এই দাবানল সৃষ্টিকারী স্ফুলিঙ্গের সূত্রপাত কোনো যুদ্ধ বা সীমান্ত সংঘাত দিয়ে হয়নি, এমনকি কোনো দেশলাই থেকেও নয়। শুরুটা জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে, যখন আইপিএলের ফ্র্যাঞ্চাইজি কলকাতা নাইট রাইডার্স থেকে বাংলাদেশের পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে নীরবে বাদ দেওয়া হয়।
কিন্তু সেই একটি পদক্ষেপই ধীরে ধীরে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। যার চূড়ান্ত রূপ দেখা যাচ্ছে পাকিস্তানের এক সিদ্ধান্তে— আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি কলম্বোতে ভারতের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ম্যাচটি তারা বয়কটের ঘোষণা দিয়েছে। অর্থাৎ মোস্তাফিজের বাদ পড়ার বিতর্কিত একটি সিদ্ধান্ত থেকে এই পরিস্থিতি এখন পুরোদস্তুর ভূ-রাজনৈতিক ও ক্রীড়া সংকটে রূপ নিয়েছে।
মাঠের বাইরে তাই এখন কান পাতা দায়। প্রশাসক, রাজনীতিবিদ, সাবেক খেলোয়াড়, সম্প্রচারকারী থেকে শুরু করে সাধারণ ভক্তরা পর্যন্ত— সবাই যে যার মতো করে পক্ষ নিচ্ছেন, কেউ দেখাচ্ছেন আনুগত্য আবার কেউ উগরে দিচ্ছেন ক্ষোভ।
অথচ যে কারণে মূলত বিশ্বকাপের অস্তিত্ব, সেই ক্রিকেটই আড়ালে পড়ে গেছে। বড় বড় সব বিবৃতি আর কূটনৈতিক মারপ্যাঁচের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে দলগুলোর প্রস্তুতি ও সম্ভাবনা। খেলা আর মাঠের ২২ গজে নেই, চলে গেছে বোর্ড সভার টেবিলে। আর ভুল করবেন না, এই দীর্ঘ নাটক এখনই শেষ না-ও হতে পারে। বরং ইতিহাসের শিক্ষা মেনে মনে হচ্ছে, দ্বিতীয় পর্ব সবে যেন শুরু।
ভারতে গিয়ে খেলতে রাজি না হওয়ায় যখন বাংলাদেশের জায়গায় স্কটল্যান্ড বিশ্বকাপে অন্তর্ভুক্ত হয়, তখন থেকেই পাকিস্তান বিকল্প পথ খুঁজছিল। অবশেষে পাকিস্তান তাদের সিদ্ধান্ত জানিয়েছে— তারা বিশ্বকাপে খেলবে ঠিকই, কিন্তু চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের মুখোমুখি হবে না। এটি মূলত রাজনৈতিক চাপ ও ক্রিকেটের স্বার্থ রক্ষার মাঝখানে একটি চতুর সমঝোতার চেষ্টা।
ইতোমধ্যে পাকিস্তান দল শ্রীলঙ্কায় পৌঁছেছে প্রস্তুতি ম্যাচ ও গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলো খেলতে। আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচের আগে ৪ ফেব্রুয়ারি তারা কলম্বোয় আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে একটি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলবে।
বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও প্রশাসক, সম্প্রচারকারী, ভক্ত ও প্রতিদ্বন্দ্বীরা— আড়ালে সবাই গভীর উদ্বেগ নিয়ে তাকিয়ে আছে এবং পরবর্তীতে কী ঘটবে তা বোঝার চেষ্টা করছে। সবার চোখ এখন ১৫ ফেব্রুয়ারির ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের দিকে। পাকিস্তান কি সত্যিই ম্যাচটি বয়কট করবে? নাকি আলোচনার মাধ্যমে কোনো সমাধান আসবে? নাকি শেষ মুহূর্তের কোনো নাটকীয় মোড় এই কাহিনীতে নতুন মাত্রা যোগ করবে?
এখানে আর্থিক ঝুঁকির পাল্লা অনেক ভারী। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মানেই বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে মূল্যবান আয়োজন, যা থেকে বিপুল অর্থ আয় হয়। প্রতিটি ভারত-পাকিস্তান দ্বৈরথের আনুমানিক মূল্য প্রায় ২৫ কোটি ডলার (বাংলাদেশি ২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার বেশি)। এই ম্যাচ বয়কট করা মানে কেবল একটি ক্রিকেট বোর্ডের ক্ষতি নয়, বরং সম্প্রচারক, স্পন্সর, আয়োজক দেশ ও এমনকি খোদ আইসিসিসহ পুরো ক্রিকেট অর্থনীতির ওপর বিশাল এক ধাক্কা।
পাকিস্তানের জন্য ঝুঁকি আরও বেশি। তারা মোটা অঙ্কের জরিমানা বা নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারে। আইসিসির জন্য এটি একদিকে যেমন আয়ের প্রশ্ন, অন্যদিকে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা টিকিয়ে রাখারও চ্যালেঞ্জ। আর এ কারণেই এটি বিশ্ব ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সংস্থার জন্য বিগত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে।
খেলার ভাবমূর্তি রক্ষার পাশাপাশি আইসিসিকে রাজনৈতিক বাস্তবতা, চুক্তির বাধ্যবাধকতা, খেলাধুলার নীতি-নৈতিকতা ও আর্থিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং বিশেষ করে নিরপেক্ষতার মতো বিষয়গুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। এখনকার প্রতিটি সিদ্ধান্ত একেকটি নজির হয়ে থাকবে এবং প্রতিটি আপস বা সমঝোতার ঘটনা ভবিষ্যতের টুর্নামেন্টগুলোর ধরন বদলে দেবে।
যা আমাদেরকে সেই অনিবার্য প্রশ্নের দিকে ঠেলে দেয়: এই ঘটনা কি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চেহারা বদলে দেবে?
হয়তো সেটা ইতোমধ্যে হয়েই গেছে।
বাংলাদেশের জায়গায় স্কটল্যান্ডের অন্তর্ভুক্তি, পাকিস্তানের নির্দিষ্ট একটি ম্যাচে অংশগ্রহণ না করা কিংবা ভারত-পাকিস্তানের জন্য নিরপেক্ষ ভেন্যুর ব্যবস্থা একদম প্রথা হয়ে দাঁড়ানো— এসব আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং এগুলো ক্রিকেট বিশ্বের বদলে যাওয়া পরিস্থিতির লক্ষণ, যেখানে ভূ-রাজনীতিই এখন টুর্নামেন্টের গতি-প্রকৃতি নির্ধারণ করে দিচ্ছে।
এই খেলা এখন আর কেবল ব্যাট-বলের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি রূপ নিয়েছে ভৌগোলিক সীমারেখা, রাষ্ট্রীয় নীতি আর ক্ষমতার লড়াইয়ে। তবে এত হট্টগোলের ভিড়েও একটি নিরেট সত্য টিকে আছে: ক্রিকেট মাঠে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার চিরকালীন দ্বৈরথ— যদিও সাম্প্রতিক সময়ে এবং বিশেষ করে বৈশ্বিক আসরগুলোতে এটি একপাক্ষিক লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে— তবুও এটি আজও যেমন বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় সম্পদ, তেমনি সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও।