Image description

রাজধানীর সার্কিট হাউস রোডস্থ তথ্য ভবনে চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিএফপি) এর কক্ষে গতকাল সোমবার সন্ধ্যার পরে শর্টফিল্মের টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে রক্তারক্তি হয়ে গেছে। ডিএফপির ডিজিসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সামনেই জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা সরকারি ক্যামেরাম্যান সোহাগ মশিউরের ওপর হামলা করেছেন। তাকে আটকিয়ে বাইরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টাও করেন এনসিপির নেতারা। এই পর্যায়ে সোহাগ মশিউরের ছোট ভাইসহ আত্মীয়স্বজন তাকে উদ্ধার করতে এলে উভয় পক্ষে সংঘর্ষ বেধে যায়। ক্যামেরাম্যান সোহাগ মশিউরসহ বেশ কয়েকজন এ ঘটনায় আহত হয়েছেন এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ঘটনার পরে ডিজির কক্ষে ফ্লোরে রক্তের দাগ লেগে ছিল। কর্মচারীরা দ্রুত এসব মুছে ফেলতে দেখা গেছে।

এ ঘটনার পরে রাতে ডিএফপির ডিজি খালেদা বেগমের কাছে শীর্ষনিউজের পক্ষ থেকে ফোনে জানতে চাওয়া হলে, তিনি প্রকৃত ঘটনা এড়িয়ে পুরো দায় উল্টো ক্যামেরাম্যান সোহাগ মশিউরের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে ডিজি খালেদা বেগমকে অনেক বিচলিত মনে হচ্ছিল। সব কথার জবাব দিতেও পারছিলেন না তিনি।

শীর্ষনিউজের পক্ষ থেকে প্রকৃত কারণ উদঘাটন করতে গিয়ে হামলা ও সংঘর্ষের বিষয় ছাড়াও সরকারি অর্থ আত্মসাতের ভয়াবহ রকমের তথ্য পাওয়া গেছে। তথ্য মন্ত্রণালয় এবং চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের ছত্রছায়ায় এসব অর্থ আত্মাসাত হয়েছে। জানা গেছে, তথ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে জুলাই অভ্যুত্থানের ওপর ২০টি শর্টফিল্প তৈরির সিদ্ধান্ত নেয় ডিএফপি। এরজন্য ব্যয় ধরা হয় ২ কোটি টাকা। ডিএফপির ফান্ড থেকেই এ অর্থ ব্যয়ের জন্য কর্মসূচি নির্ধারণ করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী ডিএফপির প্রতিনিধিরা-ই এ শর্টফিল্মগুলো তৈরির দায়িত্ব পাওয়ার কথা। কিন্তু এর পরিবর্তে শর্টফিল্প তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয় এনসিপি নেতাদের। তাও আনঅফিসিয়ালি। সিদ্ধান্ত হয়, শর্টফিল্পের বিলগুলো ইস্যু হবে ডিএফপির বিভিন্ন ক্যামেরাম্যানের নামে। চেকও ইস্যু হবে তাদের নামে। চেক পাওয়ার পর ব্যাংক থেকে টাকা তুলে সেই টাকা তারা এনসিপি নেতাদের হাতে হস্তান্তর করবেন। কাজগুলো শুরু হয় অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে উপদেষ্টা এবং সচিবের তত্ত্বাবধানেই।

জানা গেছে, শর্টফিল্মের বিল এবং চেকগুলো ইস্যু হয়েছে ডিএফপির ক্যামেরাম্যান সোগাহ মশিউর, ইউসুফ, লুৎফর, জাকারিয়া, মাহমুদ ও শেখ আলী আহমেদ-এর নামে। সোহাগ মশিউরের নামে দুটি শর্টফিল্মের ২২ লাখ টাকার বিল ইস্যু হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্যামেরাম্যানের নামে ৪টি শর্টফিল্মের ৩৮ লাখ টাকার বিল ইস্যু হয়েছে। এনসিপি নেতারা এসব শর্টফিল্ম তৈরি বাবদ বিলের ৫০% টাকা রমজানের আগেই নিয়ে গেছেন। সিদ্ধান্ত ছিল, সঠিকভাবে শর্টফিল্ম এবং হার্ডড্রাইভ বুঝিয়ে দেওয়ার পর বাকি ৫০% টাকা পাবেন তারা। কিন্তু এনসিপি নেতারা যথাযথভাবে শর্টফিল্ম বুঝিয়ে না দিয়েই বাকি টাকার জন্য ক্যামেরাম্যনদের ওপর চাপ দিচ্ছিলেন। জানা গেছে, এভাবে চাপ প্রয়োগ করে অধিকাংশ ফিল্মের পুরো টাকা তারা ইতিমধ্যে নিয়েও গেছেন। যদিও ২০টি শর্টফিল্মের মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ৪টি জমা দেওয়া হয়েছে। তাও অত্যন্ত নিম্নমানের। যে শর্টফিল্মের দাম ধরা হয়েছে ১২ লাখ টাকা, এটি নির্মাণ করতে ২ লাখ টাকাও খরচ হয়নি, বলছেন সংশ্লিষ্টরা। যথাযথভাবে শর্টফিল্ম তৈরি বা জমা না দিয়েই বিল আদায় করে নেওয়ার অপকর্ম চলছিল ডিএফপি কর্মকর্তাদের ছত্রছায়ায়ই। স্বয়ং ডিজি খালেদা বেগম এ বিষয়ে সরাসরি ভূমিকা রাখছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

