সহিংসতার অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। ভুক্তভোগীদের বেশিরভাগই নারী। জরিপের তথ্য বলছে, ৮৯ শতাংশ নারীই অনলাইন সহিংসতার শিকার হলেও অভিযোগ করেন না ৭৫ শতাংশ। সাইবার সহিংসতা রুখতে এসব প্ল্যাটফর্মে নজরদারি বাড়ানো এবং আইনের কঠোর প্রয়োগের তাগিদ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
কিছু অশোভন মন্তব্য, কিছু আপত্তিকর শব্দ, কিছু কটু বাক্য; অনেক সময় এগুলোই এলোমেলো করে দিচ্ছে অনেক সম্ভাবনাময় জীবন। আলোকিত পৃথিবী মুহূর্তেই হয়ে উঠছে বিষাক্ত। অযাচিত এসব কারণে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে হতাশা আর আতঙ্ক। এসবের বেশিরভাগই ঘটছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ঘিরে।
মানুষের যাপিত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ এখন সামাজিক মাধ্যম। তবে প্রায়ই দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অনেকেই ব্যবহার করছেন বাছবিচারহীনভাবে। মত প্রকাশের নামে অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ণ করা হচ্ছে। কখনো কখনো ব্যক্তিগত আক্রমণও করা হচ্ছে রুচিহীনভাবে।
ভুক্তভোগী এক নারী জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আর কিছুই প্রকাশ করি না, নিজের ছবি বা পরিবারের কোনো বিষয়ও না, কারণ আমার এসব প্রকাশ করতে ভালো লাগে না।
আরেক নারী জানান, সামাজিক মাধ্যমে ইতিবাচক কোনো বিষয়ও অনেক সময় নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়। ভালো কোনো বিষয় হলেও মন্তব্যগুলো প্রায়ই নেগেটিভ থাকে।
নাগরিক অধিকারের দোহাই দিয়ে বর্তমানে সহিংসতার বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে সামাজিক মাধ্যম। নামে-বেনামে আইডি খুলে সামাজিক, সাংস্কৃতিক কিংবা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মানহানির ঘটনা নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপতথ্য ও ছবি বিকৃত করে উসকে দেয়া হচ্ছে সহিংসতাও।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারী নারীদের প্রায় ৮৯ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে অনলাইন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৭৫ শতাংশই লজ্জা বা সামাজিক ভয়ের কারণে অভিযোগ করেন না।
বাংলাদেশ এনজিও নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশনের মতে, প্রযুক্তির অপব্যবহারের ফলে অনলাইন ব্ল্যাকমেইল, পরিচয় চুরি, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসসহ নানা ধরনের অপরাধের শিকার হচ্ছেন মানুষ।
বাকস্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের আড়ালে যদি গুজব, বিদ্বেষ ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দেয়া হয়, তবে তা সমাজের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অপব্যবহার এখন উদ্বেগের বড় কারণ। প্রশ্ন উঠছে; স্বাধীনতা আর ডিজিটাল সন্ত্রাসের সীমারেখা কোথায়?
এই পরিস্থিতির জন্য সমাজে শিক্ষার অভাব, সামাজিক অবক্ষয় ও রুচির দুর্ভিক্ষকে দায়ী করছেন সমাজবিজ্ঞানীরা। অপরাধ ও সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. নেহাল করিম বলেন, সমাজের এই অবক্ষয় থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং একই সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকেই মূল্যবোধের চর্চা শুরু করা। তা না হলে পরিবর্তন আনা কঠিন।
পুলিশ বলছে, সাইবার সহিংসতা রুখতে তাদের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উপ-কমিশনার (গণমাধ্যম বিভাগ) এন এম নাসিরউদ্দিন বলেন, আলামত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের পর্যাপ্ত সক্ষমতার অভাবে অপরাধ শনাক্ত ও অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা কিছুটা চ্যালেঞ্জিং হচ্ছে।
বর্তমানে দেশে কয়েক কোটি মানুষ মানুষ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করেন। তাই সাইবার অপরাধ রোধে সরকারের কঠোর উদ্যোগ নেয়া ছাড়া বিকল্প নেই বলে মনে করেন প্রযুক্তি ও আইন সংশ্লিষ্টরা।