বাংলাদেশে দ্রুত বাড়ছে ইজিবাইক, বৈদ্যুতিক যান ও সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার। এর সঙ্গে বাড়ছে লিথিয়াম ব্যাটারির বাজারও। তবে এই সম্ভাবনাময় খাত ঘিরে তৈরি হয়েছে ভয়ংকর ঝুঁকি। নতুন ব্যাটারির পাশাপাশি বিদেশ থেকে পুরোনো, লাইফসাইকেল শেষ হওয়া ও স্ক্র্যাপ লিথিয়াম ব্যাটারি দেশে ঢুকছে। এর অধিকাংশ আসছে চীন থেকে।
এসব ব্যাটারির ভালো সেল আলাদা করে নতুন কেসিং ও বিএমএস (ব্যাটারি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম) লাগিয়ে নতুন হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে। কম দামের কারণে সাধারণ ক্রেতারা এগুলো কিনলেও এক-দুই বছরের মধ্যেই অধিকাংশ ব্যাটারি শক্তি হারিয়ে বিপজ্জনক ই-বর্জ্যে পরিণত হচ্ছে। হুমকি বাড়ছে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের।
আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিসার্চ অ্যান্ড মার্কেটসের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির বাজার ছিল প্রায় ২৯৭ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন ডলার, যা ২০৩০ সালে ৪৩৫ মিলিয়ন ডলার ছাড়াতে পারে। বর্তমানে ইজিবাইক, সৌরবিদ্যুৎ স্টোরেজ, আইপিএস, স্মার্টফোন, ল্যাপটপ ও ডিসি যন্ত্রপাতিতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে লিথিয়াম ব্যাটারি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক মানের লিথিয়াম ব্যাটারি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে। ভালো মানের লিথিয়াম ব্যাটারি ৫ থেকে ৮০ বছর পর্যন্ত ব্যবহারযোগ্য হতে পারে। লিথিয়াম আয়রন ফসফেট (LiFePO4) ব্যাটারি ৫ থেকে ৩০ বছর ও লিথিয়াম
টাইটানেট (LTO) ব্যাটারি ২৫ থেকে ৮০ বছর নিরবচ্ছিন্ন ব্যবহার করা যায়। অর্থাৎ একটি ব্যাটারি একাধিক প্রজন্ম পর্যন্ত ব্যবহারযোগ্য থাকতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে নতুন ব্যাটারির পাশাপাশি পুরোনো ও বাতিল ব্যাটারির আমদানি বাড়ায় পুরো খাতই ঝুঁকির মুখে পড়ছে। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে ১২ হাজার লাইফ সাইকেলের ১২ ভোল্ট ৩০ এম্পিয়ার আওয়ার ব্যাটারি পাওয়া যাচ্ছে ২০ হাজার টাকার মধ্যে। শুধু সোলার প্যানেল যুক্ত করলে ৩২ বছর ধরে ১৮ ওয়াটের দুটি ডিসি ফ্যান ও ৫ ওয়াটের চারটি ডিসি এলইডি বাল্ব একসঙ্গে দৈনিক (রাতে) ৬ ঘণ্টা করে চালানো যাবে। আবার একই ক্ষমতার লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি মিলছে ৭ হাজার টাকায়, যা দুই বছরের মধ্যে শক্তি হারিয়ে বর্জ্যে পরিণত হচ্ছে।
