ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আনিসুর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। সেই তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই খোদ স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের জেলা বগুড়ায় নবগঠিত সিটি কর্পোরেশনে বদলি হয়েছেন তিনি।
ডিএসসিসি’তে গুঞ্জন: দুর্নীতির অভিযোগ থেকে রেহাই দিতেই আনিসুর রহমানের মাথায় রাজনীতির ছাতা মেলে ধরেছেন প্রভাবশালী কেউ।
ডিএসসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) আনিসুর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, অর্থ আত্মসাৎ, দরপত্র কারচুপি, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং অর্থ পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। গত ৩০ জুন তাকে বগুড়ায় বদলি করা হয়। এর ঠিক আগেই প্রকাশ পায়, শাহবাগের শহীদ জিয়া শিশু পার্কের ৪০০ কোটি টাকার আধুনিকীকরণ প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আনিসুর রহমান দরপত্রে বিশেষ কিছু শর্ত জুড়ে দিয়েছিলেন।
ডিএসসিসির অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’কে জানিয়েছে, এই শর্তগুলো মূলত ওরিয়ন, এনডিই এবং ইউসিসি–এই তিনটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে সাজানো হয়েছিল, যাতে অন্য কোনো প্রতিযোগী এই দরপত্রে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে না পারে।
আনিসুর রহমানের দুর্নীতি তদন্তে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপসচিব রবিউল ইসলামের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আনিসুর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি তহবিল আত্মসাৎ, দরপত্রে অনিয়ম, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগগুলো তদন্ত করে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে স্থানীয় সরকার সচিবের কাছে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সিটি করপোরেশনের ভেতরের সূত্রগুলো আরও জানায়, বদলি হওয়ার পর আনিসুর রহমান ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন থেকে অবমুক্ত বা রিলিজ না নিয়ে উল্টো এই আদেশ ঠেকাতে তৎপর হয়ে উঠেছেন। এজন্য তিনি বিশাল অঙ্কের অর্থ ছড়াচ্ছেন এবং সরকার ও মন্ত্রণালয়ের প্রভাবশালী মহলে জোরালো তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন।
এই বিষয়ে ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম টাইমসকে জানান, আনিসুর রহমানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ওঠা অভিযোগগুলোর ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, তাকে ইতিমধ্যে বদলি করা হয়েছে এবং একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বদলি ঠেকাতে আনিসুর রহমানের মরিয়া তদবিরের বিষয়টিকে কটাক্ষ করে প্রশাসক মন্তব্য করেন, অসুস্থ মানুষ যেমন চিকিৎসকের কাছে ছুটে যায়, এটাও ঠিক তেমনই সাধারণ একটি ঘটনা।
তিনি বলেন, এই তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া যাবে, ওরিয়নসহ ওই তিনটি নির্দিষ্ট সংস্থাকে সুবিধা দিতে শিশু পার্কের দরপত্রে কারচুপি করার পেছনে একমাত্র আনিসুর রহমানই দায়ী ছিলেন কি না।
এদিকে, তদন্ত কমিটির প্রধান উপ-সচিব রবিউল আলম নিশ্চিত করেছেন যে, তারা ইতিমধ্যে তদন্তের কাজ শুরু করে দিয়েছেন।
সার্বিক বিষয়ে বক্তব্য জানতে টাইমস-এর পক্ষ থেকে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে আনিসুর রহমান কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি এবং সরাসরি দেখা করার কথা বলেন। তবে পরবর্তীতে তার কার্যালয়ে গিয়ে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি সাংবাদিকদের ডিএসসিসির জনসংযোগ বিভাগের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে শিশু পার্কের দরপত্রে কারচুপি
