আর মাত্র কয়েকদিন পরই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়দশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একই সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে অনুষ্ঠিত হবে গণভোট। এই গণভোটকে সামনে রেখে সাম্প্রতিক সময়ে সরকারিভাবে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে জোরালো প্রচারণা চালাচ্ছে প্রায় সব রাজনৈতিক দল। যদিও এর পাশাপাশি ‘না’ ভোটের পক্ষেও মাঠে সক্রিয় রয়েছে কয়েকটি দল।
হ্যাঁ ভোটের পক্ষে এমন ব্যাপক প্রচারণা জনমনে কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। অনেকের প্রশ্ন—যদি গণভোটে হ্যাঁ নয়, বরং না ভোট জয়ী হয়, তাহলে দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে?
এ বিষয়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতামত বলছে, গণভোটে নেতিবাচক ফলাফল হলে তার প্রভাব আইনি নয়, বরং সবচেয়ে বেশি পড়বে রাজনৈতিক পরিসরে। কারও কারও আশঙ্কা, এতে গণতন্ত্রের স্বাভাবিক গতিপথ ব্যাহত হতে পারে।
বিশেষ করে আলোচনায় এসেছে জুলাই সনদ ও চলমান সংস্কার প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ। কিছু বিশ্লেষকের মতে, গণভোটে হ্যাঁ ভোট পরাজিত হলে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এমনকি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে ক্ষমতায় আসা সরকারগুলোর মধ্যে স্বৈরাচারী প্রবণতাও দেখা দিতে পারে, যা দেশে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
তবে এসব আশঙ্কার সঙ্গে একমত নন বেশ কয়েকজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তাদের মতে, বাংলাদেশের সংবিধানে গণভোটের বিধান থাকলেও এটি নিয়মিত শাসনব্যবস্থার বাধ্যতামূলক অংশ নয়। সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কেবল সংবিধানের মৌলিক কাঠামো সংশোধনের ক্ষেত্রেই গণভোটের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, জুলাই সনদ বা সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য গণভোট আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়, যদি না তা আলাদা কোনো আইনের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। ফলে গণভোটে না ভোট জয়ী হলেও জুলাই সনদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে—এমনটি নয়।
তাদের মতে, জুলাই সনদ কোনো আইনি চুক্তি নয়; এটি রাজনৈতিক দলগুলোর একটি অঙ্গীকার মাত্র। গণভোটে জনগণের সমর্থন না পেলে রাজনৈতিক দলগুলো চাইলে সেই অঙ্গীকার থেকে সরে আসতে পারে অথবা নতুন বাস্তবতার আলোকে ভিন্ন অবস্থান নিতে পারে।
অন্যদিকে, গণভোটে হ্যাঁ ভোট জয়ী হলে নির্বাচিত সরকার নৈতিকভাবে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে। আর না ভোট জয়ী হলে সংবিধান সংশ্লিষ্ট সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সেই নৈতিক বাধ্যবাধকতা আর থাকবে না।
বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, বাংলাদেশের অতীত গণভোটের অভিজ্ঞতা বলছে—রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া বড় ধরনের সংস্কার টেকসই হয় না। দীর্ঘ ৩৪ বছর পর চতুর্থবারের মতো অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই গণভোটকে ঘিরেই তাই এখন গোটা দেশ জুড়ে আলোচনা, আগ্রহ আর রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ তুঙ্গে।