বর্তমান ডিজিটাল যুগে হেডফোন বা ইয়ারফোন ছাড়া দৈনন্দিন জীবন যেন কল্পনাই করা যায় না। গান শোনা, অনলাইন ক্লাস, অফিস মিটিং, সিনেমা দেখা কিংবা গেম খেলা—সব ক্ষেত্রেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কানে হেডফোন লেগেই থাকে। কিন্তু এই অভ্যাসই ধীরে ধীরে ক্ষতি করতে পারে আপনার শ্রবণশক্তির।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় উচ্চ ভলিউমে অডিও শোনা কানের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হতে পারে। আর এই ঝুঁকি কমাতেই তারা পরামর্শ দিচ্ছেন সহজ একটি নিয়ম মেনে চলার, যার নাম ‘৬০-৬০ নিয়ম’।
‘৬০-৬০’ নিয়ম কী?
এই নিয়মের ধারণা খুবই সহজ। হেডফোন ব্যবহার করার সময় ভলিউম সর্বোচ্চ মাত্রার ৬০ শতাংশের বেশি রাখা যাবে না আর একটানা ৬০ মিনিটের বেশি ব্যবহার করা যাবে না।
এক ঘণ্টা ব্যবহারের পর অন্তত ৫ থেকে ১০ মিনিট বিরতি নেওয়া উচিত। এতে কানের ওপর চাপ কম পড়ে এবং ভেতরের সংবেদনশীল কোষগুলো বিশ্রাম পায়।
কেন এই নিয়ম এত গুরুত্বপূর্ণ?
আমাদের কানের ভেতরে খুব সূক্ষ্ম কিছু হেয়ার সেল বা সংবেদনশীল কোষ থাকে, যেগুলো শব্দ শনাক্ত করতে সাহায্য করে। অতিরিক্ত জোরে শব্দ শুনলে এই কোষগুলো ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, একবার এই কোষ নষ্ট হয়ে গেলে তা আর আগের অবস্থায় ফিরে আসে না।
ফলে ধীরে ধীরে শ্রবণশক্তি কমে যাওয়া, কানে ভোঁ ভোঁ শব্দ হওয়া, শব্দ পরিষ্কার না শোনা, মাথাব্যথা ও ক্লান্তি আর মনোযোগের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তরুণদের মধ্যেই এখন সবচেয়ে বেশি এই ঝুঁকি দেখা যাচ্ছে, কারণ তারা দীর্ঘ সময় ধরে মোবাইল ও হেডফোন ব্যবহার করেন।
কোন ভলিউম নিরাপদ?
সাধারণভাবে এমন ভলিউম নিরাপদ ধরা হয়, যেখানে আপনি আশপাশের মানুষের কথা কিছুটা শুনতে পারেন। যদি পাশের কেউ ডাকলেও শুনতে না পান, তাহলে বুঝতে হবে ভলিউম অনেক বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৮৫ ডেসিবেলের বেশি শব্দ দীর্ঘ সময় শুনলে কানের ক্ষতি হতে পারে। অনেক স্মার্টফোনে এখন Volume Limit বা শব্দসীমা নির্ধারণ করার সুবিধাও রয়েছে। সেটি ব্যবহার করাও ভালো অভ্যাস।
নিরাপদ হেডফোন ব্যবহারের আরও কিছু উপায়
নয়েজ ক্যান্সেলিং হেডফোন ব্যবহার করুন: বাইরের শব্দ কমিয়ে দেয় বলে কম ভলিউমেই পরিষ্কার শব্দ শোনা যায়। এতে কানের ওপর চাপ কম পড়ে।
ঘুমানোর সময় হেডফোন ব্যবহার এড়িয়ে চলুন: অনেকে গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়েন। এতে দীর্ঘ সময় কানে শব্দ চলতে থাকে, যা ক্ষতিকর হতে পারে।
কানে ব্যথা বা অস্বস্তি হলে বিরতি নিন: হেডফোন ব্যবহারের সময় কানে চাপ, ব্যথা বা অস্বাভাবিক শব্দ শুনলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহার বন্ধ করুন।
শিশুদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা
শিশুদের কান তুলনামূলক বেশি সংবেদনশীল। তাই তাদের ক্ষেত্রে ভলিউম আরও কম রাখা উচিত।
নিয়মিত পরিষ্কার করুন
অপরিষ্কার ইয়ারফোনে জীবাণু জমে কানে সংক্রমণও হতে পারে। তাই নিয়মিত পরিষ্কার রাখা জরুরি।
প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে ঠিকই, কিন্তু অসচেতন ব্যবহার স্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ‘৬০-৬০’ নিয়মটি খুব ছোট একটি অভ্যাস হলেও দীর্ঘমেয়াদে আপনার শ্রবণশক্তি রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তাই আজ থেকেই সচেতন হোন। ভলিউম কমান, নির্দিষ্ট সময় পর বিরতি নিন এবং নিজের কানকে সুস্থ রাখুন।
সূত্র: প্রযুক্তি