বিশ্বকাপ এমন একটি মঞ্চ, যেখানে তরুণ ফুটবলাররা মুহূর্তেই নিজেদের প্রতিভা দিয়ে বিশ্ব তারকায় পরিণত হওয়ার সুযোগ পান। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ২০২৬ বিশ্বকাপে এবারও এমন অনেক তরুণ খেলোয়াড় আলোচনায় রয়েছেন, যারা ভবিষ্যতের ফুটবল সুপারস্টার হয়ে উঠতে পারেন।
দল সংখ্যা বৃদ্ধি, নতুন ফরম্যাট এবং তিন দেশে যৌথ আয়োজনের কারণে এবারের আসরটি ইতোমধ্যেই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে এই মহাযজ্ঞের মাঝেও সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছেন উদীয়মান তরুণ ফুটবলাররা, যারা নিজ নিজ দলের ভবিষ্যৎ ভরসা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এবার প্রথমবারের মতো অংশ নেবে ৪৮টি দল, যেখানে আগে খেলত ৩২টি দল। ম্যাচ সংখ্যাও বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ১০৪টি, যা আগে ছিল ৬৪টি। বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে ১১ জুন মেক্সিকো সিটির কিংবদন্তি এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়ামে। এই ম্যাচের মধ্য দিয়েই স্টেডিয়ামটি গড়বে অনন্য ইতিহাস। কারণ ১৯৭০, ১৯৮৬ ও ২০২৬—তিনটি ভিন্ন বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ আয়োজনের রেকর্ড হবে এর দখলে।
আলোচনায় আছেন যারা—
জামাল মুজিয়ালা (জার্মানি)
২০১৬ সালে জামাল মুসিয়ালা ইংল্যান্ড অনূর্ধ্ব-১৫ দলের হয়ে বয়সভিত্তিক পর্যায়ে তার আন্তর্জাতিক যাত্রা শুরু করেন। এরপর প্রায় পাঁচ বছর তিনি ইংল্যান্ড ও জার্মানি উভয় দেশের বয়সভিত্তিক দলে প্রতিনিধিত্ব করেন। পরবর্তীতে ২০২১ সালে তিনি জার্মানির সিনিয়র জাতীয় দলে অভিষেক করেন। এখন পর্যন্ত তিনি জার্মানির জার্সিতে ৮টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন।

তিনি জার্মানির হয়ে উয়েফা ইউরো ২০২০ আসরেও অংশগ্রহণ করেন। ক্লাব পর্যায়ে বায়ার্ন মিউনিখের এই তরুণ তারকা এখন পর্যন্ত মোট ৭টি শিরোপা জিতেছেন, যার মধ্যে ১টি বায়ার্ন মিউনিখ-২ এবং ৬টি মূল বায়ার্ন মিউনিখ দলের হয়ে অর্জন করেছেন। এবারের বিশ্বকাপেই জামাল মুসিয়ালার বড় মঞ্চে অভিষেক হতে যাচ্ছে।
রায়ান (ব্রাজিল)
ব্রাজিলের বিশ্বকাপ দলে জায়গা পেয়েছেন তরুণ স্ট্রাইকার রায়ান। ইংলিশ ক্লাব বোর্নমাউথে যোগ দেওয়ার পর থেকেই দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে আলোচনায় উঠে এসেছেন ১৯ বছর বয়সী এই ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার। আর সেই পারফরম্যান্সই তাকে জায়গা করে দিয়েছে কার্লো আনচেলত্তির বিশ্বকাপ স্কোয়াডে।

