Image description

বিশ্বকাপের এখনো অর্ধেকটা বাকি। টুর্নামেন্টের আসল রোমাঞ্চ, আসল জৌলুস তো সবে মাত্র শুরু হওয়ার কথা। অথচ ফুটবল মহাযজ্ঞের সেই মূল মঞ্চেই কিনা আজ থেকে আর থাকবে না হলুদ-নীল জার্সির কোনো ম্যাজিক! এটা ভাবতেই যাদের চোখের কোনা বিষাদে ভিজে আসে, ফুটবল রোমান্টিকতার সেই চিরন্তন উপাসকদেরই আজ এক চরম, নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হলো। চোখের সামনে দেখতে হলো এক রূপকথার অপমৃত্যু। আর্লিং হালান্ডের নরওয়ের কাছে ২-১ গোলের সেই অবিশ্বাস্য বিপর্যয়ের পর মাঠের মাঝখানে যখন নেইমারের কান্নার বাঁধ ভাঙল, তখন মনে হচ্ছিল ওই এক একটা অশ্রুবিন্দু যেন ব্রাজিলের হেক্সা জয়ের স্বপ্নকে চিরতরে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

নেইমারের চোখের ওই জল আসলে ম্যাচ শেষের বাঁশিতে আচমকা নেমে আসেনি। ওই নোনা জল তো তখনই জমা হয়েছিল, যখন ম্যাচের ঠিক ১৩ মিনিটের মাথায় ব্রুনো গিমারায়েসের পেনাল্টি মিসের সেই ট্র্যাজিক মুহূর্তটি আছড়ে পড়েছিল। যে কিকটি নেওয়ার জন্য ভিনিসিয়ুস বলটি হাতেও নিয়েছিলেন, সেটাই কিনা পরে তুলে নেন। ঠিক সেখানটাতেই ম্যাচটি নয় শুধু পুরো বিশ্বকাপটিই যেন হারিয়ে ফেলে ব্রাজিল। স্পট কিক থেকে গোল করার সেই সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া হওয়া মাত্রই যেন সেলেসাওদের ভাগ্যলিপি বিষাদে লেখা হয়ে গিয়েছিল। প্রথমার্ধের ওই একটা মুহূর্তেই ব্রাজিলের ফুটবলারদের মনের সবটুকু আত্মবিশ্বাস আর জোর কর্পূরের মতো উড়ে যায়। এরপর ভিনিরই বাড়িয়ে দেওয়া একটা পাসে গোল করার আরেকটি সুবর্ণ সুযোগ মিস করেন অ্যান্ড্রিক। জোড়া এই ভুলের পর ফুটবল বিধাতা ক্ষমা করেনি ব্রাজিলকে।

 

 

 

তাদের ডিফেন্ডাররাও যেন ভুলেই গিয়েছিলেন যে হালান্ডকে সামান্যতম জায়গা দেওয়া মানেই নিশ্চিত ধ্বংস। রক্ষণভাগের কোনো ফুটবলারই হালান্ডকে প্রপার ‘ম্যান-মার্কিং’ করতে পারেননি। জোয়াল লাইক স্পেস পেয়ে নরওয়েজিয়ান এই দানব যখন ব্রাজিলের পেনাল্টি বক্সে একের পর এক থাবা বসাচ্ছিলেন, তখন ব্রাজিলের সেন্ট্রাল ডিফেন্স কেবলই নীরব দর্শক। কোচের ভুল রণকৌশল আর ডিফেন্ডারদের এই ক্ষমার অযোগ্য মার্কিংয়ের ব্যর্থতাই মূলত ব্রাজিলকে ম্যাচ থেকে চিরতরে ছিটকে দিল।

আর নেইমার? ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম ট্র্যাজিক নায়কের নাম বোধহয় নেইমার জুনিয়র। যাকে ঘিরে এত আশা, এত কোটি ভক্তের হৃদস্পন্দন, তাকে পুরো সুযোগ কেন কাজে লাগানো হলো না, সেই প্রশ্নটা আজ বাতাসের মতো হাহাকার করে ফিরছে। যখন ম্যাচটা হাত থেকে ফস্কে যাচ্ছিল, তখন নেইমারের মতো একজন জিনিয়াসকে কোচের খামখেয়ালিপনায় পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে বা ম্যাচের মোক্ষম সময়ে খণ্ড খণ্ড টুকরোয় ব্যবহার করাটা অপরাধের শামিল। তাঁর পায়ের সেই ড্রিবলিং, সেই ফাইনাল পাস—যা অনায়াসে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে চুরমার করে দিতে পারত, তাকে মাঠের বাইরে বসিয়ে রেখে কার স্বার্থরক্ষা হলো? নেইমারকে পুরোপুরি ব্যবহার না করার এই খামখেয়ালি মাশুল আজ ব্রাজিলকে দিতে হচ্ছে রক্তাশ্রু ঝরিয়ে।

 

 

 

ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার পর মাঠের ঠিক মাঝখানে হাঁটু গেড়ে বসে যখন হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন নেইমার জুনিয়র, তখন ফুটবল বিশ্ব বুঝতে পেরেছিল, এই কান্না কেবল একটি ম্যাচ হারের নয়, এ হলো এক অধ্যায়ের শেষ সূর্যাস্ত। দীর্ঘ ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপের রাউন্ড অব সিক্সটিনের মঞ্চ থেকে এমন নির্মম বিদায়—এ যেন এক শতাব্দীর সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। ১৯৯০ সালের পর বিশ্বমঞ্চে ব্রাজিলের এমন করুণ পতন আর দেখেনি ফুটবল বিশ্ব। ফুটবল যদি শুধু একটা খেলা হতো, তবে হয়তো আজ রিও ডি জেনেরিওর রাস্তায় কোনো কান্নার রোল উঠত না। কিন্তু ব্রাজিল তো ফুটবল খেলে না, তারা ফুটবল যাপন করে। আর সেই যাপনের ক্যানভাসে যখন এমন এক নির্মম ট্র্যাজেডি আর চিরবিদায়ের সুর নেমে আসে, তখন কলম সচল রাখা দায় হয়ে পড়ে। মাঠের সবুজ ঘাস পেরিয়ে প্রতিটি ব্রাজিল সমর্থকদের চোখে কান্নার নোনা জল। কাঁদো ব্রাজিল কাঁদো, আজ তোমাদের কাঁদারই দিন!