অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট খেলতে প্রথমবার যখন গিয়েছিল বাংলাদেশ, তখন সাবেক ক্রিকেটার ডেভিড হুকস বলেছিলেন, স্টিভ ওয়াহর দল তাদের একদিনেই দুইবার অলআউট করবে! ২৩ বছর পর আগামী আগস্টে বাংলাদেশ যখন অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট খেলতে যাবে, তখন নিশ্চয়ই কেউ এমন অপমানজনক মন্তব্য করবে না। নিউজিল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও পাকিস্তানের মাটিতে টেস্ট জেতা দলকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। শুক্রবার সংবাদ সম্মেলনে আসা মুশফিকুর রহিমের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, টেস্টে বাংলাদেশের এই দলটিই কি সেরা? জবাবে ২১ বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কাটিয়ে দেওয়া মুশফিক বলেছেন, এই সময়ের দলটাই সবচাইতে ভারসাম্যপূর্ণ ও বোলিংয়ের দিক থেকে শক্তিশালী।
দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের হয়ে টেস্ট খেলেছেন মুশফিক, প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটার হিসেবে শততম টেস্ট খেলার গৌরবটাও তার। আগের প্রজন্মের সঙ্গে বর্তমানের পার্থক্যটা দেখিয়ে দেওয়ার জন্য মুশফিকই আদর্শ ব্যক্তিত্ব। এই সময়ের দলটাই টেস্টে বাংলাদেশের সেরা দল কি না— এমন প্রশ্নে তার উত্তর, ‘আমি টেস্ট নিয়ে যদি বলি, আমাদের বোলিং বিভাগের জন্য এখন প্রতিপক্ষের ২০ উইকেট নেওয়ার ক্ষমতা আগের চেয়ে অনেক বেশি। যেকোনো পরিস্থিতিতে স্পিনার তো আমাদের সবসময় ভালো ছিল। সঙ্গে যখন পেস বোলিংটাও ভালো হয়ে যায়, তখন নিঃসন্দেহে আমার মনে হয় যে আমরা ব্যাটাররা যদি ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলতে পারি, যেটা কি না গত তিন-চার বছর খুব ভালো হচ্ছে। টেস্ট ক্রিকেটে তো সেদিক থেকে বলব যে এটা একটা মিশ্রণ এবং অধিনায়কের জন্য বড় একটা স্বস্তির বিষয়।’
নিজের নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা থেকেই মুশফিক বলেছেন, ‘আমি যখন অধিনায়ক ছিলাম, তখন হয়তো বা আমার কাছে ব্যাটার ছিল। তবে ২০ উইকেট নেওয়ার মতো এরকম চারজন বোলার ছিল না, আমার কাছে হয়তো এক-দুজন ছিল, যা আমার জন্য কঠিন হয়ে যেত (প্রতিপক্ষকে অলআউট করা)।’
মুশফিক মনে করেন, এখন বাংলাদেশ দলের বোলিং আক্রমণে ভারসাম্যের সঙ্গে বৈচিত্র্যও আছে, 'আমি একটা জিনিস বলতে পারি, আমাদের ভারসাম্য এবং বোলিং বৈচিত্র্য আছে, যা একটা টেস্ট দলকে যেকোনো কন্ডিশন; সেটা স্পিন হোক পেস হোক বা স্পোর্টিং হোক, সেখানে ফল বের করতে সুবিধা দেবে। শুধু পাঁচ দিন নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ মাঠে দিতে হবে।’
২০০৫ সালের লর্ডস টেস্টে অভিষেক থেকে সিলেটে নিজের ১০২তম টেস্টের সামনে দাঁড়িয়ে মুশফিকের উপলব্ধি— ‘উন্নতিটা এখন পর্যন্ত যা হয়েছে, সেটা খুবই ভালো, তবে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং হচ্ছে ধারাবাহিকতা রাখা। দল হিসেবে আমরা যদি আরেকটু ধারাবাহিক হতে পারি, তাহলে আগামী দু-তিন বছর পর আমরা অনেক ভালো জায়গায় থাকব।’