রাজধানীর কাপ্তান বাজারের একাধিক ব্যবসায়ী জানান, স্ক্র্যাপ হিসেবে আসা ব্যাটারি থেকে ভালো সেল আলাদা করে নতুন কেসিং ও বিএমএস লাগিয়ে নতুন ব্যাটারি হিসেবে বাজারে বিক্রি করা হয়। দাম কম হওয়ায় ক্রেতারা আকৃষ্ট হন। পুরোনো সেল দিয়ে তৈরীকৃত ব্যাটারিও দেশে আসে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ক্রেতারা এটা বুঝতে পারেন না। জানা গেছে, পুরোনো ব্যাটারি আমদানিতে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক উভয় পর্যায়ের ব্যবসায়ী জড়িত। বিভিন্ন এইচএস কোড ব্যবহার করে কখনো ‘স্ক্র্যাপ ব্যাটারি’, কখনো ‘এনার্জি স্টোরেজ মডিউল’, ‘সোলার স্টোরেজ ইকুইপমেন্ট’, ‘ইলেকট্রনিক পার্টস’ ইত্যাদি নামে এসব ব্যাটারি দেশে ঢুকছে। এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে লিথিয়াম ব্যাটারি অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ঝুঁকি বাড়ায়। ব্যাটারিতে থাকা লিথিয়াম, কোবাল্ট, নিকেল, ম্যাঙ্গানিজ ও বিষাক্ত ইলেকট্রোলাইট মাটি ও পানিতে মিশে পরিবেশ দূষণ করে। জনস্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি তৈরি করে। অনিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যাটারি ভাঙলে বিষাক্ত গ্যাস ছড়ানোর ঝুঁকিও থাকে।
বাংলাদেশে এখনো আধুনিক লিথিয়াম ব্যাটারি রিসাইকেল শিল্প গড়ে ওঠেনি। ফলে পুরান ঢাকা, যাত্রাবাড়ী, কদমতলী, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের স্ক্র্যাপ হাবে অনিরাপদ পরিবেশে ব্যাটারি ভাঙা হচ্ছে। মূল্যবান ধাতু আলাদা করতে এগুলো পাঠানো হচ্ছে অনুমোদনহীন কারখানায়। বিশেষজ্ঞদের মতে লিথিয়াম ব্যাটারি শুধু বর্জ্য নয়; এটিকে ‘আরবান মাইন’ও বলা হয়। কারণ রিসাইকেলের মাধ্যমে এসব ব্যাটারি থেকে লিথিয়াম, কোবাল্ট, নিকেল, কপার, অ্যালুমিনিয়াম ও গ্রাফাইটের মতো মূল্যবান উপাদান উদ্ধার করা যায়। তবে আধুনিক রিসাইকেল প্ল্যান্ট ছাড়া এ ধরনের ব্যাটারি নিরাপদভাবে পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব নয়। জানা গেছে, চীনে ব্যাটারি রিসাইকেল অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত। সেখানে সরকার অনুমোদিত শতাধিক অপারেটর কাজ করছে।
ব্যাটারি উৎপাদক ও গাড়ি কোম্পানিকেই পুরোনো ব্যাটারি সংগ্রহ ও রিসাইকেলের দায়িত্ব নিতে হয়। বড় ইভি ব্যাটারি ডিজিটালি ট্র্যাক করা হয়। কে তৈরি করেছে, কোথায় ব্যবহার হচ্ছে, কখন বাতিল হয়েছে এবং কে রিসাইকেল করছে সব তথ্য মনিটর করা হয়। সংশ্লিষ্ট গবেষণা অনুযায়ী, চীনে শুধু পুরোনো ব্যাটারি সংগ্রহ ও পরিবহনেই কেজিপ্রতি প্রায় ১ ডলার পর্যন্ত খরচ হয়। এরপর উন্নত প্রযুক্তিতে রিসাইকেল করতে প্রয়োজন হয় বড় বিনিয়োগ। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এ ব্যয় এড়াতেই উন্নয়নশীল দেশে কম দামে স্ক্যাপ ব্যাটারি বিক্রি করা হচ্ছে। ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ড. মাহফুজা পারভীন বলেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বৈদ্যুতিক যানবাহনের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হলে এখনই নিরাপদ ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা জরুরি। পুরোনো ও স্ক্যাপ লিথিয়াম ব্যাটারি আমদানি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আধুনিক রিসাইকেল শিল্প গড়তে হবে। নইলে “সবুজ শক্তি”র আড়ালে বাংলাদেশই পরিণত হবে বিপজ্জনক ই-বর্জ্যরে গন্তব্যে।’