ডিএসসিসির কর্মকর্তারা ‘টাইমস’ এর কাছে প্রকাশ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিশেষ সুবিধাভোগী তিন প্রতিষ্ঠান—ওরিয়ন গ্রুপ, এনডিই এবং ইউসিসিকে শহীদ জিয়া শিশু পার্কের ৪০০ কোটি টাকার আধুনিকীকরণ প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দিতে পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এই পুরো প্রক্রিয়ার মূল হোতা হলেন প্রকল্প পরিচালক আনিসুর রহমান।
কর্মকর্তাদের মতে, এই তিনটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি গোপন আঁতাত রয়েছে এবং তারা দীর্ঘদিন ধরে দরপত্রের শর্তাবলি নিজেদের অনুকূলে সাজিয়ে ডিএসসিসির বড় বড় চুক্তিগুলো এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করে আসছে।
বিভিন্ন মহল থেকে নানামুখী আপত্তি ওঠার পর আনিসুর রহমান দরপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা বাড়িয়ে আগামী ১৫ জুলাই নির্ধারণ করেছেন। দরপত্র খোলার তারিখ ধার্য করা হয়েছে আগামী ১৭ জুলাই।
তবে দরপত্রের নথিপত্র বিশ্লেষণ করলেই স্পষ্ট জালিয়াতির প্রমাণ মেলে। পার্কের বিনোদন রাইডগুলোর প্রযুক্তিগত বিবরণ হুবহু ইতালীয় নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘জাম্পেরলা’র নির্দিষ্ট কিছু মডেলের সাথে মিলিয়ে তৈরি করা হয়েছে, যার মধ্যে ডিস্কো ৪০, এনডেভার, গ্যালিয়ন এবং ওয়াটার ম্যানিয়ার মতো রাইড রয়েছে।
যদিও কাগজ-কলমে কারিগরি শর্তে সমমানের অন্য পণ্য ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে, কিন্তু ধারণক্ষমতা, আকার এবং সুনির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত শর্তগুলো এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে যা বাকি সমস্ত আন্তর্জাতিক রাইড প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানকে প্রতিযোগিতা থেকে পুরোপুরি ছিটকে দেয়।
তা ছাড়া দরপত্রে অংশ নেওয়ার জন্য মূল রাইড প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের বিশেষ অনুমোদন এবং এর আগে ২২০ কোটি টাকা মূল্যের অন্তত দুটি একই ধরনের পার্ক প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা থাকার বাধ্যতামূলক শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে প্রকৃত ও যোগ্য প্রতিযোগীদের অংশ নেওয়ার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ডিএসসিসির কয়েকজন কর্মকর্তা এবং আগ্রহী বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা টাইমসকে জানান, বিগত সরকারের আমলে সুবিধা পাওয়া হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানি ছাড়া আর কারও পক্ষে এই শর্তগুলো পূরণ করা অসম্ভব। এর মাধ্যমে দরপত্রের উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার পরিবেশকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা হয়েছে।
আনিসুরের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের দুর্নীতির অভিযোগ
আনিসুর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ নতুন কিছু নয়। এর আগেও ভুয়া বিল তৈরি করা, মালামাল সরবরাহ না করেই বিল পরিশোধ করা এবং অস্তিত্বহীন রাস্তার মার্কিং বা রোড মার্কিংয়ের নামে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার কারণে তিনি সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়েছিলেন।
ডিএসসিসির নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২০ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ‘জেনসোলিন এবং থার্মোপ্লাস্টিক পেইন্ট সরবরাহ’ প্রকল্পের অধীনে কোনো মালামাল বুঝে না পেয়েই যথাক্রমে ২ কোটি ৮৬ লাখ টাকা এবং ১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ছাড় করার অপরাধে তাকে শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল।
নিয়ম অনুযায়ী এই বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানোর কথা থাকলেও, তৎকালীন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের প্রভাবে এই মামলাটি ধামাচাপা দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া আনিসুর রহমানের বিরুদ্ধে ‘পোর্টেবল এয়ার কম্প্রেশার-২ সরবরাহ’ এবং ‘ব্র্যান্ড নিউ বিটুমিন প্রেসার ডিস্ট্রিবিউটর সরবরাহ’ নামের দুটি প্রকল্পে চুক্তির শর্ত পূরণ না করেই পেছনের তারিখ দেখিয়ে ৫ কোটি ২৪ লাখ টাকা পরিশোধের অভিযোগ রয়েছে।
