Image description

১৭ কোটির বেশি মানুষের দেশ বাংলাদেশ। এ দেশের জনগণ এবং প্রবাসীরা দীর্ঘদিন ধরে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোকে সমর্থন দিয়ে আসছেন।

২০০০ সালের শুরুর দিককার কথা। শহিদুল পার্থ তখন বাংলাদেশের কুলকান্দিতে বেড়ে উঠছেন। ওই সময় গ্রামের অনেকে তার বাড়ির উঠানে বসে বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখতেন। ৮০ জনের বেশি মানুষ তাদের বাড়ির সামনের ওই উঠানে ভিড় করতেন।

ব্যাটারিচালিত ১৪ ইঞ্চির একটি সাদাকালো টিভিতে তারা খেলা দেখতেন। এলাকায় ওই একটি মাত্র টিভিই ছিল। খেলার উত্তেজনা সামলাতে তারা দুধ-চায়ে চুমুক দিতেন। সঙ্গে খেতেন বিস্কুট। ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনা গোল করলে দর্শকেরা উল্লাসে ফেটে পড়তেন।

৩৫ বছর বয়সি পার্থ বলেন, ‘খুব সুন্দর একটা সময় ছিল সেটা। মনে হতো, তারা যেন খেলোয়াড়দের সঙ্গে মাঠে খেলছেন।’

তিনি এখন পেনসিলভানিয়ার হ্যাটফিল্ডে থাকেন। সেখানে তিনি সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করেন। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার ও টাউনশিপের কমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।

তিনি বলেন, ‘গোল হলে সবাই জোরে চিৎকার করে উঠতেন। সবাই ভীষণ উত্তেজিত হয়ে পড়তেন। তারা চিৎকার করে বলতেন, ‘যাও, যাও, বল নিয়ে যাও।’ মাঝে মাঝে তারা নির্দেশও দিতেন, ‘এই দিকে যাও, ওই দিকে যাও’।’

বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে থাকলেও পার্থ এখনও ব্রাজিলকে সমর্থন করেন। মজার ব্যাপার হলো, এই সমর্থন তাকে দেশের কথা মনে করিয়ে দেয়।

বাংলাদেশের জাতীয় ফুটবল দল কখনও বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। তবে এই ব্যর্থতা দেশের মানুষের ফুটবলের প্রতি তীব্র ভালোবাসাকে থামাতে পারেনি। ১৭ কোটির বেশি মানুষের এই দক্ষিণ এশীয় দেশ এবং এর প্রবাসীরা দীর্ঘদিন ধরে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলকে সমর্থন করে আসছে।

দর্শক সংখ্যার দিকে তাকালে এই ভক্তকুলের উন্মাদনা টের পাওয়া যায়। গত ১৬ জুন আলজেরিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার উদ্বোধনী ম্যাচের দিন গার্ডিয়ানের লাইভ ব্লগে আসা ট্রাফিকের প্রায় ২০ শতাংশ ছিল বাংলাদেশিদের।

সম্প্রতি বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ব্রাজিলের এক কট্টর সমর্থক তার বাড়িকে ওই দেশের পতাকার আদলে সবুজ ও হলুদ রঙে রাঙিয়েছেন। বাড়ির সামনের দেয়ালে এঁকেছেন ফুটবলারদের ম্যুরাল।

বাংলাদেশি-আমেরিকানরা বলছেন, দক্ষিণ আমেরিকার দলগুলোকে সমর্থন করাটা তাদের নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত থাকতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে এটি তাদের নিজ দেশের স্বাধীনতার কথাও মনে করিয়ে দেয়।

১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর বাংলাদেশের সম্প্রচার অবকাঠামো ধীরে ধীরে উন্নত হতে শুরু করে।

ব্রাজিলের প্রতি বাংলাদেশিদের সমর্থনের শুরুটা মূলত ১৯৭০-এর দশকে। তখন পেলে তার আন্তর্জাতিক খ্যাতির চূড়ায় ছিলেন। সদ্য স্বাধীন হওয়া একটি দেশের নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশিরা সাবেক উপনিবেশ ব্রাজিলের মানুষদের সঙ্গে একধরনের আত্মিক মিল খুঁজে পেত। পাশাপাশি দারিদ্র্য জয় করে পেলের উঠে আসার গল্পও তাদের দারুণভাবে ছুঁয়ে যেত।

আশির দশকে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময়কার কথা মনে করেন মেহেদী ফারহানা। তার সে সময়ের ইতিহাস বইয়ে পেলের জীবনের শুরুর দিকের সংগ্রাম এবং চূড়ান্ত সাফল্যের কথা বিস্তারিত লেখা ছিল।

