ডিজিটাল লেনদেনের প্রসারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সাইবার প্রতারণা ও ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি। সহজে বড়লোক হওয়ার প্রলোভন, অনলাইনে সস্তায় ডলার কেনাবেচা, ফেসবুক মনিটাইজেশন, সাবস্ক্রাইবার বৃদ্ধি কিংবা ডিজিটাল ওয়ালেট ব্যবহারের নামে প্রতিদিন প্রতারণার শিকার হচ্ছেন হাজারো মানুষ। অভিনব কৌশলে ক্রেডিট কার্ড, মোবাইল ব্যাংকিং ও অনলাইন ওয়ালেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে সংঘবদ্ধ চক্র।
সম্প্রতি বাংলাদেশী মিঠু নামের এক যুবক ক্রেডিট নাম্বার দিলে আমেরিকা প্রবাসী আরেক বাঙালী তার ক্রেডিট কার্ড স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে মুহূর্তেই ৮০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়।
বাংলাদেশে এক চাকরিজীবি অনলাইনে ইউটিউবে মনিটাইজেশন ও ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পড়ে বিকাশ নাম্বার দিয়ে টাকা হারিয়েছেন। হ্যাকাররা তার বিকাশ নাম্বার অটো জেনারেট করে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বিকাশ থেকে ৫০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এ রকম ঘটনা অহরহ ঘটছে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আর্থিক তথ্য ফাঁস হয়ে গেলে শুধু অর্থ খোয়ানোর ঝুঁকিই নয়, বরং একজন ব্যক্তির ডিজিটাল পরিচয়ও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে হ্যাকাররা। এর মাধ্যমে ভুক্তভোগীর নামে ব্যাংক ঋণ নেওয়া, অনলাইন অ্যাকাউন্ট দখল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ, এমনকি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার আশঙ্কাও তৈরি হয়।
সম্প্রতি ভারতে স্ট্যাট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার প্রায় ৩৫০ জন গ্রাহক প্রতারণার শিকার হয়ে ২ দশমিক ৬ কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ছয় মাস তদন্তের পর পুলিশ এ ঘটনায় ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।
সস্তা ডলারের ফাঁদে নিঃস্ব হচ্ছেন সাধারণ মানুষ
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বাংলাদেশে শতাধিক ওয়েবসাইট ও পাঁচ শতাধিক ফেসবুক গ্রুপ-পেজে চলছে অনলাইনে ডলার কেনাবেচার নামে প্রতারণা। ‘পেপাল’, ‘ওয়েবমানি’, ‘স্ক্রিল’, ‘নেটেলার’ কিংবা অন্যান্য অনলাইন ওয়ালেটের জন্য কম দামে ডলার দেওয়ার লোভ দেখিয়ে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতারকরা।
প্রতারকরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে দাবি করছে— “মাত্র ৭৪ টাকায় ডলার কিনুন”। আগ্রহীরা যোগাযোগ করার পর বিকাশ বা অন্য মোবাইল ব্যাংকিং মাধ্যমে টাকা পাঠান। এরপরই বন্ধ হয়ে যায় ফোন নম্বর, ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেজ।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, দেশে অনলাইনে ডলার কেনাবেচার কোনো বৈধ অনুমতি নেই। অনুমোদিত ব্যাংক ও মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠান ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন সম্পূর্ণ অবৈধ।
ফেসবুক মনিটাইজেশন ও সাবস্ক্রাইবার বাড়ানোর নামে প্রতারণা
সাম্প্রতিক সময়ে ফেসবুক ও ইউটিউব মনিটাইজেশন সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নামে নতুন প্রতারণা শুরু হয়েছে। প্রতারকরা দাবি করে নির্দিষ্ট অর্থ দিলেই দ্রুত মনিটাইজেশন, ফলোয়ার বা সাবস্ক্রাইবার বাড়িয়ে দেওয়া হবে।
ভুক্তভোগী রাজু হাসান জানান, ফেসবুকে দেওয়া একটি বিজ্ঞাপনে ক্লিক করে তিনি একটি ডিজিটাল ফর্ম পূরণ করেন। প্রথমে সামান্য অর্থ পাঠানোর পর তার বিকাশ অ্যাকাউন্ট থেকে দুই হাজার টাকা উধাও হয়ে যায়। পরে তিনি বুঝতে পারেন, প্রতারকরা তার মোবাইল ব্যাংকিং তথ্য হাতিয়ে নিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব প্রতারণার মাধ্যমে শুধু টাকা নয়, ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্যও সংগ্রহ করা হচ্ছে। পরে সেই তথ্য ব্যবহার করে অ্যাকাউন্ট হ্যাক, পরিচয় চুরি কিংবা আর্থিক জালিয়াতি করা হচ্ছে।
ভুয়া এনআইডি, টিন ও ব্যাংক স্টেটমেন্টের ভয়ংকর বাজার
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, অনলাইনে মাত্র কয়েকশ টাকার বিনিময়ে ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র, টিন সার্টিফিকেট, ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও অন্যান্য নথি তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে।
এসব নথি ব্যবহার করে প্রতারকরা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে ও ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্মে একাধিক অ্যাকাউন্ট খুলছে। পরে সেই অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে অর্থ পাচার, জালিয়াতি ও সাইবার অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে।
তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী মেহরাজ হোসেন রবিন বলেন, গ্রাফিক্স সফটওয়্যার ব্যবহার করে তৈরি এসব ভুয়া নথি সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে সক্ষম। ফলে ডিজিটাল প্রতারণার পাশাপাশি বাস্তব জীবনেও নানা অপরাধ সংঘটনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
ক্রেডিট কার্ড হ্যাকিংয়ের ঝুঁকি বাড়ছে
অফলাইন ও অনলাইন কেনাকাটায় ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে হ্যাকিং ও তথ্য চুরির ঝুঁকিও।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির বলেন, একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত তথ্য, পাসওয়ার্ড বা অ্যাকাউন্ট রিকভারি ডেটা ফাঁস হয়ে গেলে হ্যাকাররা সহজেই তার অ্যাকাউন্ট দখল করতে পারে। এমনকি তার নামে নতুন ক্রেডিট কার্ড ইস্যু করেও আর্থিক জালিয়াতি করা সম্ভব।
অন্যদিকে টেকনো হেভেন কোম্পানি লিমিটেডের এর ফাউন্ডার ও সিইও হাবিবুল্লাহ এন করিম বলেন, ডিজিটাল পরিচয় চুরি এখন বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে। হ্যাকাররা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইমেইল, ব্যাংকিং অ্যাপসহ বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে।
যেভাবে নিরাপদ থাকবেন
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু মৌলিক সতর্কতা অনুসরণ করলেই বড় ধরনের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব।
- কখনোই OTP, CVV, PIN বা পাসওয়ার্ড কারও সঙ্গে শেয়ার করবেন না
- সন্দেহজনক ফোনকল বা লিংকে ক্লিক করা থেকে বিরত থাকুন
- নিয়মিত ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও লেনদেন পর্যবেক্ষণ করুন
- পাবলিক ওয়াই-ফাই ব্যবহার করে আর্থিক লেনদেন করবেন না
- শক্তিশালী আলফা-নিউম্যারিক পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন
- টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন চালু রাখুন
- শুধুমাত্র অফিসিয়াল অ্যাপ স্টোর থেকে অ্যাপ ডাউনলোড করুন
- প্রয়োজনে ক্রেডিট কার্ড লক বা ব্লক করুন
- সন্দেহজনক লেনদেন দেখলে দ্রুত ব্যাংক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানান
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসনিক নজরদারি ও আইনগত ব্যবস্থা জোরদারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ডিজিটাল সচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া এই সাইবার প্রতারণা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
সাইবার অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, ডিজিটাল অর্থনীতির এই সময়ে ব্যক্তিগত তথ্যই সবচেয়ে বড় সম্পদ। তাই অনলাইনে যেকোনো আর্থিক লেনদেনের আগে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ঢাকাটাইমস