ডিএসসিসির অপর এক নথি থেকে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই আনিসুর রহমানসহ তিন প্রকৌশলীকে রাস্তার মার্কিংয়ের কাজ সম্পন্ন করার পক্ষে লিখিত ব্যাখ্যা ও প্রমাণ দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
তারা কাজ শেষ হয়েছে বলে দাবি করলেও, সরজমিনে তদন্ত করে সেই কাজের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। ফলস্বরূপ, ২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ডিএসসিসির তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছিলেন।
সাধারণত সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা দুর্নীতি করলে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪, দণ্ডবিধি ১৮৬০ এবং স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন ২০০৯ অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে বিচার করার বিধান রয়েছে। এই আইনগুলো দুদককে তদন্ত ও মামলা করার ক্ষমতা দেয়, যার শাস্তির মধ্যে কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড এবং চাকরি থেকে বরখাস্তের বিধান রয়েছে। অথচ এত সব গুরুতর অভিযোগ থাকার পরও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, এমনকি সরকার পতনের পরও আনিসুর রহমান বহাল তবিয়তে নিজের পদে টিকে ছিলেন।
বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ
১৯৯৫ সালে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে চাকরিতে যোগদান করা আনিসুর রহমান খুব দ্রুতই প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। এর পেছনে মূল কারণ ছিল তিনি ডিএসসিসির প্রাক্তন প্রধান প্রকৌশলী শামসুল হক ভূঁইয়ার ভাগ্নে।
২০০৫ সালে চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর শামসুল হক ভূঁইয়া রাজনীতিতে যোগ দেন এবং চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হন। অভিযোগ রয়েছে, এই মামা ও ভাগ্নে মিলে নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশ করে দীর্ঘদিন ধরে ডিএসসিসির সমস্ত বড় বড় চুক্তির বণ্টন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন।
‘টাইমস’ এর হাতে আসা নথি অনুযায়ী, গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার মোথাজুরি ইউনিয়নে ১৪৫ একর জমির ৫৫ শতাংশের মালিকানা রয়েছে আনিসুর রহমানের। সেখানে তিনি একটি বেসরকারি রিসোর্ট এবং ‘কুমকুম মাল্টিপারপাস অ্যাগ্রো ফার্ম’ গড়ে তুলেছেন।
ডিএসসিসির একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আনিসুর রহমান এখন দেশীয় সম্পদ বিক্রি করে টাকা সরাতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, তিনি ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি সম্পত্তি বিক্রি করে দিয়েছেন এবং সেই অর্থ কানাডায় তার মেয়ের কাছে পাচার করেছেন।
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, গাজীপুরের রিসোর্টটি বিক্রি করতে পারলেই আনিসুর রহমান নিজেও কানাডায় পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন।
গত ৩০ জুন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে তদন্ত কমিটি গঠনের যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, সেখানেও এই আশঙ্কার প্রতিফলন দেখা গেছে। সেই আদেশে স্পষ্টভাবে আনিসুরের অবৈধ সম্পদ এবং বিদেশে অর্থ পাচারের বিষয়টি খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তা ছাড়া ডিএসসিসির সাবেক দুই মেয়র সাঈদ খোকন এবং শেখ ফজলে নূর তাপসের আমলে সক্রিয় থাকা প্রভাবশালী সিন্ডিকেটগুলোর অন্যতম প্রধান সদস্য হিসেবে আনিসুর রহমানের নাম বারবার উঠে এসেছে। এই সিন্ডিকেটগুলোই বিগত বছরগুলোতে সিটি করপোরেশনের শত শত কোটি টাকার বড় বড় প্রকল্পগুলো নিয়ন্ত্রণ করত বলে জানা গেছে।