৪৮ বছর বয়সী ফারহানা বলেন, ‘আমরা তখন তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশ। আমাদের সম্পদ ছিল খুবই সামান্য। কিন্তু আমরা বিশ্বকে প্রমাণ করে দিতে চেয়েছিলাম যে, আমরাও পারি।’ বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া ফারহানা পেশায় একজন সহযোগী ফার্মাসিস্ট। তিনি এখন পেনসিলভানিয়ার হ্যাটফিল্ডে থাকেন। তিনি এবং তার পরিবার আজীবন ব্রাজিলের সমর্থক।

বাংলাদেশে বড় হওয়ার সময় মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ ম্যাচ দেখার কথা ফারহানার আজও মনে পড়ে। ৭০ ও ৮০-এর দশকে বাংলাদেশে বসবাসকারী ফারহানা ও অন্য মানুষজন ব্রাজিলিয়ানদের আর্থসামাজিক অবস্থার সঙ্গে নিজেদের মিল খুঁজে পেতেন।

ফারহানা বলেন, ‘তারাও আমাদের মতো ছিল, তারা গরিব ছিল, তাদের খুব বেশি সম্পদ ছিল না। কিন্তু তারপরও তারা প্রমাণ করতে পেরেছিল যে তারা পারে।’

আশির দশকের দিকে সারা বাংলাদেশে রঙিন টেলিভিশন কেনার হিড়িক পড়ে যায়। বেশির ভাগ বাংলাদেশি প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ দেখেন ১৯৮৬ সালে।

তখন রাষ্ট্রীয় টিভি চ্যানেল বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) সরাসরি এই টুর্নামেন্ট সম্প্রচার করেছিল। সেই টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের খেলা দেখে তারা মুগ্ধ হয়েছিলেন। ওই অভিজ্ঞতাই এমন এক দীর্ঘস্থায়ী সাংস্কৃতিক উন্মাদনার জন্ম দেয়, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে এবং দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।

১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারায় আর্জেন্টিনা। এই ইংল্যান্ড বর্তমান বাংলাদেশ অঞ্চলকে প্রায় ২০০ বছর শাসন করেছিল। ওই ম্যাচে আর্জেন্টিনার তারকা খেলোয়াড় দিয়েগো ম্যারাডোনা একটি গোল করেন। এটি পরে ‘হ্যান্ড অব গড’ নামে পরিচিতি পায়। এই গোলটি নিয়ে বাংলাদেশিরা এখনও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।

নিউইয়র্কের লং আইল্যান্ডে বসবাসকারী ৪০ বছর বয়সি বাংলাদেশি-আমেরিকান অনিক্স চৌধুরী বলেন, ‘এই বড় তারকারা উঠে আসছেন এবং তারা সেসব দেশকে হারাচ্ছেন যারা আগে দখলদার ছিল। ফুটবলের মতো একটি খেলায় এমন ঘটনা নিশ্চিতভাবে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিল।’

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থকদের মধ্যে একধরনের প্রজন্মের ব্যবধান দেখতে পান চৌধুরী। তার নিজের পরিবারের সবাই আর্জেন্টিনার সমর্থক। কিন্তু তার মায়ের দিকের বয়স্ক আত্মীয়রা ব্রাজিলের সমর্থন করেন।

‘পুরোনো প্রজন্মের মানুষজন পেলের কথা তুলবেন। কারণ ৭০-এর দশকটা ছিল পেলের যুগ। এরপর ৮০-এর দশকে এলেন ম্যারাডোনা। আর এখন তো বোঝাই যাচ্ছে, আমাদের প্রজন্মের কাছে আছে (লিওনেল) মেসির যুগ। এভাবে বিষয়টা এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে চলে আসছে।’

১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপটি বাংলাদেশে রাজনৈতিক উত্তেজনার একটি সময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ৭০ ও ৮০-এর দশকে বেশ কয়েক বছর দেশে সামরিক শাসন জারি ছিল।

৪০ বছর ধরে সাংবাদিকতা ও লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত ইব্রাহিম চৌধুরী তখন একজন রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন। ওই সময়ে তিনি সবেমাত্র বাংলাদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে বেরিয়েছেন। তিনি শ্রমিক আন্দোলন সমর্থন করা একটি আন্তর্জাতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং পুলিশের কাছ থেকে লুকিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। সেই দমনপীড়নের শাসনের মধ্যেও ফুটবল তাকে কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছিল।

ইব্রাহিম চৌধুরী বলেন, ‘আমরা তখন সামরিক সরকারের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়ছিলাম। ওই সময় ওটাই ছিল আমাদের বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম। পুলিশ আমাদের খুঁজছে, আর এরমধ্যেই আমরা এক জায়গায় জড়ো হয়ে ফুটবল দেখতাম।’

তিনি ও অন্যরা যখন খেলা দেখতেন, তখন তাদের এক বন্ধু বাইরে পুলিশের পাহারায় নজর রাখতেন। তিনি বলেন, ‘পুরো বিশ্বকাপ চলাকালে এর আগের সব রাজনৈতিক আন্দোলন যেন থমকে গিয়েছিল… এটা খুবই স্মরণীয় একটা সময় ছিল।’