বাংলাদেশের বর্তমান টেস্ট দলে সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল কিংবা হাবিবুল বাশারের মতো কেউ নেই, যাদের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের পরিসংখ্যান ঈর্ষণীয়। মুশফিক তাদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলেছেন যে অতীতে অনেক দারুণ সব ক্রিকেটার বাংলাদেশের হয়ে খেললেও দল হিসেবে এখনকার সময়েই বাংলাদেশ সাফল্য বেশি পাচ্ছে, ‘পুরনো দিনের দলগুলোর সঙ্গে তুলনা করার কথা বললে, এর আগেও অনেক বড় ক্রিকেটার আমাদের টেস্ট দলে খেলেছে। তবে সার্বিকভাবে ধারাবাহিকতার কথা বললে এই দলটা অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি ধারাবাহিক।’
কারণ হিসেবে মুশফিক উল্লেখ করলেন বেশি বেশি খেলার সুযোগের ব্যাপারটা, ‘আমরা আগে হয়তো বা এক বছরে দু-তিনটা টেস্ট খেলতাম। এভারেজ হয়তো তিনটা সর্বোচ্চ। তখন যেকোনো পর্যায়ে আপনি যখন এরকম দীর্ঘ বিরতিতে টেস্ট খেলবেন, এটির ভালো ফল আসা কঠিন। এখন যেহেতু বছরে আমরা ৮-১০টা টেস্ট খেলি, গড়ে হয়তো বছরে ছয়-সাতটা টেস্ট খেলি। এখন দেখা যায় যে তুলনামূলকভাবে সহজ। দলে ভালো করা ক্রিকেটারের সংখ্যাও বেশি। একটা দলে সাত-আটজন একসঙ্গে ভালো করলে তখন সেই দল যেকোনো সংস্করণেই ভালো হবে।’
একটা সময় টেস্টে বাংলাদেশের সাফল্যের সর্বোচ্চ মাত্রাই ছিল জিম্বাবুয়েকে হারানো। আর খেলোয়াড়দের বয়কটের কারণে শীর্ষ ক্রিকেটারদের ছাড়াই মাঠে নামা খর্বশক্তির ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে জয়। তবে গত চার বছরে দেশের বাইরে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সাফল্যই মুশফিককে জোগাচ্ছে এই সময়ের দলকে সেরা বলার আত্মবিশ্বাস। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে জয়, জ্যামাইকায় ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারানো, পাকিস্তানকে রাওয়ালপিন্ডিতে হোয়াইটওয়াশের পর ঢাকায়ও পেস বোলিংয়ের শক্তিতেই পরাস্ত করা। গত বছর চারেকে টেস্টে বাংলাদেশের আছে গর্ব করার মতো বেশ কিছু অর্জন। যে দলগত সাফল্যগুলো সাকিব বা তামিমের সময়ে বাংলাদেশ পায়নি।
মুদ্রার উল্টো পিঠও অবশ্য আছে। মাত্র এক বছরের কিছু সময় আগে গত এপ্রিলে এই সিলেটেই জিম্বাবুয়ে হারিয়ে গেছে বাংলাদেশকে। এই নাহিদ রানা, মুশফিক, মমিনুল হক, মেহেদী হাসান মিরাজরাই খেলেছিলেন নাজমুল হোসেন শান্তর নেতৃত্বে। ১৩ মাসে বাংলাদেশ দল খুব যে বদলে গেছে, এমনটা নয়। শুধু পার্থক্য হচ্ছে, শান্তর ব্যাটিং। সবশেষ পাঁচ টেস্টে শান্তর সেঞ্চুরির সংখ্যা ৪, হাফসেঞ্চুরি একটা। গত ১২ মাসে শান্তর ব্যাটিং গড় প্রায় ৭৫! এই সময়েই বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কায় ড্র করেছে, পাকিস্তানকে হারিয়েছে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে, জিতেছে এই প্রতিযোগিতার বাইরের দল আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষেও। ব্যাটিংয়ে রান আসছে বলেই বোলাররা পর্যাপ্ত সময় পাচ্ছেন ২০ উইকেট তুলে নেওয়ার। যে কারণে টেস্টে ইতিবাচক ফলও আসতে শুরু করেছে। এই পরিবর্তনের জন্য সাবেক অধিনায়ক হিসেবে মুমিনুল হকের একটা ধন্যবাদ পাওনা। কারণ, টেস্টে পেসারদের কদর যে তিনি প্রথম বুঝতে শুরু করেছিলেন!