Image description

ভাদ্রের প্রচ- গরমে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে বিপর্যস্ত সারাদেশ। এই জরুরি সঙ্কটে জনজীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। শহর থেকে গ্রাম সবখানেই বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। দীর্ঘসময় লোডশেডিং নামের ভোগান্তি থেকে মুক্তি মিলছে না মানুষের। গ্রামে প্রতিদিন গড়ে ১২ ঘণ্টা থেকে ১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। বিদ্যুতের এই অনিশ্চয়তায় দৈনন্দিন জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের পোশাক খাত, বেকারি, স্টিল এবং নির্মাণসামগ্রী উৎপাদনকারী কারখানাগুলোর উৎপাদন ৫০% পর্যন্ত কমে গেছে। অনেক কারখানা আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হচ্ছে। লাইনে গ্যাসের চাপ না থাকায় গৃহিণীরা ঠিকমতো রান্না করতে পারছেন না। পাশাপাশি সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে গাড়ির দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে। ক্ষতির মুখে পড়েছে কৃষিসহ শিল্প কারাখানা। রংপুর, বগুড়া, নেত্রকোনা, কুড়িগ্রাম, নিলফামারি, গাইবান্ধা, নরসিংদীসহ কয়েকটি জেলার বিভিন্ন গ্রামের মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা বিপর্যস্তকর অবস্থায় পড়ে গেছেন। তাদের ভাষায় ‘বিদ্যুৎ যায় না আসে’। দুই তিন ঘণ্টা পর বিদ্যুৎ আসে আবার আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টার মধ্যে চলে যায়। গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি এমন যে কোথাও কোথাও দিনের বড় একটি সময় এবং রাতের অধিকাংশ সময় বিদ্যুৎ থাকে না। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ বিদ্যুৎ আসেন না, কিন্তু সময়মতো অতিরিক্ত বিল আসে।

অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে ভাবে যত মূল্যেই হোক গ্যাস-বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। বেশি খবর চিন্তা করার এটা সময় নয়। জানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ম. তামিম বলেন, বর্তমান সঙ্কটে সরকারকে একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহ ঠিক রাখা এবং শিল্পে গ্যাস দেয়া দুই দিকই সামলাতে হচ্ছে। এ অবস্থায় তেলভিত্তিক কেন্দ্র চালানো তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজন হতে পারে। এতে শিল্পে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে দীর্ঘ সময় তেলভিত্তিক কেন্দ্র চালানো হলে পিডিবির আর্থিক দায় বাড়বে। এটি সঙ্কট মোকাবিলার সাময়িক ব্যবস্থা হতে পারে।

ভাদ্র মাসে গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অসহনীয় বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ক্ষুব্ধ মানুষ। এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে বিক্ষোভ-সমাবেশ, থানা-অফিস ঘেরাও এমনকি সড়ক অবরোধের ঘটনাও ঘটেছে। বিদ্যুতের এই ভয়াবহ সংকটের জন্য দায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের ভুলনীতি। তারা বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনে উৎসাহ দিতে সরকার ভর্তুকি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের বক্তব্যে দেখা গেছে চরম স্ববিরোধিতা। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু গত মে মাসে দাবি করেছিলেন দেশে লোডশেডিং নেই এবং বিদ্যুৎ না থাকলে তা কেবল কারিগরি ত্রুটি। অথচ আগস্টেই তিনি স্বীকার করেন লোডশেডিং তীব্র এবং অপেক্ষা ছাড়া উপায় নেই। সঙ্কটের কারণ নিয়েও তিনি একেক সময় একেক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। কখনো বিগত সরকারের ঋণের বোঝা, আবার কখনো অবৈধ অটোরিকশাকে দায়ী করেছেন। প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতও প্রথমে সঙ্কট অস্বীকার করে পরে তা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়ার কথা স্বীকার করেন। বিদ্যুতের দাম বাড়ানোকে জনকল্যাণমূলক সিদ্ধান্ত বলে দাবি করেন।

