চাঁদ নিয়ে মানুষের মনে প্রশ্নের শেষ নেই। এর জন্ম কোথা থেকে বা কীভাবে— সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে দীর্ঘদিন ধরে একটি তত্ত্বের ওপর নির্ভর করে আসছেন বিজ্ঞানীরা। সে অনুযায়ী, প্রায় ৪৫০ কোটি বছর আগে মঙ্গল গ্রহের আকারের একটি মহাজাগতিক বস্তু পৃথিবীর সঙ্গে ভয়াবহ সংঘর্ষে জড়ায়। ওই সংঘর্ষে ছিটকে যাওয়া বিপুল ধ্বংসাবশেষ থেকেই পরে সৃষ্টি হয় চাঁদ।
তবে নতুন এক গবেষণা বলছে, চাঁদের জন্মের এই গল্পে আরও গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিষয় এতদিন যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি— পৃথিবী ও সেই মহাজাগতিক বস্তু ‘থেইয়া’র তাপমাত্রা এবং তাদের উপাদানের শক্তি। সংঘর্ষের সময় এই দুই বৈশিষ্ট্যই চাঁদ কীভাবে এবং কত দ্রুত তৈরি হবে, তা প্রভাবিত করতে পারে উল্লেখযোগ্যভাবে।
চাঁদের জন্মের রহস্য নিয়ে নতুন এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে ‘কোলিশনাল ক্যাপচার অব অ্যান ইনট্যাক্ট মুন ডিপেন্ডস অন স্ট্রেংথ’ শিরোনামের গবেষণাপত্রে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে দ্য অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটার্সে।
ইন্ডিপেনডেন্টে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন গবেষণায় পৃথিবী ও থেইয়ার সংঘর্ষের কম্পিউটারভিত্তিক বিভিন্ন সিমুলেশন তৈরি করেছেন বিজ্ঞানীরা। এতে সংঘর্ষের সময় দুই বস্তুর তাপমাত্রা, বস্তুগত শক্তি এবং তাপমাত্রার সঙ্গে সেই শক্তির পরিবর্তনও নেওয়া হয় হিসাবের মধ্যে।
গবেষণার নেতৃত্ব দেওয়া সাউথওয়েস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী অ্যাডিন ডেন্টন জানিয়েছেন, সংঘর্ষে অংশ নেওয়া বস্তুগুলোর শক্তি ও তাপমাত্রা ‘যথেষ্টই গুরুত্বপূর্ণ’।
গবেষকদের সিমুলেশনে দেখা গেছে, সংঘর্ষের সময় পৃথিবী ও থেইয়া কতটা উত্তপ্ত ছিল, তার ওপর সংঘর্ষের ফল নির্ভর করতে পারে অনেকটাই। কারণ সাধারণভাবে কোনো বস্তু যত বেশি উত্তপ্ত হয়, সেটি তত দুর্বল হয়ে পড়ে। বিপরীতে ঠান্ডা বস্তু তুলনামূলকভাবে থাকে বেশি শক্ত। এই পার্থক্যই চাঁদ তৈরির প্রক্রিয়ায় আনতে পারে বড় পরিবর্তন।
কিছু সিমুলেশনে দেখা গেছে, সংঘর্ষের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তৈরি হতে পারে একটি প্রায় অক্ষত চাঁদ। অন্যদিকে, কিছু পরিস্থিতিতে সংঘর্ষের ফলে পৃথিবীকে ঘিরে তৈরি হয় বিপুল ধ্বংসাবশেষের একটি বলয়। পরে সেই ধ্বংসাবশেষ ধীরে ধীরে একত্র হয়ে পরিণত হতে পারে চাঁদে।
ডেন্টনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সংঘর্ষের আগে পৃথিবী ও থেইয়া কতটা উত্তপ্ত ছিল, তার ওপর নির্ভর করে থেইয়া পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে বিপুল ধ্বংসাবশেষের বলয় তৈরি করতে পারে। সেই বলয় থেকেই পরে গড়ে উঠতে পারে চাঁদ। কিন্তু একই সংঘর্ষে দুই বস্তুর ভেতরের তাপমাত্রার কাঠামো ভিন্নভাবে বিবেচনা করলে পরিস্থিতি বদলে যায়। কিছু সিমুলেশনে দেখা গেছে, মাত্র প্রায় পাঁচ ঘণ্টার মধ্যেই তৈরি হতে পারে একটি অক্ষত চাঁদ।
২০০১ সালে বৃহৎ সংঘর্ষের মাধ্যমে চাঁদ সৃষ্টির তত্ত্ব বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা বিজ্ঞানী রবিন ক্যানাপ নতুন গবেষণায় যুক্ত ছিলেন না। তবে গবেষণাটির ফলাফলকে তিনি বিস্ময়জাগানিয়া ও রোমাঞ্চকর বলে মন্তব্য করেছেন।