Image description

তারপর একদিন মাঠে আলো জ্বলে, গ্যালারি ভরে যায়, হাজার হাজার মানুষ চিৎকার করে; কিন্তু তিনি আর সেই জার্সিটা পরে মাঠে নামেন না। তখন বুঝতে হয়, মানুষটি চলে গেছেন; কিন্তু তাঁর গল্পটা থেকে গেছে।

লিওনেল মেসির গল্পটাও বোধ হয় এমনই।

আজ তিনি বললেন, জাতীয় দল থেকে অবসর নিয়েছেন! মেসি আর খেলবেন না আর্জেন্টিনার হয়ে! খুবই কাঙ্ক্ষিত ও অনুমিত একটা ঘটনা, তারপরও কি বিস্ময়কর লাগে!

কারণ, আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সিটা শুধু একটা জার্সি ছিল না। দুই দশক ধরে সেটা ছিল একটা মানুষের শরীরের সঙ্গে লেগে থাকা দ্বিতীয় চামড়া। একটা দেশের স্বপ্ন, রাগ, অভিমান, ভালোবাসা, কান্না, সবকিছুর ঠিকানা।

সেই ঠিকানা আজ থেকে বদলে গেল। মেসি লিখেছেন, তাঁর আত্মাকে এই সিদ্ধান্ত ব্যথা দিয়েছে। লিখেছেন, তিনি আর কিছু দেওয়ার মতো বাকি রাখেননি।

কী অদ্ভুত একটা বাক্য!

যে ছেলেটাকে একসময় বলা হয়েছিল—ক্লাবের মেসি আর দেশের মেসি এক নয়। সেই ছেলেটাই আজ নিজের দেশের হয়ে সবকিছু দিয়ে যাওয়ার পর বলছে, ‘আমার দেওয়ার মতো আর কিছু বাকি নেই।’

হয়তো সত্যিই নেই। কারণ, এই গল্প তো শুরু হয়েছিল পাওয়া দিয়ে নয়। শুরু হয়েছিল না পাওয়ার যন্ত্রণা দিয়ে।

২.

২০০৫।

আর্জেন্টিনার জার্সিতে এক কিশোর প্রথমবার বিশ্বকে জানান দিল, তার পায়ের কাছে বল থাকলে সময় একটু ধীর হয়ে যায়।

কিন্তু জাতীয় দলের সিনিয়র পর্যায়ে মেসির পথ কখনোই সহজ ছিল না। সে সময় আর্জেন্টিনা মানে ছিল ম্যারাডোনা। আর মেসি? তাঁকে বলা হতো ম্যারাডোনার উত্তরসূরি। আসলে ভয়ংকর একটা পরিচয়!

কারও জন্য এটা গর্বের। কিন্তু মেসির জন্য সেটাই হয়ে উঠেছিল একধরনের অভিশাপ।

আর্জেন্টিনার জার্সিতে এভাবেই ভেসেছেন মেসি। আনন্দে ভাসিয়েছেন সমর্থকদেরও
আর্জেন্টিনার জার্সিতে এভাবেই ভেসেছেন মেসি। আনন্দে ভাসিয়েছেন সমর্থকদেরওএএফপি

তিনি গোল করতেন, অ্যাসিস্ট করতেন, ডিফেন্স ভাঙতেন, একাই ম্যাচ ঘুরিয়ে দিতেন। তবু প্রশ্ন থাকত, ক্লাবের মেসি কোথায়? দেশের জার্সিতে কেন তিনি একই রকম নন?

তারপর এল ২০১৪। ব্রাজিল। বিশ্বকাপের ফাইনাল। মারাকানা।

একটা দেশ ২৮ বছর ধরে অপেক্ষা করছে। আর একজন মানুষ তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্নটার একেবারে দরজায় দাঁড়িয়ে। কিন্তু দরজাটা খুলল না। জার্মানি জিতল। মেসি গোল্ডেন বল হাতে দাঁড়িয়ে রইলেন।

চারপাশে আতশবাজি, জার্মানির উল্লাস। আর এক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট একটা মানুষ, যাঁর চোখে তখন শুধু একটা প্রশ্ন: ‘আর কত দূর গেলে তবে আমি আমার দেশের জন্য যথেষ্ট হব?’