সাম্প্রতিক বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে তেলভিত্তিক কেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে পিডিবি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হবে। তবে তেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ গ্যাসের তুলনায় বেশি হওয়ায় সরকারের ব্যয় বাড়বে। এসবের মধ্যেই দেশের বিভিন্ন স্থানে লোডশেডিং বিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সঙ্কটে নরসিংদীর অধিকাংশ শিল্প-কারখানার উৎপাদন কমে গেছে। কোনো কোনো কারখানার ইউনিট পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের লোকসান হচ্ছে। প্রভাব পড়েছে দেশের বৃহত্তম ঘোড়াশাল-পলাশ সার কারখানায়। গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় সক্ষমতা অনুযায়ী ইউরিয়া উৎপাদন করতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি। স্থানীয় শিল্প মালিকরা বলছেন, জ্বালানি সঙ্কটের কারণে জেলার শিল্পাঞ্চলে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪শ’ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। শত শত ডায়িং, প্রিণ্টিং, টেক্সটাইল ও স্পিনিং মিলের উৎপাদন স্থবির হয়ে পড়েছে। এমন অবস্থায় গত রোববার অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে নরসিংদীর মাধবদীতে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জোনাল অফিস ঘেরাও এবং ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরোধ করেন টেক্সটাইল কারখানার শ্রমিকরা। পরে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার আশ্বাস দেয়া হলে অবরোধ প্রত্যাহার করে শ্রমিকরা যার যার কর্ম ক্ষেত্রে ফিরে যায়।

ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে বিক্ষুব্ধ জনতা পিডিবির অফিস ভাঙচুর করে। রংপুরে গ্রাহকরা সড়ক অবরোধ করে নেসকো অফিসে গণস্বাক্ষর অভিযান চালান। পীরগঞ্জে দৈনিক ১০-১২ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে ক্ষুব্ধ গ্রামবাসী বিক্ষোভ করেন। টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিক্ষুব্ধ জনতা পিডিবির অভিযোগ কেন্দ্রে হামলা চালায় এবং পিরোজপুরে পল্লী বিদ্যুতের কর্মকর্তাদের ওপর গ্রামবাসী হামলা করে।

এই পরিস্থিতিতে বিএনপির দলীয় প্রধান তারেক রহমান বিদ্যুৎ খাতে সংস্কার ও জ্বালানি আমদানি চুক্তি পর্যালোচনার নির্দেশনা দিলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তা বাস্তবায়িত হচ্ছে না। রাজনৈতিক নেতৃত্ব সদিচ্ছা দেখালেও মন্ত্রী, সচিব ও বিতরণ সংস্থাগুলোর কর্মকর্তাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা প্রকট। প্রাকৃতিক দুর্যোগের দোহাই দিয়ে কর্মকর্তারা নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করছেন, যার ফলে গ্রামে ১৬-১৮ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। পুরোনো সিন্ডিকেট ও দুর্নীতি ভাঙতে শীর্ষ নেতৃত্ব বার্তা দিলেও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা তা বাস্তবায়নে অনীহা দেখাচ্ছেন। মন্ত্রীদের স্ববিরোধী বক্তব্য জনগণের ক্ষোভ আরো উসকে দিচ্ছে, আর আমলারা সংকট সমাধানের বদলে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে ব্যস্ত যা বোঝায় যে খাতটি প্রশাসনিক ও নীতিগতভাবে গভীর জটিলতায় জর্জরিত।
এছাড়া সাধারণ মানুষের হতাশা ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ফেসবুক, এক্স ও অন্যান্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নাগরিকরা তাদের চরম ভোগান্তির কথা তুলে ধরে সরকারের দ্রুত ও কার্যকরী পদক্ষেপের দাবি জানাচ্ছেন।

রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, পুরান ঢাকা, বাড্ডা এবং চট্টগ্রাম ও সিলেটের বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় বাসা বাড়িতে গৃহিণীরা রান্নাবান্না নিয়ে তীব্র সঙ্কটে পড়েছেন। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত গ্যাসের চুলা না জ্বলায় চরম ভোগান্তিতে পড়ছে পরিবারগুলো। বিকল্প হিসেবে এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করতে গিয়ে বাড়তি আর্থিক চাপের মুখে পড়ছেন সাধারণ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ।

