইসিসির স্বাধীন নিরাপত্তা বিশ্লেষক দলের ইন্টারনাল থ্রেট অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্টকে যদি কেউ বাংলাদেশের ভেন্যু পরিবর্তনের দাবিতে আইসিসির জবাব বা বক্তব্য ভেবে বসেন, সেটিও একটি ভুল। মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়া নিয়ে বর্তমান জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি না হলেও নিয়ম অনুযায়ী স্বাগতিক দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আইসিসি এ রকম একটি রিপোর্ট সব বোর্ডকে দিত। কোনো দেশের নিরাপত্তাসংক্রান্ত নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে নির্দিষ্ট কিছু জানার থাকলে, তা জানাত।

বিশ্বকাপের নিরাপত্তাসংক্রান্ত রিপোর্ট সম্পর্কে কাল বিসিবির ব্যাখ্যায়ও সেটাই বলা হয়েছে—এটি মূলত আইসিসির নিরাপত্তা বিভাগের সঙ্গে বিসিবির অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের অংশ। এতে বিশ্বকাপের আগে বাংলাদেশ দলের জন্য সম্ভাব্য নিরাপত্তাঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়েছে। এটি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ম্যাচ ভারতের বাইরে আয়োজনের জন্য বিসিবির অনুরোধের বিষয়ে আইসিসির কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব নয়। এ বিষয়ে আইসিসির আনুষ্ঠানিক জবাব এখনো পাওয়া যায়নি।