৩.

তারপর আরও দুইবার।

২০১৫। কোপা আমেরিকার ফাইনাল। চিলির কাছে হার। টাইব্রেকারে মেসি পেনাল্টি মিস করলেন।

তারপর ২০১৬। আবার কোপা আমেরিকার ফাইনাল। আবার চিলি, আবার টাইব্রেকার। আবার হার। এবার মেসি কাঁদলেন। এতটাই ভেঙে পড়েছিলেন যে ঘোষণা করে ফেললেন, জাতীয় দল থেকে সরে যাচ্ছেন।

ভাবুন তো। বিশ্বের সেরা ফুটবলার, ক্লাব ফুটবলে যা কিছু জেতা সম্ভব, প্রায় সব জিতে ফেলেছেন; কিন্তু নিজের দেশের হয়ে একটা বড় ট্রফি নেই। আর সেই অভাবটাই যেন তাঁর সমস্ত অর্জনকে আর্জেন্টিনার চোখে ছোট করে দিচ্ছিল। সে সময় হয়তো মেসি বুঝতে পারেননি, কিছু গল্পের শেষটা লিখতে এত সময় লাগে। কিছু মানুষকে কিংবদন্তি হতে হলে আগে অনেকবার ভাঙতে হয়।

কোপা আমেরিকা জয়ের সেই মুহূর্ত। মেসির হাতে মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা
কোপা আমেরিকা জয়ের সেই মুহূর্ত। মেসির হাতে মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপাএএফপি

৪.

তারপর এল ২০২১। মারাকানা আবার, আবার ব্রাজিল। আবার ফাইনাল। এবার আর জার্মানি নয়, চিলি নয়, এবার প্রতিপক্ষ ব্রাজিল। এবারও একটা দেশ তাকিয়ে আছে সেই ছোট্ট ১০ নম্বরের দিকে।

আর যখন শেষ বাঁশি বাজল, মেসি মাটিতে বসে পড়লেন। চোখে জল, মুখে হাত। চারপাশে সতীর্থরা ছুটে আসছেন। আর কয়েক সেকেন্ডের জন্য মনে হলো, পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী মানুষটা বোধ হয় সেদিন সবচেয়ে হালকা হয়ে গিয়েছিলেন।

আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন, মেসি চ্যাম্পিয়ন। অবশেষে।

যে মানুষটার নামে এত দিন একটা অভিযোগ ছিল, সে দেশের হয়ে কিছু জেতেনি, সেদিন সেই অভিযোগটা প্রথমবারের মতো চিরতরে মারা গেল।

কিন্তু গল্প তখনো শেষ হয়নি। কারণ, ঈশ্বর বোধ হয় মেসির জন্য আরও বড় একটা দৃশ্য লিখে রেখেছিলেন।

৫.

এরপর কাতার, ২০২২। বিশ্বকাপ। সৌদি আরবের কাছে হার দিয়ে শুরু।

তারপর একে একে মেক্সিকো, পোল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস, ক্রোয়েশিয়া। আর প্রতিটি ম্যাচের সঙ্গে মেসি যেন বয়সকে অস্বীকার করতে লাগলেন। ৩৫ বছর বয়সী একজন মানুষ পুরো একটা জাতির স্বপ্ন নিজের কাঁধে তুলে নিলেন।

তারপর ফাইনাল, সামনে ফ্রান্স। ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপের অপেক্ষায় আর্জেন্টিনা। মেসির শেষ বিশ্বকাপ।

এক পাশে এমবাপ্পে, অন্য পাশে মেসি। ২-০। ২-২। ৩-৩। তারপর টাইব্রেকার । এমন একটা ম্যাচ, যেটা হয়তো কোনো লেখক লিখলে পাঠক বলত, এত নাটকীয়তা অবিশ্বাস্য!

