পাকিস্তানের টেস্ট ক্রিকেটে সাম্প্রতিক সময়ের ব্যর্থতার পেছনে ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামোয় বিভাগীয় দলগুলোর গুরুত্ব কমে যাওয়াকে দায়ী করেছেন দেশটির সাবেক অধিনায়ক আজহার আলী। তার মতে, পাকিস্তান ক্রিকেটের ‘প্রধান প্রতিভার আঁতুড়ঘর’ ছিল বিভাগীয় দলগুলো। সেগুলো বন্ধ করে দেয়ার পর থেকেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পাকিস্তানের অবনতি শুরু হয়েছে।
ক্রিকইনফোকে দেয়া সাক্ষাৎকারে আজহার বলেন, পাকিস্তানের ক্রিকেটে বিভাগীয় দল খুবই প্রয়োজন। কয়েক বছর আগে এই দলগুলো বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্তের পর ঘরোয়া ক্রিকেটের কাঠামোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আজহার বলেন, ‘বিভাগীয় ক্রিকেট পাকিস্তানের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানের ক্রিকেটে এর বিশাল অবদান রয়েছে। কয়েক বছর আগে আমরা এটি বন্ধ করে দিয়েছিলাম। আমার ব্যক্তিগত মত হলো, এরপর থেকেই পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বর্তমান পতনের সঙ্গে এর যোগসূত্র রয়েছে। পাকিস্তানের ক্রিকেটে বিভাগীয় দলগুলো ছিল সবচেয়ে বড় প্রতিভার আঁতুড়ঘর। এখন আবার মনে হচ্ছে, সেটিকে বাইরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।’
সম্প্রতি পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) নতুন নিয়ম মেনে চলতে না পারায় দুটি বিভাগীয় দলকে ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। অংশগ্রহণ ফি তিন গুণ বাড়ানোর সিদ্ধান্তের সঙ্গে মূলত এই বিরোধ তৈরি হয়। বাদ পড়া দলগুলোর একটি ওয়াপদা—পাকিস্তানের ঘরোয়া ক্রিকেটের অন্যতম পুরোনো দল এবং তাদের প্রথম শ্রেণির প্রতিযোগিতার বর্তমান চ্যাম্পিয়ন।
সাহির অ্যাসোসিয়েটসও নতুন শর্ত মেনে নেয়ার বদলে সরে দাঁড়িয়েছে। আর পাকিস্তানের ঐতিহ্যবাহী দল খান রিসার্চ ল্যাবরেটরিজ (কেআরএল), যে দল থেকেই আজহারের উঠে আসা, শেষ পর্যন্ত প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
ঘরোয়া ক্রিকেটের কাঠামোয় বারবার পরিবর্তনেরও সমালোচনা করেছেন আজহার। তার মতে, কোনো ব্যবস্থাকে কার্যকর হওয়ার সুযোগ না দিয়েই প্রতি বছর নতুন নিয়ম চালু করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমি প্রথমেই যে কাজটি করব, তা হলো—যে ব্যবস্থা চালু করছি সেটিকে কয়েক বছর সময় দেয়া। আপনি যদি প্রতি বছর পরিবর্তন করেন, তাহলে হয় গত বছরের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল নয়তো এবারেরটা ভুল। পিসিবির সমস্যা হলো, আমরা কখনোই ভুল স্বীকার করি না; আবার সম্ভবত কখনো সঠিকও হচ্ছি না। কারণ প্রতি বছর পরিবর্তন মানেই কোথাও ভুল ছিল।’
বিভাগীয় ক্রিকেট বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে অনেক তরুণ ক্রিকেটার পাকিস্তান ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন বলেও দাবি করেন সাবেক এই ব্যাটার। তার মতে, পাকিস্তানের মতো অর্থনৈতিক বাস্তবতায় তরুণদের ক্রিকেটে ধরে রাখতে আর্থিক নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পাকিস্তানের সাবেক এ অধিনায়ক বলেন, ‘বিভাগীয় ক্রিকেট বন্ধ হওয়ার পর তরুণ খেলোয়াড়দের পাকিস্তান ছাড়তে দেখেছি। তারা এখানে কোনো ভবিষ্যৎ দেখতে পায়নি।’
নিজের ক্যারিয়ারের কথাও উল্লেখ করে তিনি জানান, বিভাগীয় ক্রিকেটই তাকে গড়ে তুলেছে। আঞ্চলিক দলগুলো অনেক সময় খেলোয়াড়দের গুরুত্ব না দিলেও বিভাগীয় দলগুলো নিয়মিত বেতন ও আর্থিক নিরাপত্তা দিয়েছে।
পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বাস্তবতা তুলে ধরে আজহার জানান, ছোট বিভাগীয় দলগুলোর ৩০-৪০ হাজার পাকিস্তানি রুপির বেতনও একজন তরুণ ক্রিকেটারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই আর্থিক নিশ্চয়তা না থাকলে অনেক পরিবারের পক্ষেই সন্তানকে ক্রিকেট খেলার সুযোগ দেয়া সম্ভব হয় না।
আজহারের মতে, বিভাগীয় ক্রিকেটের অবমূল্যায়নের প্রভাব শুধু পেশাদার পর্যায়েই নয়, একেবারে তৃণমূলেও পড়েছে। পাকিস্তানে ক্রিকেট খেলার আগ্রহের অভাব নেই; বরং তরুণদের জন্য খেলাটিকে আর্থিকভাবে টেকসই করে তোলাই বড় চ্যালেঞ্জ।
পাকিস্তানের সাম্প্রতিক টেস্ট ব্যর্থতাকেও এই কাঠামোগত সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করেছেন আজহার। তার মতে, বিভাগীয় দলগুলোর ভূমিকা কমে যাওয়ার ফলে ঘরোয়া ক্রিকেটে অভিজ্ঞ ও তরুণ খেলোয়াড়দের মিশ্রণ কমেছে। এতে তরুণরা মাঠে অভিজ্ঞদের কাছ থেকে শেখার সুযোগ হারাচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আপনি যদি তিনজন তরুণ পেসারকে নিয়ে খেলেন এবং তারা সমস্যায় পড়ে, একজন অভিজ্ঞ পেসার তাদের সেই পরিস্থিতি সামলাতে সাহায্য করতে পারে। একইভাবে অভিজ্ঞ ব্যাটারের সঙ্গে তরুণ ব্যাটার জুটি গড়লেও সে অনেক কিছু শিখতে পারে। একজন কোচ সবকিছু করতে পারেন না। মাঠে অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের কাছ থেকে হাতে-কলমে শেখার সুযোগ প্রয়োজন। আমরা সেটিই সরিয়ে দিয়েছি, আর এরপরই খেলোয়াড়দের খেলার বোধ ও ক্রিকেটীয় বুদ্ধিমত্তায় ঘাটতি দেখা যাচ্ছে।’
বর্তমানে পাকিস্তানের টেস্ট ক্রিকেটের অবস্থাও বেশ নাজুক। সর্বশেষ ১৮ টেস্টের ১৩টিতেই হেরেছে তারা। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের চলমান চক্রে নয় দলের মধ্যে অষ্টম স্থানে রয়েছে পাকিস্তান। এর আগের চক্রে তারা শেষ করেছিল সবার নিচে।