জানা গেছে, সোহাগ মশিউর তার নামে ইস্যু হওয়া দুটি শর্টফিল্মের বিলের ৫০% শতাংশ টাকা রমজানের আগেই এনসিপি নেতাদের কাছে হস্তান্তর করেছেন। এনসিপি নেতারা চাপ প্রয়োগ করছিলেন ফিল্ম বুঝিয়ে না দিয়েই পুরো টাকা আদায় করে নিতে। এ ব্যাপারে ডিজি খালেদা বেগমও এনসিপি নেতাদের পক্ষ হয়ে বিভিন্ন সময়ে তার ওপর প্রভাব খাটাচ্ছিলেন। সর্বশেষ গতকাল সন্ধ্যা ছয়টার পরে ডিজি খালেদা বেগম ফোনে ক্যামেরাম্যান সোহাগ মশিউরকে তার রুমে ডেকে নেন। ডিজির কক্ষে এনসিপি নেতারা আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন।

এনসিপি নেতারা এবং ডিজি নিজেও মশিউরকে বলছিলেন বিলের বাকি টাকা পরিশোধ করতে। কিন্তু মশিউর বার বারই বলছিলেন, ফিল্ম এবং ফিল্মের হার্ডড্রাইভ বুঝে না পাওয়া পযন্ত বাকি টাকা পরিশোধ করা সম্ভব নয়। কারণ ভবিষ্যতে তাকেই এরজন্য জবাবদিহি করতে হবে। এ নিয়ে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে ক্যামেরাম্যান মশিউরের ওপর এনসিপি নেতারা হামলা করেন। ডিজি খালেদা বেগমের উপস্থিতিতেই এসব ঘটে। মারধোরের এক পর্যায়ে মশিউরকে সেখান থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ারও চেষ্টা চলে। এরই মধ্যে খবর পোঁছে যায় মশিউরের ছোটভাই (যিনি হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজের সাবেক ছাত্রদল নেতা) এর কাছে। খবর পেয়ে তারসঙ্গে কিছু ছাত্র এবং আত্মীয়স্বজন ডিএফপিতে দৌড়ে আসেন সোহাগ মশিউরকে উদ্ধারের জন্য। ডিজির রুমেই উভয় পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি এবং মারপিট কয়। ক্যামেরাম্যান সোহাগ মশিউরসহ বেশ কয়েকজন জখম হন। জখম হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে এনসিপি নেতাও রয়েছেন। সংঘর্ষের পরে ডিজি খালেদা বেগমের কক্ষে মেঝে জমাট বাঁধা রক্ত পড়ে থাকতে দেখা যায়। ডিজি খালেদা বেগম দ্রুত এগুলো পরিষ্কার করার ব্যবস্থা করেন।
রাতে শীর্ষনিউজ ডটকমের পক্ষ থেকে ডিজি খালেদা বেগমের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি পুরো ঘটনার দায় ক্যামেরাম্যান সোহাগ মশিউরের ওপর চাপানোর চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু ঘটনার সূত্রপাত কোথায় থেকে, জানতে চাওয়া হলে তিনি আমতা আমতা করেন। তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, সোহাগ মশিউর আহত হয়েছেন কীভাবে? তাকেও তো আহত এবং হাসপাতালে ভর্তি হতে দেখা গেছে? এ প্রশ্নের জবাবে ডিজি খালেদা বেগম বলেন, মশিউরের হার্টের সমস্যা আছে।

মঙ্গলবার এ বিষয়ে সোহাগ মশিউরের সঙ্গে যোগাযোগ করে তার কাছেও জানতে চাওয়া হয়েছিল। মশিউর ডিজির বক্তব্যকে ‘সত্য নয়’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, সন্ধ্যা ছয়টার পরে তাকে ফোনে ডিজি ডেকে নিয়েছেন। ডিজির কক্ষে এনসিপি নেতারাও বেশ কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন। শর্টফিল্ম বাবদ বিলের পুরো টাকা এনসিপি নেতারা তাদের হাতে হস্তান্তরের জন্য বলেন। ডিজি খালেদা বেগমও একই কথা বলেন। ফিল্ম এবং ফিল্মের হার্ডকপি ছাড়া পুরো টাকা দেওয়া সম্ভব নয়, এ কথা বলার পরই তারা ক্ষেপে যান এনসিপি নেতারা। মারপিট শুরু করেন।

শীর্ষনিউজ