সামাজিক মাধ্যমে সরকারের প্রতি কড়া সমালোচনা ও ক্ষোভ প্রকাশের পাশাপাশি অনতিবিলম্বে এই সঙ্কট থেকে উত্তরণের জোর দাবি উঠে এসেছে। নাগরিক সমাজ, অর্থনীতিবিদ ও সাধারণ ব্যবসায়ী মহল থেকে অবিলম্বে দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি কৌশল গ্রহণের আহ্বান জানানো হচ্ছে।

ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশের অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম হয়ে উঠেছে কৌতুক বা স্যাটায়ার। নীতি-নির্ধারকদের পুরোনো ও কাল্পনিক বক্তব্য সম্বলিত ব্যঙ্গাত্মক ‘ফটোকার্ড’ বানিয়ে ফেসবুকে ছড়ানো হচ্ছে, যেখানে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অভাবকে রূপক অর্থে উপহাস করা হচ্ছে। আবার গভীর রাতে বা তীব্র গরমে লোডশেডিং চলাকালে বহু গ্রাহক স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিসের ল্যান্ডলাইন নম্বরে কল দিয়ে সেই কথোপকথন কিংবা সশরীরে অফিসে গিয়ে ক্ষোভ প্রকাশের দৃশ্য সামাজিক মাধ্যমে ‘লাইভ’ বা শর্ট ভিডিও হিসেবে ছড়িয়ে দিচ্ছেন।

ফেসবুক নিউজফিডে গ্যাস ছাড়া খালি কড়াই, মোমবাতির আলোয় পড়াশোনা করা শিক্ষার্থী এবং হাতপাখা ঘোরানোর নানা প্রতীকী ছবি ও মিম ব্যাপক ভাইরাল হচ্ছে। এছাড়া প্রোফাইল ছবি কালো করা বা হ্যাসট্যাগ ব্যবহার করে ডিজিটাল প্রতিবাদের চিত্র দেখা যাচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এসব পোস্টে অনতিবিলম্বে বিকল্প উপায়ে জ্বালানি আমদানি নিশ্চিত করে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো চালু করা, আবাসিক ও শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চ্যাপ পুনর্গঠন ও কারিগরি ত্রুটি দূর করা, জ্বালানি খাতের অপচয়, দুর্নীতি ও সিস্টেম লস কঠোর হাতে দমন করা এবং নবায়নযোগ্য শক্তির (সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ) ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি করার দাবি জানানো হয়েছে।

গ্রামের বাসিন্দারা বলছেন, অনেক এলাকায় দিনে দুই থেকে তিন ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ থাকে না। কখনো কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকার পর আবার দীর্ঘ সময়ের জন্য চলে যাচ্ছে। রাতেও একই অবস্থা। ফলে গরমে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষ যেমন কষ্ট পাচ্ছেন তেমনি গৃহস্থালির কাজ থেকে শুরু করে পড়াশোনা, কৃষিকাজ, ছোট ব্যবসা ও যোগাযোগব্যবস্থাও ব্যাহত হচ্ছে। অনেক পরিবারের সদস্যদের দিনের বড় একটি সময় বিদ্যুৎ না থাকায় বিকল্প হিসেবে চার্জার লাইট, সৌরবিদ্যুৎ, মোমবাতি, ব্যাটারিচালিত বাতির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কিন্তু এসব বিকল্প ব্যবস্থারও দীর্ঘসময় বিদ্যুৎ না থাকলে মোবাইল ফোন, ফ্যান, ছোট বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম চার্জ দেয়াও সম্ভব হচ্ছে না। এমনকি এসব বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকার কারণে পরিবারের ফ্রিজে রাখা জিনিসপত্র ও খাদ্যসামগ্রী নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

