উদীয়মান অর্থনীতির শক্তিশালী জোট ‘ব্রিকস’ (BRICS) বর্তমানে এক কঠিন ভূ-রাজনৈতিক পরীক্ষার সম্মুখীন। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার চলমান যুদ্ধ এবং এর ফলে সৃষ্ট আঞ্চলিক অস্থিরতা জোটটির অভ্যন্তরীণ সংহতিকে হুমকির মুখে ফেলেছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে এই উদ্বেগের চিত্র ফুটে উঠেছে।
সম্প্রতি ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে জোটের দেশগুলো কোনো যৌথ ঘোষণাপত্রে একমত হতে ব্যর্থ হয়েছে। মূলত ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ইস্যুতে সদস্য দেশগুলোর ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানই এই অচলাবস্থার মূল কারণ।
চলতি বছর ব্রিকসের সদস্যপদ পেয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দুই প্রভাবশালী দেশ ইরান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। কিন্তু বর্তমানে দেশ দুটি কার্যত পরোক্ষ যুদ্ধের দুই প্রান্তে অবস্থান করছে। ইরানের অভিযোগ, আমিরাত তাদের বিরুদ্ধে মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক কার্যক্রমকে সহায়তা করছে। অন্যদিকে, ভারত ও রাশিয়ার মতো দেশগুলো আমিরাতের সঙ্গে তাদের কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখতে গিয়ে ইরানের কঠোর দাবির সঙ্গে একমত হতে পারছে না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্রিকস মূলত একটি অর্থনৈতিক জোট হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও এখন তা বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে পশ্চিমাদের বিকল্প প্ল্যাটফর্ম হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে চাইছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এই লক্ষ্যকে বাধাগ্রস্ত করছে। ইরান চায় ব্রিকস সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি আগ্রাসনের নিন্দা জানাক। কিন্তু জোটের অন্যতম প্রধান দেশ ভারত ভারসাম্য বজায় রাখতে চাইছে। অন্যদিকে চীন ও রাশিয়াও তাদের নিজস্ব স্বার্থ রক্ষায় সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
ইরান যুদ্ধের প্রভাব শুধু কূটনীতিতেই সীমাবদ্ধ নেই। হরমুজ প্রণালীতে নৌ-চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ব্রিকস সদস্য দেশগুলোও এই অর্থনৈতিক ধাক্কা থেকে মুক্ত নয়। চীনের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ভারতের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এখন মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রিকস যদি এই সংকট সমাধান করে একটি ঐক্যবদ্ধ অবস্থানে আসতে না পারে, তবে জোটটির ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। আগামী শীর্ষ সম্মেলনে জোটের নেতারা এই ফাটল জোড়া লাগাতে পারেন কি না, এখন সেটাই দেখার বিষয়।