কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে টাইব্রেকারে ফ্রান্সকে হারিয়ে ৩৬ বছরের শিরোপা খরা কাটিয়েছিল আর্জেন্টিনা। এই শিরোপা-উল্লাস লিওনেল মেসির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জনও। তবে আলোচনা এখানে নয়। এবারের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ৪৮ দলের ফিফা বিশ্বকাপ।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনা দলে আছেন মেসি। কোচ লিওনেল স্কালোনির মূল ভরসাও তিনি। পাশাপাশি, দলে ১৭ জন ২০২২ বিশ্বকাপজয়ী এবং ৯ জন নতুন খেলোয়াড় আছেন। সবমিলিয়ে শিরোপাটা ধরে রাখার জন্য দলের যে সব রসদ প্রয়োজন, এবারের আর্জেন্টিনা দলে তার সবই রয়েছে।
এদিকে আর্জেন্টিনা দলটি দেখে ফুটবলবিশেষজ্ঞদের অভিমত, ১৯৬২ সালের পর এবারই প্রথম টানা দুটি বিশ্বকাপ জয়ের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে পারে কোনো দল। এর আগে, ১৯৯০ সালে আর্জেন্টিনার সামনে সেই সুযোগ ছিল, কিন্তু ফাইনালে জার্মানির কাছে হেরে গিয়ে ম্যারাডোনার দল ইতিহাস গড়তে ব্যর্থ হয়।
১৯৯৮ সালে ব্রাজিলও এই সুযোগ হারায়। তবে ২০০২ সাল পর্যন্ত টানা তিনটি বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলে দুটি জয় করেছিল ব্রাজিল। কাতারে ফ্রান্সের সামনেও এই সুযোগ ছিল। কিন্তু মেসিদের কাছে হেরে সেই স্বপ্নভঙ্গ হয়ে ফরাসিদের।
বিশ্বকাপের দীর্ঘ ইতিহাসে মাত্র দুটি দেশের টানা দু’বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার কীর্তি আছে। প্রথম দল হিসেবে ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালে এই রেকর্ড গড়ে ইতালি। এরপর ১৯৫৮ ও ১৯৬২ বিশ্বকাপে পেলের জাদু ও গারিঞ্চাদের দুর্দান্ত নৈপুণ্যে একই কীর্তি গড়েছিল ব্রাজিল। কিন্তু গত ৬৪ বছরে আর কোনো দেশ এই অর্জনে নাম লেখাতে পারেনি।
এবার আর্জেন্টিনা কী পারবে টানা দুটি বিশ্বকাপ জয় করতে? ফুটবল বিশ্বে মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন দেখছে এবং সমর্থকদের মধ্যে বড় আশা তৈরি হয়েছে। যদিও সেই উত্তর মেলাতে আপাতত ১৯ জুলাই পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকতে হবে ভক্ত-সমর্থকদের।
কিছু লক্ষণ অবশ্য মেসিদের শিরোপা জয়ের সম্ভাবনা বাড়াচ্ছে। বিশ্বকাপজয়ী কোচ, বিশ্বকাপজয়ী অভিজ্ঞতাসম্পন্ন অধিকাংশ ফুটবলারও এবার আর্জেন্টাইন শিবিরে আছেন। সবচেয়ে বড় শক্তি দলটির ভেতরের ঐক্য ও ড্রেসিং রুমের দারুণ পরিবেশ, যা বড় সাফল্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া আধুনিক ফুটবল ও অন্যান্য খেলার সাম্প্রতিক ফলাফল বলছে, দলীয় স্থিতিশীলতা থাকলে টানা শিরোপা জয়ের সম্ভাবনাও বেড়ে যায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে ক্লাব ফুটবলে পিএসজি ও অন্যান্য শীর্ষ দলগুলো ধারাবাহিক সাফল্য মূলত ভালো টিমওয়ার্ক ও ভারসাম্যের কারণেই এসেছে। গত ৩০ মে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে টাইব্রেকারে আর্সেনালকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বার চ্যাম্পিয়ন হয় পিএসজি।
যদিও এর আগে কিলিয়ান এমবাপ্পে-নেইমার জুনিয়র কিংবা লিওনেল মেসিদের মতো তারকাদের ভিড়িয়েও ইউরোপাসেরা খেতাব জিততে পারেনি দলটি। কিন্তু সবশেষ দুই আসরে তারকাভর্তি টাইটানিক নয়, বরং একাত্মতা আর ড্রেসিং রুমের স্থিতিশীলতার মন্ত্রেই সাফল্য পেয়েছে কোচ লুইস এনরিকের অধীনে থাকা দলটি।
ক্রিকেট ও ফুটবলের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায়ও একই চিত্র দেখা যায়। যেখানে দল হিসেবে একসঙ্গে খেলা ও ড্রেসিং রুমের স্থিতিশীলতা শিরোপা নির্ধারণে বড় ভূমিকা রেখেছে। উদাহরণ হিসেবে রয়েল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর কথাও আসতে পারে। এর আগে, তারকা নির্ভর দল গড়েও প্রত্যাশিত শিরোপা স্বাদ বঞ্চিত ছিল বিরাট কোহলির দল। কিন্তু সবশেষ দুই আসরে দলীয় স্থিতিশীলতা, ড্রেসিংরুমের চমৎকার পরিবেশ আর টিম স্পিরিটের মন্ত্রে শিরোপা উল্লাসে মেতেছে তারা।
এ ছাড়া কোচ হান্সি ফ্লিকের অধীনে স্প্যানিশ লা লিগায় টানা দু’বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বার্সেলোনা। জার্মান বুন্দেসলিগায় টানা দু’বার চ্যাম্পিয়ন বায়ার্ন মিউনিখ। এখানেও একইরকম রহস্যমন্ত্রে সফল দলগুলো। এই দিকগুলো আর্জেন্টিনা দলে এখন স্পষ্টভাবে বিদ্যমান।
সব মিলিয়ে বলা যায়, অন্যান্য দলের তুলনায় আর্জেন্টিনা অনেকটাই এগিয়ে। যদি এই ধারাবাহিকতা ও ঐক্য বজায় থাকে, তাহলে আবারও বিশ্বকাপ শিরোপা মেসির হাতেই উঠতে পারে, এমন সম্ভাবনাই এখন বেশি আলোচনায়।