বিনা পারিশ্রমিকে দুই হাজারের বেশি কিডনি প্রতিস্থাপন করা প্রখ্যাত চিকিৎসক অধ্যাপক কামরুল ইসলামের কাছে চাঁদা দাবির ঘটনা এখন টক অব দ্য কান্ট্রি। কালের কণ্ঠে প্রতিবেদন প্রকাশের পর তোলপাড় চলছে প্রশাসনে। চাঁদাবাজচক্রের প্রধান হিসেবে রাজধানীর শেরেবাংলানগর থানা যুবদলের সাবেক নেতা মো. মঈন উদ্দিন মঈনের নাম আসায় বিব্রত বিএনপির শীর্ষ মহল।
ঘটনার পরদিন শনিবার (১১ এপ্রিল) মঈন উদ্দিনের বিষয়ে বিস্তর অনুসন্ধানে নামে কালের কণ্ঠ।
বেরিয়ে আসে শুধু ডা. কামরুল ইসলামের হাসপাতালে নয়, শেরেবাংলানগর থানা এলাকায় গত দেড় বছরের বেশি সময় ধরে অপরাধ সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন মঈন। যুবদল নেতা পরিচয় দিয়ে হেন কোনো অপরাধ নেই যা তিনি করেননি। হত্যা, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, সরকারি বাড়ি দখল, জমি দখল পরিণত হয়েছে নিয়মিত ঘটনায়। মঈন বাহিনীর খপ্পর থেকে মসজিদ-মাদরাসার মতো প্রতিষ্ঠানও রেহাই পায়নি।
তাঁর দাপটের কাছে স্থানীয় বিএনপি নেতারাও অসহায়।
ভয়ংকর এই অপরাধচক্রের কারণে আতঙ্কে দিন কাটছে স্থানীয়দের। থানা-পুলিশ সবই এত দিন ছিল মঈনের হাতের মুঠোয়। ফলে এলাকাবাসী বহু অপকর্মের সাক্ষী হলেও প্রকাশ্যে আনতে ভয় পাচ্ছে।
কালের কণ্ঠের কাছে তাঁরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে তুলে ধরেছেন মঈন বাহিনীর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিবরণ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মঈনের অপরাধের প্রধান সহযোগী মাইনুদ্দিন। স্থানীয়ভাবে মাদক ও অস্ত্র কারবারি হিসেবে পরিচিত মাইনুদ্দিনের বিরুদ্ধে আছে হত্যা মামলা। হত্যা মামলার আরেক আসামি রুবেলও এই চক্রের সদস্য। এ ছাড়া ফালান, মোহন, মোশারফ, মামুন, জসীমসহ আরো কয়েকজনের নাম জানা গেছে।
স্থানীয় কিশোর গ্যাংয়ের নেতৃত্ব দিচ্ছে চক্রটি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শেরেবাংলানগর থানা এলাকায় গডফাদারের ভূমিকায় আবির্ভূত হন মঈন উদ্দিন মঈন। নিজেকে শেরেবাংলানগর থানা যুবদলের প্রতিষ্ঠাকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক দাবি করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দখল, চাঁদাবাজি শুরু করেন।
শ্যামলী ৪ নম্বর রোডের মাদরাসাতুল কাউসার আল-ইসলামিয়া মাদরাসাও তাঁর বাহিনীর হাত থেকে রেহাই পায়নি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শিক্ষক বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে আমরা কেউ মঈনকে চিনতাম না। সরকার পতনের পর তিনি এলাকায় এসে আধিপত্য বিস্তার শুরু করেন। মাদরাসায় প্রতিদিন একটা বড় অঙ্কের বাজেটের সবজি কিনতে হয়। হঠাৎ মঈন উদ্দিন ছেলেপেলে নিয়ে এসে তাঁর কাছ থেকে সবজি কেনার জন্য চুক্তি করতে চান। তবে আমরা রাজি হইনি। কারণ আমরা যেখানে কম দাম পাই সেখান থেকে সবজি কিনি। বিষয়টি নিয়ে মঈন তখন অনেক হুমকি ও ঝামেলা তৈরি করেছিলেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘২০২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর গাজীপুরের টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমার মাঠে তাবলিগ জামাতের দুই পক্ষের সংঘর্ষের পর এক পক্ষের কিছু লোক আমাদের মাদরাসায় আসেন। আমরা তাঁদের চলে যেতে বলি। কারণ তখন পরিস্থিতি ভালো ছিল না। পরে মঈন ওই তাবলিগের লোকদের নিয়ে এসে বলেন, তিনি তাঁদের গার্ডিয়ান। মঈন আমাদের বলেন, এখন যদি মাদরাসা বন্ধ করে দিই তাহলে কী করবেন? পরে বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপে আমরা রেহাই পাই।’
মাদরাসার আরেক শিক্ষক বলেন, ‘এর কিছুদিন পরে আমরা মাদরাসা বড় করার জন্য ভেঙে ফেলার পরিকল্পনা করি। তিনতলা ভবনে জায়গা স্বল্পতায় আমাদের অনেক কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু মঈন এসে বলেন ভাঙতে হলে ভবনটি তাঁর কাছে বিক্রি করতে হবে। তা ছাড়া নতুন ভবন করতে হলে তাঁর কাছ থেকে বালু, রড, সিমেন্ট থেকে শুরু করে সবকিছু কিনতে হবে। পরে মাদরাসা আর বড় করা হয়নি।’
মাদরাসার বিপরীত পাশেই জান্নাতুল ফেরদৌস মসজিদ এবং একটু সামনে সড়ক ও জনপথ স্টাফ কোয়ার্টার জামে মসজিদের অবস্থান। দুই মসজিদ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এই দুই মসজিদ কমিটি ভেঙে দেন মঈন। পরে নতুন কমিটিতে নিজের পছন্দের লোক বসান। তবে স্থানীয় ও বিএনপির অন্য নেতাদের চাপে ওই কমিটি আবার ভেঙে দিয়ে নতুন কমিটি করা হয়। সেখানেও বসানো হয়েছে তাঁর পছন্দের লোকজন।
স্থানীয় বাসিন্দা ও বিএনপি নেতারা জানান, জান্নাতুল ফেরদৌস মসজিদের পরবর্তী অংশ থেকে শ্যামলীর প্রধান সড়ক পর্যন্ত বেশ কয়েকটি দোকান বসিয়েছেন মঈন। খালের পারের এই সড়কে বৈদ্যুতিক বাতি অকেজো দেড় বছর ধরে। মাদক কারবারের জন্য বিদ্যুতের লাইনের দায়িত্বে থাকা মো. আলতাফকে টাকা দিয়ে হাত করে বিদ্যুৎ বন্ধ রেখেছেন মঈন। সন্ধ্যার পর এখানে বসে ‘মাদকের হাট’। হেরোইন, ইয়াবা ও গাঁজা বিক্রি হয় স্থানীয় কিশোর-তরুণের কাছে। এই স্পটে মঈনের মাদক বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করেন মাইনুদ্দিন। অন্ধকার থাকায় এখানে ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটছে নিয়মিত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বাসিন্দা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাদক কেনার জন্য কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা এলাকায় ছিনতাই করে। তারা এলাকায় নারীদের উত্ত্যক্ত করছে। শুধু এখানেই নয়, পুরা এলাকাতেই মঈনের মাদকের বিভিন্ন স্পট ও সিন্ডিকেট রয়েছে।’
এদিকে সড়ক ও জনপথ স্টাফ কোয়ার্টার এলাকার বাসিন্দারা জানান, কলোনির ৩০টি ঘর দখল করেছেন মঈন। স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতার দাবি, এলাকার পাঁচতলা গার্মেন্টস থেকে নিয়মিত চাঁদা যায় তাঁর কাছে।
স্থানীয় ভুক্তভোগীরা জানান, ৫ আগস্টের পর মঈন বেশ কিছু দোকান ভেঙে দেন। পরে সেগুলো আবার নির্মাণ করে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন। এসব দোকানভেদে দৈনিক ও সাপ্তাহিক চাঁদা তোলা হচ্ছে।
গত ঈদে গরিব মানুষকে খাওয়ানোর কথা বলে এলাকার মানুষের কাছ থেকে চাঁদা তোলেন মঈন। কয়েকজন চাঁদা দিতে না চাইলে তাঁদের মারধর করার অভিযোগও পাওয়া গেছে। তবে মঈনের ভয়ে ভুক্তভোগীরা কেউ নাম প্রকাশে রাজি হননি।
গোয়েন্দা তথ্য, স্থানীয়দের বক্তব্য ও অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের শ্যামলী এলাকায় ১০ থেকে ১৫টি আবাসিক হোটেল রয়েছে। এসব হোটেলে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক সরবরাহ করেন মঈন। অনেক হোটেলে চলে রমরমা যৌন ব্যবসা। এর নিয়ন্ত্রণও মঈনের হাতে। হোটেলগুলো থেকে মাসিক চাঁদা নেয় তাঁর বাহিনী।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালেও ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে মঈন বাহিনী। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও অ্যাম্বুলেন্সচালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হাসপাতালের সামনে অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের কাছ থেকে মাসোহারা নেওয়া হয়। ফুটপাতের দোকানেও চলছে চাঁদাবাজি।
সম্প্রতি জান্নাতুল ফেরদৌস মসজিদের পূর্ব পাশে ব্যক্তি মালিকানাধীন ১০ কাঠার একটি জমিতে ভবন নির্মাণ শুরু হলে মঈন তাঁর দলবল নিয়ে কাজ বন্ধ করে দেন। এই জমির মালিক দুজন। একজন মালিকের এক আত্মীয় ও ডেভেলপার কম্পানির কর্মকর্তারা জানান, অনেক দিন ধরে জায়গাটির ওপর মঈনের নজর ছিল। সম্প্রতি ভবনের কাজ শুরু করতে গেলে বাধা দেওয়া হয়।
জমির মালিকপক্ষের এক স্বজন বলেন, ‘মঈন আমাদের বলেন এখানে সরকারি জায়গা আছে। ডেভেলপার কম্পানির কর্মীরা কাজ শুরু করতে গেলে তাঁদের মারধর করা হয়। পরে তিনি তাঁর ইচ্ছামতো বাউন্ডারি দিয়ে গেছেন।’
অনুসন্ধানে জানা যায়, ৫ আগস্টের পর এই এলাকার ডিস ও ইন্টারনেট সংযোগ, গ্যাস সিলিন্ডার এবং ময়লার ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নেন মঈন। তাঁর কথার বাইরে সেবা মেলে না। এ ছাড়া এলাকায় ফিল্টার পানি ও ডিমের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে মঈনের বাহিনী।
কিছুদিন আগে কাজী অফিস গলি কাঁচাবাজারের পেছনে বিল্লাল নামের এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে মঈন তিন লাখ টাকা চাঁদা নেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিল্লালের সঙ্গে স্থানীয় এক নারীর জমি নিয়ে বিরোধ রয়েছে। মঈন মীমাংসার কথা বলে বিল্লালের কাছ থেকে চাঁদা নেন। দুই পরিবারের মীমাংসার সময় উপস্থিত এক বিএনপি নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমরা সেখানে গিয়ে পড়েছি বিপদে। মঈন একজনের হয়ে জমি দখল করতে গেছেন। পরে শুনলাম বিল্লাল চাচার কাছ থেকে তিন লাখ টাকা নিয়েছেন।’
পাহাড় সমান অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মঈনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া গেছে। ডা. কামরুল ইসলামের কাছে চাঁদা দাবির ঘটনা নিয়ে তোলপাড়ের পর থেকে আলোচিত মঈন পলাতক।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে শেরেবাংলানগর থানার ওসি মনিরুল ইসলাম কালের কণ্ঠের কাছে দাবি করেন, ‘এত দিন তাঁর কাছে তেমন কোনো অভিযোগ আসেনি। এখন অপরাধের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়ায় তাঁকে গ্রেপ্তার করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’