প্রিমিয়ার লিগে পা রেখেই নিজের শক্তি, গতি ও গোল করার সামর্থ্য দিয়ে নজর কেড়েছেন রায়ান। জানুয়ারির শেষদিকে ভাস্কো দা গামা থেকে বোর্নমাউথে যোগ দেন তিনি। দলটিতে যোগ দেওয়ার পরপরই মাঠে নামানো হয় তাকে। খুব দ্রুতই বোঝাতে শুরু করেন কেন এই তরুণ স্ট্রাইকারের পেছনে ৩৫ মিলিয়ন ইউরো খরচ করেছে ইংলিশ ক্লাবটি। এছাড়াও তিনি ব্রাজিল অনূর্ধ্ব-১৫ ও অনূর্ধ্ব-১৭ দলে খেলেছেন।
আরদা গুলের (তুর্কি)
২০২১ সালে, গুলের তুরস্ক অনূর্ধ্ব-১৭ দলের হয়ে তুরস্কের বয়সভিত্তিক পর্যায়ে অভিষেক করেছিলেন। প্রায় এক বছর যাবৎ তুরস্কের বয়সভিত্তিক দলের হয়ে খেলার পর, তিনি ২০২২ সালে তুরস্কের হয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অভিষেক করেছেন; তুরস্কের জার্সি গায়ে তিনি এ পর্যন্ত ৪ ম্যাচে ১টি গোল করেছেন।
নিকো পাজ (আর্জেন্টিনা)
নিকো পাজ আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের খেলোয়াড় পাবোলো পাজের ছেলে। যদিও তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা স্পেনে, তবু তিনি বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পাজ রিয়াল মাদ্রিদের একাডেমির একজন প্রতিভাবান খেলোয়াড়। পরে ইতালির ক্লাব কোমোতে যোগ দিয়ে সাবেক স্প্যানিশ মিডফিল্ডার সেস্ক ফ্যাব্রেগাসের অধীনে খেলেন এবং সেখানে খুব দ্রুত উন্নতি করেন।

এতটাই যে ২১ বছর বয়সী এই তরুণের পারফরম্যান্স দেখে তাকে আবার দলে ফেরানোর পরিকল্পনা করছে রিয়াল। দুর্দান্ত টেকনিক, দূর থেকে গোল করার ক্ষমতা এবং আক্রমণাত্মক মানসিকতার কারণে ইউরোপের ক্লাবগুলোও তার দিকে বিশেষ নজর দিচ্ছে। যদিও এখনো দল ঘোষণা করেনি এই তিনবারের বিশ্বকাপ জয়ী এ দলটি। ধারণা করা হচ্ছে এবারের আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনির ভরসার জায়গা হয়ে দলে নাম লেখাতে পারেন তিনি।
লামিন ইয়ামাল (স্পেন)
লামিনে ইয়ামাল স্পেনের একজন প্রতিভাবান যুব আন্তর্জাতিক ফুটবলার। ২০২১ সালে তিনি স্পেন অনূর্ধ্ব-১৬ দলের হয়ে ৪টি ম্যাচে অংশগ্রহণ করেন এবং ১টি গোল করেন। পরের বছর, ২০২২ সালে তিনি স্পেন অনূর্ধ্ব-১৫ দলেও প্রতিনিধিত্ব করেন। ২০২৩ সালে তিনি স্পেন অনূর্ধ্ব-১৭ দলের হয়ে উয়েফা ইউরোপীয় অনূর্ধ্ব-১৭ চ্যাম্পিয়নশিপে খেলেন, যেখানে দলটি সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছায়। এই টুর্নামেন্টে তিনি ৫টি ম্যাচে ৪টি গোল করেন।
২০২৪ সালে সিনিয়র পর্যায়ে স্পেন জাতীয় দলের হয়ে উয়েফা ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিয়ে ফ্রান্সের বিপক্ষে ডি-বক্সের বাইরে থেকে দুর্দান্ত এক গোল করেন, যা ছিল তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের প্রথম গোল। এই গোলের মাধ্যমে তিনি স্পেনকে ফাইনালে পৌঁছাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বর্তমানে তিনি স্পেনের শীর্ষ লিগ লা লিগার ক্লাব বার্সেলোনা এবং স্পেন জাতীয় দলের আক্রমণভাগে খেলছেন।
নিকো ও’রাইলি (ইংল্যান্ড)
২১ বছর বয়সী ও’রাইলি এরই মধ্যে পেপ গার্দিওলার আস্থাভাজন হয়ে ম্যানচেস্টার সিটির নিয়মিত খেলোয়াড়ে পরিণত হয়েছেন। মার্চে লিগ কাপ ফাইনালে আর্সেনালের বিপক্ষে সিটির জয়ে বাঁ প্রান্তের ডিফেন্ডার (লেফটব্যাক) হিসেবে খেলেও দুই গোল করেছেন। তবে মজার বিষয় হলো, ও’রাইলি ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন গোল স্কোরিং মিডফিল্ডার হিসেবে।

