ফুটবল সবসময় শুধু প্রতিভার গল্প বলে না। কখনো কখনো এটি বেঁচে থাকার লড়াই, স্বপ্ন আঁকড়ে ধরে এগিয়ে যাওয়ার গল্পও। ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড মাথেউস কুনিয়ার জীবনও ঠিক তেমনই— সংগ্রাম, প্রত্যাখ্যান, কান্না আর ঘুরে দাঁড়ানোর এক অনুপ্রেরণাময় কাহিনি।
১৯৯৯ সালের ২৭ মে ব্রাজিলের জোয়াও পেসোয়ায় জন্ম কুনিয়ার। ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা ছিল ছোটবেলা থেকেই। উচ্চবিত্ত না হলেও তার পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ছিল। জীবনের শুরুটা তাই ছিল সাধারণ ব্রাজিলিয়ান পরিবারগুলোর মতোই— স্বপ্ন বড়, তবে সুযোগ সীমিত।
ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের শহর জোয়াও পেসোয়ার কুনিয়ার বাড়ি যেখানে ছিল, তার পাশেই ফাভেলা; আমাদের ভাষায় বস্তি। এই বস্তির পাশেই ছিল একটা মাঠ। শৈশবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা এ মাঠেই ফুটবল খেলেছেন কুনিয়া। তা ছাড়া বাবার সঙ্গে ফুটসাল কোর্টেও বুনেছেন ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন।
অন্য অনেক ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারের মতো আর্থিক কষ্টে শৈশব না কাটলেও ছোটবেলার সময়টা মসৃণ ছিল না কুনিয়ার। বর্ণবৈষম্য ও আঞ্চলিক বিদ্বেষের মুখোমুখি হতে হয়েছে। ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষদের বিদ্রূপ করে অনেক সময় ‘পারাইবা’ বলে ডাকা হয়।
কুনিয়ার শৈশবের সবচেয়ে বড় কষ্ট ছিল পরিবার ছেড়ে যাওয়া। মাত্র ১৩ বছর বয়সে হাজার কিলোমিটার দূরে কুরিতিবায় পাড়ি দিয়েছিলেন ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে। একজন কিশোরের জন্য নতুন শহর, নতুন পরিবেশ, পরিবার থেকে দূরে থাকা সহজ ব্যাপার ছিল না। তবে শৈশবের এই ত্যাগই মানসিকভাবে শক্ত করেছে কুনিয়াকে।
কতটা? তার প্রমাণ পাওয়া যায় কুনিয়ার বারবার ট্রায়ালে রিজেক্ট হওয়ার ঘটনায়। দেখা যেত কোথাও কোচদের চোখে তার প্রতিভার ঘাটতি, কোথাও আবার ট্রায়ালের সুযোগ পর্যন্ত পেতেন না। এ ধরনের ঘটনায় অনেকে হাল ছেড়ে দেন। কিন্তু শৈশবেই মানসিক দৃঢ়তার প্রাচীর গড়া কুনিয়া বুঝেছিলেন, ব্রাজিলে পথ বন্ধ হয়ে গেলে অন্য কোথাও খুঁজতে হবে সুযোগ।
যেমন চিন্তা, তেমন কাজ। ২০১৭ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে পাড়ি দেন ইউরোপে, ঠিকানা সুইজারল্যান্ডের এফসি সিওন। পরিবার, বন্ধু, পরিচিত পরিবেশ— সবকিছু ছেড়ে অচেনা এক দেশে পাড়ি দিয়ে জীবনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিটাই সম্ভবত নিয়েছিলেন তিনি। জানতেন সুইজারল্যান্ডের ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া ভীষণ কঠিন হবে তার। লক্ষ্য যার শিখরে ওঠার, তার কাছে এসব চ্যালেঞ্জ হয়ে যায় জীবনের অংশ।
জীবন তাকে হতাশ করেনি। মাত্র এক বছর পরই ডাক আসে আরবি লাইপজিগ থেকে। জার্মান ক্লাবটিতে নিয়মিত খেলা হয়নি, তবে সুযোগ মিলতেই দেখিয়েছেন প্রতিভার ঝলক। ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ডের সামর্থ্য দেখেই দলে ভেড়ায় হের্থা বার্লিন। এখানেই গতি পায় ক্যারিয়ারের। শুধু গোল করে নয়, মাঠে সৃজনশীলতা ও আক্রমণভাগে বহুমুখী ভূমিকায় বার্লিনে নজর কাড়েন তিনি।