লিওনেল মেসির ভেজা চোখ। সর্বশেষ বিশ্বকাপ ফাইনালের পর ছবিটি তোলা
লিওনেল মেসির ভেজা চোখ। সর্বশেষ বিশ্বকাপ ফাইনালের পর ছবিটি তোলারয়টার্স

কিন্তু ফুটবল সেদিন অবিশ্বাস্য এক গল্পই লিখেছিল। যার শেষ দৃশ্যে মেসি বিশ্বকাপ হাতে, নীল-সাদা পতাকার নিচে দাঁড়িয়ে। মাথার ওপর সোনালি মুকুট।

কাপটা হাতে নিয়ে তিনি যেন শুধু একটা ট্রফি তুলছিলেন না, তুলছিলেন ২০ বছরের অপমান। তুলছিলেন ২০১৪-এর কান্না। তুলছিলেন ২০১৫-এর পেনাল্টি। তুলছিলেন ২০১৬-এর ভাঙা হৃদয়। তুলছিলেন সেই সব রাত, যখন তাঁকে বলা হয়েছিল, ‘তুমি দেশের হয়ে কিছু জেতোনি।’

সেদিন আর কারও কিছু বলার ছিল না। মেসি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, আর্জেন্টিনা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।

আর ফুটবল অবশেষে তার অসমাপ্ত গল্পটা শেষ করেছিল।

৬.

তারপর ২০২৪। আরেকটি কোপা আমেরিকা, আরেকটি ফাইনাল, আরেকটি ট্রফি। এবার আর কেউ প্রশ্ন করেনি মেসি দেশের হয়ে কী করেছেন। কারণ, প্রশ্ন করার মতো কিছুই আর বাকি ছিল না।

একটা বিশ্বকাপ, দুটি কোপা আমেরিকা, অলিম্পিক সোনা। বিশ্বজয়ী আর্জেন্টিনার অধিনায়ক। একটা প্রজন্মের স্বপ্নের মানুষ। কিন্তু মেসির গল্পের সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপারটা হয়তো ট্রফিগুলো নয়। সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপার, তিনি হেরে গিয়েও থেকে গিয়েছিলেন। তিনি অপমানিত হয়েও ফিরে এসেছিলেন। তিনি কেঁদেও আবার জার্সিটা পরেছিলেন। তিনি অবসর ঘোষণা করেও আবার ফিরেছিলেন।

কারণ, তিনি বুঝেছিলেন, কিছু ভালোবাসা থেকে পালানো যায় না। আর্জেন্টিনা ছিল তেমনই এক ভালোবাসা।

২০২৬ বিশ্বকাপ ট্রফিটা অধরা থেকে গেল মেসির জন্য
২০২৬ বিশ্বকাপ ট্রফিটা অধরা থেকে গেল মেসির জন্যরয়টার্স

৭.

তারপর ২০২৬। আরেকটি বিশ্বকাপ। শেষবারের মতো মেসি সেই জার্সিতে। শেষবারের মতো বিশ্বকাপের মাঠে। শেষবারের মতো ১০ নম্বর। আর নিয়তি যেন বলল, ‘না, এবারও গল্পটা সহজ হবে না।’ আর্জেন্টিনা পৌঁছাল ফাইনালে, স্পেনের বিপক্ষে। আর সেই ম্যাচটাই হয়ে গেল মেসির জাতীয় দলের শেষ ম্যাচ। আর্জেন্টিনা হারল। স্বপ্নটা শেষ হলো আবারও ফাইনালে। কিন্তু এবার কান্নাটার অর্থ আলাদা।

২০১৪-তে তিনি কাঁদছিলেন কারণ তিনি বিশ্বকাপ জিততে পারেননি। ২০২৬-এ তিনি কাঁদছিলেন কারণ তিনি জানতেন, এবার আর ফিরে আসার সুযোগ নেই। শেষ বাঁশির পর তিনি আর কখনো আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপ খেলবেন না।

আর কোনো ফাইনালের আগে জাতীয় সংগীতের সময় ক্যামেরা তাঁর মুখে ফিরে আসবে না। আর কোনো ম্যাচে গ্যালারি থেকে উঠবে না সেই চেনা গর্জন—‘মে-সি! মে-সি!’