গার্দিওলা ও’রাইলির উচ্চতা, গতি ও কারিগরি দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে তাকে রক্ষণ থেকে আক্রমণে ওঠা এক ভয়ংকর অস্ত্রে পরিণত করেছেন। তা করেই হয়ত ইংল্যান্ড কোচ টমাস টুখেলেরও একটি বড় সমস্যা সমাধান করে দিয়েছেন। কারণ, ইংল্যান্ড দল ইউরো ২০২৪–এর ফাইনালে উঠলেও পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে প্রকৃত লেফটব্যাকের অভাবে ভুগেছিল। লুক শর ফিটনেস সমস্যার কারণে সেই জায়গা বেশ দুর্বল ছিল। ও’রাইলি সেই অভাব দারুণভাবে মেটাতে সক্ষম।
দেজিরে দুয়ে (ফ্রান্স)
দেজিরে দুয়ে ফ্রান্সের ২০ বছরের তরুণ, যার প্রতিভা নিয়েও প্রশ্ন নেই। এরই মধ্যে ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে প্রমাণ করেছেন নিজের সামর্থ্য। গত বছর পিএসজির হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে ইন্টার মিলানকে বড় ব্যবধানে হারানোর পথে জোড়া গোল করে ম্যাচসেরাও হয়েছেন। তবে বিশ্বকাপই হবে দুয়ের প্রথম বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট, অর্থাৎ জাতীয় দলের হয়ে বড় আসরে খেলার প্রথম অভিজ্ঞতা।
এনদ্রিক (ব্রাজিল)
অল্প বয়সেই আলোচনায় এসেছেন এনদ্রিক। মাত্র ১৬ বছর বয়সে পালমেইরাসের মূল দলে অভিষেক। এরপর ১৮ বছর হওয়ার আগেই তাকে দলে ভেড়ায় রিয়াল মাদ্রিদ। তবে মাদ্রিদে যোগ দেওয়ার পর নিয়মিত সুযোগ পাচ্ছিলেন না। কারণ, দলে আগে থেকেই ছিলেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও কিলিয়ান এমবাপ্পের মতো বড় তারকা। ফলে এনদ্রিক কিছুটা আড়ালে পড়ে যান। পরে ফ্রান্সের ক্লাব লিওঁতে ধারে গিয়ে আবার নিজের সেরা ছন্দ ফিরে পেয়েছেন। ফিরে এসেছে তার গোল করার ধারাও।

আন্তর্জাতিক ফুটবলেও নজর কাড়তে খুব একটা সময় নেননি। দুই বছর আগে ওয়েম্বলিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয়সূচক গোল করে ব্রাজিলের হয়ে সবচেয়ে কম বয়সে গোল করার রেকর্ডটি কেড়ে নিয়েছেন রোনালদোর কাছ থেকে। এনদ্রিকের ছোটখাটো কিন্তু শক্তিশালী শারীরিক গঠন দেখে অনেকেই তাকে ব্রাজিল কিংবদন্তি রোমারিওর সঙ্গে তুলনা করেন। এবারের বিশ্বকাপটি তার ক্যারিয়ারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট হয়ে উঠতে পারে।
গিলবার্তো মোরা (মেক্সিকো)
গিলবার্তো রাফায়েল মোরা জামব্রানো, যিনি গিলবার্তো মোরা নামে বেশি পরিচিত, একজন প্রতিভাবান মেক্সিকান পেশাদার ফুটবলার। তিনি বর্তমানে লিগা এমএক্সের ক্লাব টিজুয়ানা এবং মেক্সিকো জাতীয় দলের হয়ে আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার হিসেবে খেলছেন। ২০০৮ সালে জন্ম নেওয়া এই ১৭ বছর বয়সী তরুণ ফুটবলার তার অসাধারণ ভিশন, ড্রিবলিং দক্ষতা এবং বল নিয়ন্ত্রণের জন্য বিশ্ব ফুটবলে দ্রুতই আলোচনায় আসেন। তাকে বর্তমান প্রজন্মের অন্যতম উদীয়মান ‘ওয়ান্ডারকিড’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এবারের বিশ্বকাপটি তার প্রতিভাকে বিশ্ব মঞ্চে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হতে পারে।
মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি ক্লাব টিজুয়ানার হয়ে লিগা এমএক্সে অভিষেক করেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই গোল করে লিগার ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতার রেকর্ড গড়েন।