বার্লিনের পারফরম্যান্স দেখেই আতলেতিকো মাদ্রিদ মোটা অঙ্কে কিনে নেয় তাকে। তবে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিন সময় সম্ভবত এখানেই পার করেছেন কুনিয়া। দলে জায়গা পাওয়ার প্রতিযোগিতা, সীমিত সুযোগ ও প্রত্যাশার বিশাল চাপে একপ্রকার চ্যাপ্টা অবস্থা তার।
ব্যর্থতার দুই মৌসুমে উলভারহ্যাম্পটন তার কাছে আসে চরম আশীর্বাদ হয়ে। ধারে প্রিমিয়ার লিগের দলটিতে খেলতে গিয়ে পরে স্থায়ী হয়ে জীবনের নতুন অধ্যায় খুঁজে পান। প্রিমিয়ার লিগের দ্রুতগতির ফুটবল তার সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে উড়তে থাকেন রীতিমতো। উলভারহ্যাম্পটনে ক্যারিয়ারের সেরা সময় কাটিয়ে এখন মাঠ মাতাচ্ছেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের জার্সিতে।
আচ্ছা, জাতীয় দলের ব্রাজিলের কথা বলাই হয়নি! ব্রাজিলে ফরোয়ার্ডের অভাব কখনোই ছিল না। কিন্তু কুনিয়ার বিশেষত্ব হলো— তিনি শুধু স্ট্রাইকার নন; প্রয়োজনে উইঙ্গার, সেকেন্ড স্ট্রাইকার কিংবা আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডারের ভূমিকাও পালন করতে পারেন। এই বহুমুখিতাই তাকে আলাদা করেছে। যদিও পাঁচ বছরের ক্যারিয়ারে খেলার সুযোগ খুব একটা আসেনি।
এখানে ২০২২ বিশ্বকাপের কথা আলাদাভাবে আসবেই। ওই বছরের নভেম্বরের এক বিকাল। ব্রাজিলের তৎকালীন কোচ তিতে কাতার বিশ্বকাপের দল ঘোষণা করছিলেন। কুনিয়া টিভির সামনে বসা। নিজের নাম জানার অধীর অপেক্ষা তার। কিন্তু হলো না। সুযোগ না পেয়ে টিভির সামনে বসে অঝোরে কেঁদেছিলেন সেদিন। তার বুকফাটা কান্নার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছুঁয়ে যায় লাখো ফুটবলপ্রেমীকে।
চার বছর পর বদলে গেল সব। এবারের বিশ্বকাপে গায়ে জড়ালেন ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী ‘৯ নম্বর’ জার্সি। হাইতির বিপক্ষে একাদশে সুযোগ পেয়ে করলেন জোড়া গোল। দুটি গোলেই তার ‘সার্ফিং’ উদযাপন এখন আলোচনায়। শুধু হাইতি ম্যাচ নয়, তার এই ট্রেডমার্ক উদযাপন ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে গভীরভাবে। ফুটবলের বাইরে নিয়মিত সার্ফিং করেন। ব্রাজিলে ছুটিতে গেলে ঢেউয়ের ওপর সময় কাটাতে ভালোবাসেন তিনি। তাই গোল উদযাপনের সময় তিনি সার্ফবোর্ডে চড়ার ভঙ্গি করে ফুটিয়ে তোলেন নিজের সেই ভালোবাসাকে।
কুনিয়ার জাদুকরী পারফরম্যান্স বিশ্বমঞ্চে ফিরিয়ে এনেছেন চেনা ব্রাজিলকে। আর নিজে বস্তির পাশের মাঠ থেকে হয়েছেন ব্রাজিলের জয়ের নায়ক। তার এই সাফল্যযাত্রা অনেক তরুণ ফুটবলারের জন্য হতে পারে অনুপ্রেরণার। যিনি ট্রায়ালে রিজেক্ট হয়েছেন, দেশ ছেড়েছেন, ব্যর্থতার তলানিতে পৌঁছেছেন, সমালোচনা শুনেছেন— তবু থামেননি। এক দরজা বন্ধ হলে খুঁজেছেন নতুন দরজা। অন্যরা কটু কথা বললে নিজের ওপর রেখেছেন বিশ্বাস।
কুনিয়া প্রমাণ করেছেন— প্রতিভা নিয়ে যেতে পারে দরজার সামনে, তবে সেই দরজা খুলতে হলে দরকার পরিশ্রম, চেষ্টা ও আত্মবিশ্বাস।