Image description

ভারতে তরুণদের হতাশা, বেকারত্ব ও রাজনৈতিক অসন্তোষের প্রতীক হয়ে উঠেছে এক ব্যতিক্রমী আন্দোলন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হওয়া ব্যঙ্গাত্মক এই উদ্যোগ এখন লাখো তরুণের কণ্ঠস্বর হিসেবে আলোচনায় এসেছে।

মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও অভিজিৎ দীপকে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা শেষ করা হাজারো ভারতীয় শিক্ষার্থীর একজন, যিনি চাকরির খোঁজে ছিলেন। কিন্তু একটি মন্তব্য তার জীবন বদলে দেয়। সম্প্রতি বেকার তরুণদের ‘তেলাপোকা’র সঙ্গে তুলনা করে মন্তব্য করেন ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত।

 

এই মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় গত ১৬ মে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে অভিজিৎ প্রশ্ন তোলেন, ‘যদি সব তেলাপোকা একসঙ্গে হয়ে যায়?’ সেই পোস্ট দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায় এবং হাজারো তরুণ তার আহ্বানে সাড়া দেন।

ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত ও অভিজিৎ দীপকেভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত ও অভিজিৎ দীপকে

 

 

এরপর অভিজিৎ বন্ধুদের সহায়তা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সাহায্যে মাত্র দুই ঘণ্টায় তৈরি করেন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র ওয়েবসাইট। দলটির ঘোষণাপত্রে বলা হয়, এটি এমন তরুণদের জন্য, যাদের অলস, সারাক্ষণ অনলাইনে থাকা কিংবা এখন ‘তেলাপোকা’ বলে অপমান করা হচ্ছে।

 

অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই আন্দোলনটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিজেপির কিছু অ্যাকাউন্ট ভারতের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর চেয়েও বেশি অনুসারী অর্জন করে। বর্তমানে দলটির নিবন্ধিত সদস্য সংখ্যা ১০ লাখের বেশি বলে দাবি করা হয়েছে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, এই জনপ্রিয়তা ভারতের তরুণ সমাজের গভীর হতাশার প্রতিফলন। বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল বড় অর্থনীতির দেশ হওয়া সত্ত্বেও ভারতের বিপুলসংখ্যক তরুণ এখনও কর্মসংস্থানের সংকটে ভুগছে।

 

ভারতের ২০২৫ সালের পিরিয়ডিক লেবার ফোর্স সার্ভে অনুযায়ী, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের বেকারত্বের হার প্রায় ১০ শতাংশ, যা দেশের সামগ্রিক বেকারত্বের হার থেকে অনেক বেশি।

ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ম্যাসকট। ছবি: সংগৃহীতককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ম্যাসকট। ছবি: সংগৃহীত

 

 

চাকরির প্রতিযোগিতাও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ২০২২ সালে মাত্র ৩৫ হাজার রেলওয়ের চাকরির জন্য আবেদন করেন প্রায় এক কোটি মানুষ। ফলে উচ্চশিক্ষিত অনেক তরুণও বাধ্য হয়ে স্বল্প আয়ের কাজে যুক্ত হচ্ছেন।

 

দিল্লির ২২ বছর বয়সী রূপক যাদব স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেও বর্তমানে খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সুইগির ডেলিভারি কর্মী হিসেবে কাজ করছেন। তার ভাষায়, আমি ইচ্ছা করে এটা করছি না। চাকরি কোথায়? আমরা সবাই একসময় শুধু ডেলিভারি পার্টনার হয়েই থাকব।

 

সম্প্রতি ভারতের মেডিকেল কলেজ ভর্তি পরীক্ষার ফল বাতিল হওয়ায় তরুণদের হতাশা আরো বেড়েছে । প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থীকে আবারো পরীক্ষা দিতে হবে বলে জানানো হয়েছে।

 

এদিকে ‘ককরোচ জনতা পার্টির জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকায় ভারতীয় কর্তৃপক্ষ জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে দলটির এক্স অ্যাকাউন্ট বন্ধের নির্দেশ দেয় বলে দেশটির বিভিন্ন গণমাধ্যম জানিয়েছে। পরে অভিজিৎ নতুন অ্যাকাউন্ট ‘ককরোচ ইজ ব্যাক’ চালু করেন।

 

তবে তিনি সমর্থকদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের আহ্বান জানিয়েছেন। আন্দোলনটি নিয়ে ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ও নেপালের ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে তুলনাও করা হচ্ছে।

ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ওয়েবসাইট। ছবি: সংগৃহীতককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ওয়েবসাইট। ছবি: সংগৃহীত

 

 

অভিজিৎ দীপকে আগে দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত আম আদমি পার্টির স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেছিলেন। যদিও তিনি দাবি করেছেন, ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ সম্পূর্ণ স্বাধীন একটি আন্দোলন হিসেবেই থাকবে।

 

দলটির প্রথম উদ্যোগ হিসেবে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করে একটি অনলাইন পিটিশন চালু করা হয়েছে। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় অনিয়মের দায়ে তার পদত্যাগ দাবি করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রায় আট লাখ মানুষ সেই পিটিশনে স্বাক্ষর করেছেন বলে দাবি করা হয়েছে।

 

অভিজিৎ বলেন, তেলাপোকা শব্দটি আমরা নামের মধ্যেই রাখব। কারণ মানুষ যেটিকে ঘৃণা করে, সেটিই সবচেয়ে টিকে থাকার ক্ষমতাসম্পন্ন প্রাণীদের একটি। অপমান হিসেবে ছুড়ে দেওয়া শব্দটিকেই এখন তরুণরা গর্বের প্রতীক বানিয়ে ফেলেছে।

 

সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস