Image description
 

নির্বাচন-পরবর্তী নতুন সরকারের কাছে শিল্প ও বাণিজ্য খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন দেশের ব্যবসায়ী নেতারা। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুনর্গঠন করে ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বার্থসংরক্ষণমূলক কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং ব্যাংক ঋণের বিপরীতে সুদের হার বাড়ার ফলে শিল্প ও বাণিজ্য খাত মারাত্মক চাপের মুখে পড়েছে। 
উৎপাদন ব্যয় ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বেড়েছে, অথচ লাভের পরিমাণ কমেছে। এমনকি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাতে বিদেশি অর্ডার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।  তিনি বলেন, এই পরিস্থিতিতে নতুন সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং শিল্প খাতে জ্বালানি ও কাঁচামালের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা।
এ বিষয়ে শিল্প উদ্যোক্তা, আবাদা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহিদুল বারী জনকণ্ঠকে বলেন, কর ও শুল্কনীতিতে ঘন ঘন পরিবর্তনের কারণে ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। দীর্ঘসূত্রতা ও প্রশাসনিক জটিলতায় বিনিয়োগে গতি আসছে না। তাই বাস্তবভিত্তিক কর সংস্কার, ভ্যাট ও শুল্ক কাঠামো সহজীকরণ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনার পাশাপাশি বৃহৎ শিল্পের জন্য সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা প্রয়োজন। 
ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতির অন্যতম প্রধান কারণ ট্যারিফ ও নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে দীর্ঘদিন ধরেই ভারসাম্যহীনতা বিরাজ করছে। আমদানির তুলনায় রপ্তানি কম হওয়ায় বাংলাদেশের বড় অঙ্কের বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এ অবস্থায় অশুল্ক বাধা দূর করা, সীমান্ত বাণিজ্য সহজ করা এবং বাংলাদেশের পণ্যের জন্য ভারতের বাজারে স্বল্প শুল্কে কার্যকর প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে নেপাল, ভুটান ও চীনের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগ, শিল্প পার্ক স্থাপন এবং ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা সম্প্রসারণের মাধ্যমে ব্যবসায়িক কূটনীতি আরও কার্যকর ও পারস্পরিক লাভজনক করার তাগিদ দেন তিনি।
ব্যবসাবান্ধব সরকার গঠনে রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা প্রসঙ্গে ড. জাহিদুল বারী বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংস কর্মসূচি ও নীতিগত অনিশ্চয়তা বিনিয়োগের প্রধান অন্তরায়। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা ও দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক টানাপোড়েন উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তার মতে, অর্থনীতি ও শিল্প খাতকে দলীয় বিবেচনার বাইরে রেখে জাতীয় স্বার্থে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্যবসায়ী সার্টিফিকেশন, আমদানি-রপ্তানিতে জটিলতা নিরসন, দুর্নীতি হ্রাস, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং প্রশাসনিক জটিলতা দূর না করলে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ব্যবসায়ী মহলের প্রত্যাশা হচ্ছে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দ্রুত শিল্প ও বাণিজ্য খাতের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর নীতি গ্রহণ করবে। এতে বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং দেশের অর্থনীতি গতিশীল হবে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)-এর সাবেক মহাপরিচালক ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ এ প্রসঙ্গে জনকণ্ঠকে বলেন, নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজস্ব আদায় বাড়ানো ও ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, ‘শিল্প ও বাণিজ্য খাতে টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য কর ব্যবস্থাকে আরও ন্যায্য ও স্বচ্ছ করতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা ও উৎপাদনমুখী খাতে বরাদ্দ বাড়ানো জরুরি। শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, মানবসম্পদ উন্নয়নেও জোর দিতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, রপ্তানি বহুমুখীকরণে কাঠামোগত দুর্বলতা কাটাতে না পারলে বিদেশি বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হবে না। এজন্য প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প ও মূল্যসংযোজন ভিত্তিক উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানোর তাগিদ দেন তিনি।
অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক ড. সেলিম রায়হান জনকণ্ঠকে বলেন, দেশের অর্থনীতি এখন একটি রূপান্তরকাল অতিক্রম করছে। এই সময়ে নীতিগত সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা ও পূর্বানুমেয়তা না থাকলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে না। তিনি বলেন, ‘ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক খাতের শাসনব্যবস্থা জোরদার করা ছাড়া শিল্প খাতে গতি আসবে না।’ তিনি বলেন, এলডিসি উত্তরণের প্রেক্ষাপটে রপ্তানি খাতে প্রণোদনা কাঠামো পুনর্বিন্যাস করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি (এফটিএ) ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তির (আরসিইপি) মতো উদ্যোগে কৌশলগতভাবে এগোতে হবে, যাতে দেশীয় শিল্প স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে দেশের অর্থনীতি ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ১৯৯১ সালের মতো একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান জাইদি সাত্তার। তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় সংস্কার করা গেলে প্রবৃদ্ধি ৭ থেকে ৮ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব। এ জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংস্কার অব্যাহত রাখতে হবে। কারণ এনবিআর নানাভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রতিবন্ধক হয়ে উঠছে। তিনি দ্রুত ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের তাগিদ দেন। তবে শুল্কহার না কমালে ২৬ দেশের সঙ্গে আলোচনা হলেও কোনো দেশের সঙ্গেই কার্যকর অর্থনৈতিক চুক্তি সম্ভব হবে না বলে সতর্ক করেন তিনি।
অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সরকারের বিভিন্ন স্তরে সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট। সবাই সংস্কার করতে চান না, অনেকেই আগের অবস্থা বজায় রাখতে চান। তবে সংস্কারের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা অব্যাহত রাখতে হবে। অন্যথায় জনগণ আবার আগের সরকারের মতো নতুন সরকারকেও প্রত্যাখ্যান করতে পারে।
সংস্কারকে একটি অজনপ্রিয় পদক্ষেপ উল্লেখ করে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন,     দীর্ঘ সময় সংস্কার না হওয়ায় এখন     সব খাতের দুর্বলতা একসঙ্গে সামনে  চলে এসেছে।