৬৫ বছর বয়সি ইব্রাহিম এখন নিউ জার্সির নর্থ ব্রান্সউইকে থাকেন। সশরীরে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার আজীবনের স্বপ্নটা এখন তিনি পূরণ করতে যাচ্ছেন। এই গ্রীষ্মের টুর্নামেন্টে বিশ্বকাপের ম্যাচগুলোতে তিনি একটি স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ব পেয়েছেন। সেখানে তার কাজ হবে দর্শকদের স্বাগত জানানো এবং তাদের পথনির্দেশনা দেওয়া।

ইব্রাহিম চৌধুরী বলেন, ‘একজন সাংবাদিক হিসেবে এটা কাভার করার খুব ইচ্ছা ছিল আমার… কিন্তু সুযোগ পাইনি। তাই যখন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা বা মেক্সিকোতে এই সুযোগটি এল, তখন আমি সাংবাদিক পাস ও স্বেচ্ছাসেবক—দুটোর জন্যই আবেদন করি। এরপর আমি (স্বেচ্ছাসেবক পাস) পেয়ে যাই।’

নিউইয়র্ক শহরের পর যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি-আমেরিকান বসবাস করেন নিউ জার্সির প্যাটারসনে। সেখানকার স্থানীয় একটি বাংলাদেশি-আমেরিকান ফুটবল দলের বেশির ভাগ সদস্যই আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করেন। ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশি-আমেরিকান স্পোর্টস লিগে ১৪ থেকে ৩৫ বছর বয়সি শত শত তরুণ ও যুবক অংশ নিয়েছেন।

দক্ষিণ আমেরিকার এই দুটি দল সম্পর্কে লিগের সাধারণ সম্পাদক মনসুর লতিফ বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের কাছে এটি আক্ষরিক অর্থে এক আবেগ। তারা ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনাকে আলাদা কোনো দল হিসেবে দেখে না। আপনি যদি তাদের সঙ্গে কথা বলেন, তবে মনে হবে যেন এটা ‘আমাদের’ দল। যদিও আমাদের কেউই... ওই দেশগুলোর কোনোটিতে কখনও যাইনি, তারপরও আবেগটা সব সময়ই সেখানে কাজ করে।’

৩৪ বছর বয়সি এই প্রকৌশলী নিজেকে আর্জেন্টিনার একনিষ্ঠ ভক্ত বলে দাবি করেন। আর্জেন্টিনার আকাশি-নীল ও সাদা জার্সি তার ভীষণ প্রিয়। কৈশোরে ভাইদের সঙ্গে বসে দলটির খেলা দেখার স্মৃতি তিনি আজও যত্ন করে লালন করেন।

লতিফ বলেন, ‘মূলত তাদের খেলার ধরনটাই আসল। তাদের সবকিছুই একদম নিখুঁত।’

পুরো মাসজুড়েই বাংলাদেশি-আমেরিকান কমিউনিটির সদস্যরা ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার খেলা দেখার জন্য নিজেদের বাড়িতে ‘ওয়াচ পার্টি’র আয়োজন করেছেন। আর্জেন্টিনার সমর্থক হলেও গত ১৯ জুন বন্ধুর বাড়িতে এক পার্টিতে বসে ব্রাজিলের পক্ষে গলা ফাটিয়েছেন লতিফ। ওই ম্যাচে হাইতিকে হারিয়েছিল ব্রাজিল।

১৯৮৬ বিশ্বকাপের পর লতিফ ও অনিক্স চৌধুরীর জন্ম হলেও ম্যারাডোনার জাদুকরী সব মুভের গল্প শুনে শুনেই তারা বড় হয়েছেন। মনে হতো, যেন এসব কোনো পারিবারিক রূপকথার গল্প, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে মুখে মুখে চলে আসছে। অনিক্স চৌধুরী এখন তার ছোট্ট ছেলের মধ্যেও এই উন্মাদনা ছড়িয়ে দিচ্ছেন।

অনিক্স চৌধুরী বলেন, ‘আমার ছেলেকে এক প্রকার জোর করে এর মধ্যে ঢোকানো হচ্ছে।’ আগামী দিনের এই খুদে ভক্তের ছবি তোলার জন্য তিনি তার এক বছর বয়সি ছেলেকে আর্জেন্টিনার জার্সি পরাচ্ছেন।

অনিক্স চৌধুরীর ভাষায়, ‘এই উন্মাদনার মধ্য দিয়ে আপনার শেকড়ের সঙ্গে একধরনের যোগাযোগ তৈরি হয়।’

 

লেখক: মেলিসা হেলম্যান গার্ডিয়ান ইউএস-এর একজন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক