Image description

মেহেরপুর পৌরসভার হোটেল বাজার এলাকার বাসিন্দা ব্যবসায়ী তৌহিদুল আজম। গত ৫ মার্চ দুপুরে ফেসবুক মেসেঞ্জারে একটি লাইভ টেলিভিশন সার্ভারের লিংক পান তিনি। কৌতূহলবশত ওই লিংকে ক্লিক করতেই একটি অ্যাপ ইনস্টল হয় তার মোবাইল ফোনে। এরপর থেকে ফোনে অস্বাভাবিক কার্যক্রম দেখতে পান তিনি। সন্দেহ হওয়ায় দ্রুত অ্যাপটি আনইনস্টল করেন আজম। তারপরও দেখতে পান তার নির্দেশনা ছাড়াই ফোনের স্ক্রিনে নিজে নিজেই নানা কার্যক্রম চলছে।

ফোনের নিয়ন্ত্রণ অন্য কারও হাতে চলে গেছে—এমনটি মনে হওয়ায় আজম তার ফোন বন্ধ করে রাখলেও শেষরক্ষা হয়নি। কিছুক্ষণ পর তিনি খেয়াল করেন, মোবাইলে আর্থিক লেনদেনের একটি অ্যাপের মাধ্যমে তার ফোন থেকে ২৫ হাজার টাকা অন্য নম্বরে স্থানান্তর হয়েছে। অথচ তৌহিদুল আজম ওই অ্যাপ থেকে কোনো লেনদেনই করেননি।

এ ঘটনায় প্রতিকার পেতে মেহেরপুর সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন আজম। সদর থানার ওসি (তদন্ত) শিমুল দাস এশিয়া পোস্টকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। পুলিশের সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, ব্যবসায়ী তৌহিদুল আজমের জিডির তদন্তের সূত্র ধরে মেহেরপুরে সংঘবদ্ধ সাইবার প্রতারণার এক উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এসেছে। ধারণা করা হচ্ছে এর পেছনে একটি সক্রিয় সাইবার প্রতারণা চক্র কাজ করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রলোভননির্ভর ফিশিং লিংক এখন সাইবার প্রতারণার প্রধান হাতিয়ার। ব্যবহারকারীদের অজ্ঞতা ও অসতর্কতাকে কাজে লাগায় প্রতারকরা।

 

যেভাবে উধাও ২৫ হাজার টাকা
ভুক্তভোগী তৌহিদুল আজম তার জিডিতে উল্লেখ করেছেন, গত ৫ মার্চ সিটি ব্যাংকের একটি শাখা থেকে তার ডাচ-বাংলা ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে কিছু টাকা ট্রান্সফার করা হয়। এর কিছুক্ষণ পর দুপুরের দিকে তার মেসেঞ্জারে ‘খরাব খবীচ্’ নামে একটি লাইভ টেলিভিশন সার্ভারের লিংক আসে। কৌতূহলবশত লিংকটিতে ক্লিক করে অ্যাপটি মোবাইলে ইনস্টল করেন। এরপর থেকেই তার ফোনে অস্বাভাবিক আচরণ শুরু হয়। সন্দেহ হওয়ায় দ্রুত অ্যাপটি মুছে ফেলে ফোন বন্ধ করে দেন।

 

কিছু সময় পর ফোন চালু করার পরও আজমের মনে হতে থাকে তার ফোনে অজ্ঞাত কোনো ভাইরাস হয়তো সক্রিয় রয়েছে। এমনকি ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও পিন লক থাকা সত্ত্বেও আজমের মনে হয় তার ফোনের নিয়ন্ত্রণ অন্য কারও হাতে চলে গেছে। তারপরও বিষয়টি নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাননি আজম। বরং বিকেলের দিকে তিনি তার ফোনে নগদ, রকেট, বিকাশ ও নেক্সাস পেসহ কয়েকটি মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপ ব্যবহার করেন।

কিন্তু সন্ধ্যায় বন্ধুদের সঙ্গে শহরের একটি রেস্তোরাঁয় ইফতার করতে গিয়ে হঠাৎ তিনি খেয়াল করেন, তার ফোনের স্ক্রিনে নিজে নিজেই বিভিন্ন কার্যক্রম চলছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে তিনি আবারও ফোনটি বন্ধ করে দেন।

 

পরে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের একটি বুথে গিয়ে টাকা উত্তোলনের সময় স্টেটমেন্ট পরীক্ষা করে দেখেন, তার রকেট অ্যাকাউন্ট থেকে ২৫ হাজার টাকা স্থানান্তর করা হয়েছে। তবে আজম নিজে এ লেনদেন করেননি।

তৌহিদুল আজম এশিয়া পোস্টকে বলেন, অচেনা লিংকে ক্লিক করে প্রতারিত হওয়ার বিষয়টি নিয়ে শুরুতে মুখ না খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। প্রথমে ভেবেছিলাম, বিষয়টি লজ্জার, কাউকে জানাব না। কিন্তু পরে মনে হলো, বিষয়টি সামনে আনা উচিত যাতে মানুষ সচেতন হয়। তাই মেহেরপুর সদর থানায় জিডি করেছি। মিডিয়ায় ঘটনাটি প্রকাশ হলে সাইবার দুষ্কৃতকারীদের শাস্তির আওতায় আনা সহজ হবে বলে আমি মনে করি।

 

এ বিষয়ে জেলা পুলিশের বক্তব্য জানতে চাইলে মেহেরপুর জেলা পুলিশের মিডিয়া ফোকাল পারসন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জামিনুর রহমান খান এশিয়া পোস্টকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে সাইবার ইউনিট কাজ করছে। বিস্তারিত জানতে গোয়েন্দা পুলিশের ওসির সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন তিনি।

 

মেহেরপুরে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ওসি মুহাদ্দিদ মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে এটি একটি পরিকল্পিত সাইবার প্রতারণা। ফিশিং লিংকের মাধ্যমে ভুক্তভোগীর মোবাইলে অননুমোদিত প্রবেশাধিকার নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জিডির ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হয়েছে।

 

অনুসন্ধানে উঠে এল সংঘবদ্ধ প্রতারণার চিত্র
তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, তৌহিদুল আজমের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা পাঠানো হয়েছে ০১৮******২৪৮ নম্বরের একটি বিকাশ অ্যাকাউন্টে। অ্যাকাউন্টধারীর নাম রেহেনা আক্তার, ঠিকানা কক্সবাজার জেলার রামু উপজেলার নয়াচর ঢাকমারকুল এলাকা।

 

তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে জানা যায়, যে সিম নম্বর দিয়ে রেহেনা আক্তারের বিকাশ পরিচালিত হয় সেটি নিবন্ধিত রংপুর সদর উপজেলার চন্দনপাট মণ্ডলপাড়া এলাকার শিরিনা বেগমের নামে। ২০২৫ সালের ১০ জুলাই পর্যন্ত রাজবাড়ীর বসন্তপুর এলাকায় সক্রিয় ছিল। এরপর থেকে নম্বরটি বন্ধ থাকলেও বিকাশ অ্যাকাউন্টে লেনদেন অব্যাহত রয়েছে।

 

তদন্তে আরও জানা গেছে, আজমের মোবাইল থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার দিন রেহেনা আক্তারের ওই বিকাশ অ্যাকাউন্টে ২৫ হাজার টাকা করে মোট সাতটি লেনদেন হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ওই দিন একইভাবে আজমের মতো আরও কয়েকজন প্রতারণার শিকার হয়েছেন।

 

এশিয়া পোস্টের নিজস্ব অনুসন্ধানে এ বিষয়ে আরও নানা তথ্য বেরিয়ে এসেছে। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য বলছে, প্রতারণায় ব্যবহৃত মোবাইল সেটটির আইএমইআই নম্বর ৩৫০*********২৫০ এবং সংশ্লিষ্ট সিমের আইএমএসআই নম্বর ৪৭০*********৯৬৮ (রবি)। একই সিম স্লটে গত তিন মাসে ৭০টিরও বেশি সিম কার্ড ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে, যা স্পষ্টতই একটি সংঘবদ্ধ চক্রের কার্যক্রমের ইঙ্গিত দেয়। ফোনটির অপর সিম স্লটে ব্যবহৃত নম্বরগুলোর তথ্য এখনও সংগ্রহ করা হচ্ছে।

 

খোঁজ নিতে গিয়ে আরও জানা যায়, একই প্রক্রিয়ায় ফিশিং লিংক ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকা আত্মসাৎ, মোবাইলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গ্যালারির ব্যক্তিগত ছবি ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মতো ঘটনাও ঘটছে। কিন্তু ফিশিং লিংকে ক্লিক করার বিষয়টিকে অনেকে লজ্জাজনক ঘটনা বলে মনে করেন। তাই সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার ভয়ে প্রতারিত অনেকে এ নিয়ে মুখ খোলেন না, আইনি পদক্ষেপেও যান না।

 

এ ব্যাপারে কী সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত তা জানতে কথা হয় প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ জামশেদ সুমনের (ছদ্মনাম) সঙ্গে। তিনি একজন অভিজ্ঞ ইথিক্যাল হ্যাকার—যিনি বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ব্যাংকের সাইবার সিকিউরিটি অ্যানালিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, প্রলোভননির্ভর ফিশিং লিংকই এখন সাইবার প্রতারণার প্রধান হাতিয়ার। ব্যবহারকারীদের অজ্ঞতা ও অসতর্কতাকেই কাজে লাগায় প্রতারকরা। হ্যাকাররা যেমন প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ হচ্ছে, তেমনি সাধারণ ব্যবহারকারীদেরও সচেতন ও প্রযুক্তিবান্ধব হতে হবে।