নরসিংদীর শুকুন্দী গ্রামের বাসিন্দা গৃহবধূ আনোয়ারা বেগম বলেন, আসলে বিদ্যুৎ কখন আসে সেটা আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারবো না। প্রতিদিনে হিসেবে আমাদের এলাকায় ২ থেকে ৩ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ থাকে না। পরিবারের বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষের যে কি পরিমাণ কষ্ট হয় তা বলে বুঝানো সম্ভব না। শিশুদের পড়াশোনা করানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বিদ্যুতের বিল নিয়মিত দিতে হয়। দুই মাসের বিল জমে গেলে অফিসের লোকজন এসে লাইন কেটে দেয়। কিন্তু বিদ্যুৎ দেয়ার বেলায় তারা কোনো কথা বলে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ সঙ্কটের প্রভাব শুধু অর্থনৈতিক সূচকে মাপা যায় না। একটি পরিবারের সময়, শ্রম, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং নিরাপত্তার ওপরও এর বড় প্রভাব পড়ে। বিদ্যুৎ সঙ্কটের প্রভাব পড়ছে ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ও। গ্রাম এলাকায় দোকানপাট, ওয়ার্কশপ, সেলুন, কম্পিউটার ও প্রিণ্টিংয়ের দোকান, কারখানা, সবকিছু বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। বিদ্যুৎনির্ভর কারখানাগুলোতেও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যেসব পণ্য তৈরি হওয়ার কথা, বিদ্যুৎ না থাকায় সেগুলো তৈরি করা যাচ্ছে না। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি সময়মতো পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি হচ্ছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ অনিয়মিত হওয়ায় সেচব্যবস্থায় সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল। ফলে গ্যাসের সরবরাহ কমে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও প্রভাব পড়ে। এছাড়া বিনিয়োগকারীরা নতুন শিল্প স্থাপনের আগে বিদ্যুৎ, গ্যাস, যোগাযোগ ও অন্যান্য অবকাঠামোগত সুবিধা বিবেচনা করেন। বিদ্যুৎ সঙ্কট দীর্ঘস্থায়ী হয়ে যাওয়ার কারণে শিল্প খাতেও বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে।

পিডিবির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৯ আগস্ট সন্ধ্যা ৮টায় সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৮৮৩০ মেগাওয়াট, অথচ উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১৫৭৫৬ মেগাওয়াট ঘাটতি প্রায় ৩০৭৪ মেগাওয়াট। দিনের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৬৫৬২ মেগাওয়াট, উৎপাদন হয়েছে ১৩৯৭৯ মেগাওয়াট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কমেছে প্রায় ২৫ শতাংশের বেশি। গ্যাস ও তরল জ্বালানির সীমাবদ্ধতার কারণে ৪৫২১ মেগাওয়াট উৎপাদন সম্ভব হয়নি, আর রক্ষণাবেক্ষণের কারণে বন্ধ রয়েছে ২৪৫৪ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র। গত ৩০ আগস্টের পূর্বাভাস বলছিল, দিনের সর্বোচ্চ চাহিদা হতে পারে ১৬৬৯০ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যার সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮০৯০ মেগাওয়াট। অথচ সন্ধ্যায় সর্বোচ্চ উৎপাদন সম্ভব ১৬০৬০ মেগাওয়াট যার অর্থ গত ৩০ আগস্ট কমপক্ষে ২০৩০ মেগাওয়াট ঘাটতি ছিল। তবে পূর্বাভাসে লোডশেডিং শূন্য দেখানো হলেও বাস্তবে গত ২৯শে আগস্ট ২৯৪২ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে, যা পূর্বাভাসের সঙ্গে চরম বৈপরীত্য।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের পরিচালক (জনসংযোগ) মো. শামীম হাসান ইনকিলাবকে বলেন, বর্তমান বিদ্যুৎ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তবে তিনি এ বিষয়ে কোনো বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মূল কারণ হিসেবে গ্যাস সংকটের দিকে ইঙ্গিত দিয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে পেট্রোবাংলার ডিজিএম তরিকুল ইসলাম গত রোববারের গ্যাস সরবরাহের তথ্যে জানিয়েছেন, বেলা ১২টায় মোট সরবরাহ ছিল ২৩২৯ এমএমসিএফডি (দেশীয় ১৬১৫, আরএলএনজি ৭১৪) এবং সন্ধ্যা ৬টায় তা দাঁড়ায় ২৩২২ (দেশীয় ১৬১০, আরএলএনজি ৭১২)। অথচ দেশের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০০ এমএমসিএফডি, যার বিপরীতে ঘাটতি প্রায় ১৩৮০ এমএমসিএফডি। এই পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায়, দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ অর্ধেকেরও নিচে নেমেছে এবং আমদানিকৃত এলএনজি-তেও তীব্র সঙ্কট রয়েছে, যা সামগ্রিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।