শেষ হয়ে গেল। সত্যিই শেষ হয়ে গেল।

৮.

মেসির শেষটা হলো হেরে। কিন্তু মেসির গল্পটা কি পরাজয়ের?

না, একদমই নয়। কারণ, কিছু মানুষ ট্রফি দিয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেন। আর কিছু মানুষ নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেন: কতবার পড়ে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়াতে পারেন, সেটা দিয়ে। মেসি দ্বিতীয় দলের।

তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, প্রতিভা একজনকে মহান করতে পারে; কিন্তু ভালোবাসা একজনকে কিংবদন্তি বানায়। আর আর্জেন্টিনার জন্য তাঁর ভালোবাসাটা ছিল অসম্ভব গভীর। এত গভীর যে আজও অবসর নেওয়ার মুহূর্তে তিনি বলছেন, ‘আমাকে আর্জেন্টাইন বানানোর জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ।’

তিনি বলছেন, এখন থেকে তিনি অন্যদের মতোই একজন হবেন, বাইরে বসে আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করবেন। ভালো সময়ে যেমন, খারাপ সময়ে আরও বেশি।

কী অসাধারণ একটা বিদায়!

৯.

হয়তো কোনো একদিন, বহু বছর পর, কোনো শিশু আর্জেন্টিনার জার্সি পরে মাঠে নামবে। তার পিঠে থাকবে ১০ নম্বর। সে হয়তো জানবেও না, এই সংখ্যাটার ওজন একসময় কতটা ভারী ছিল। হয়তো তাকে বলা হবে—এই নম্বরটা একজন মানুষকে দেওয়া হয়েছিল। একজন রোগা, শান্ত, লাজুক ছেলেকে। যে একদিন বার্সেলোনায় চলে গিয়েছিল। যে দেশের হয়ে হেরেছিল। কেঁদেছিল, অবসর নিয়েছিল। আবার ফিরেছিল, আবার হেরেছিল।

তারপর একদিন সব জিতে ফেলেছিল। বিশ্বকাপ, কোপা। ভালোবাসা।

যে আর্জেন্টিনা একদিন তাঁকে প্রশ্ন করেছিল, সেই আর্জেন্টিনাই একদিন তাঁকে দেবতার মতো ভালোবেসেছিল।

এটাই মেসির সবচেয়ে বড় জয়।

আর্জেন্টিনার সমর্থকদের হৃদয়ে এভাবেই থাকবেন মেসি
আর্জেন্টিনার সমর্থকদের হৃদয়ে এভাবেই থাকবেন মেসিএএফপি

১০.

প্রিয় লিও,

আপনাকে বিদায় বলার ভাষা আর্জেন্টাইনদের মতো আমাদের অনেকেরও জানা নেই।

কারণ, বিদায় তো তাদেরই বলা হয়, যারা চলে যায়। আপনি কোথাও যাচ্ছেন না।

আপনি থেকে যাবেন ২০০৭-এর সেই প্রথম গোলের মধ্যে। থেকে যাবেন ২০১৪-এর মারাকানার অশ্রুতে। থেকে যাবেন ২০১৫ আর ২০১৬-এর সেই ভাঙা ফাইনালে। থেকে যাবেন ২০২১-এর সেই কান্নাভেজা হাসিতে। থেকে যাবেন ২০২২-এর সেই বিশ্বকাপ হাতে তোলা ছবিতে। থেকে যাবেন ২০২৪-এর আরেকটি কোপায়।

আর থেকে যাবেন ২০২৬-এর সেই শেষ রাতেও। যেদিন আপনি হেরেছিলেন।

কিন্তু আসলে আপনি হারেননি। মেসিরা কখনো হারে না।

বিদায়, লিও।