বাংলাদেশের রাজনীতির অন্দরমহলে এখন নতুন আলোচনার খোরাক জোগাচ্ছে এক সময়ের প্রতাপশালী রাজনৈতিক পরিবার জিয়া পরিবারের অন্দরমহলের সক্রিয়তা। বিশেষ করে ২০২৪ পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবং আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির হাইকমান্ডের পক্ষ থেকে অত্যন্ত সুকৌশলী ও প্রতীকী কিছু পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিএনপির রাজনীতিতে বরাবরই ‘জিয়া পরিবারের’ একটি অনন্য আবেগীয় ও সাংগঠনিক আবেদন রয়েছে।
সেই আবেদনকে এবার নতুন প্রজন্মের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমান এবং প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী সৈয়দা শামিলা রহমান সিঁথির দৃশ্যপটে আসা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
দীর্ঘদিন ধরে তারেক রহমান লন্ডন থেকে দলকে নেতৃত্ব দিলেও তার পরিবারের পরবর্তী প্রজন্ম বা অন্য সদস্যরা সরাসরি মাঠে ছিলেন না। সম্প্রতি দেশে ফেরার পর জাইমা রহমানকে ঘিরে যে জনআকাঙ্ক্ষা ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে, তা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয় বলেই মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। একে দেখা হচ্ছে বিএনপির এক দীর্ঘমেয়াদী এবং সুদূরপ্রসারী ‘ইমেজ ব্র্যান্ডিং’ হিসেবে।
জাইমা রহমান লন্ডনে আইন পেশায় নিয়োজিত এবং অত্যন্ত মার্জিত ও আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত। গত আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে যে তরুণ প্রজন্মের জয়গান বেজেছে, সেই ‘জেনারেশন জে’ এর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে জাইমা রহমানের মতো একজন স্মার্ট ও সংবেদনশীল মুখ বিএনপির জন্য বড় তুরুপের তাস হতে পারে। তাকে কেবল নেতৃত্বের উত্তরাধিকার হিসেবে নয়, বরং বৈশ্বিক চিন্তাধারার আধুনিক বাংলাদেশের এক প্রতীকী প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে।
তরুণ ভোটারদের সঙ্গে তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমান।
অন্যদিকে, আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী সৈয়দা শামিলা রহমান সিঁথির ঢাকা-১৭ আসনের নির্বাচনি ময়দানে ঝটিকা গণসংযোগ ও উঠান বৈঠক বিএনপির রাজনৈতিক কৌশলে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। অনেকের মনেই প্রশ্ন ছিল, তারেক রহমানের মেয়েকে নিয়ে আলোচনা হলেও কোকোর পরিবার কি রাজনীতি থেকে দূরেই থাকবে?
সিঁথির এই সক্রিয়তা সেই জল্পনায় ইতি টেনেছে। এটি কেবল ভোটের আবেদন নয়, বরং দলের নেতাকর্মীদের কাছে একটি ঐক্যের বার্তা। এর মাধ্যমে বিএনপি প্রমাণ করতে চাইছে যে, জিয়া পরিবারের প্রতিটি সদস্য দলের ক্রান্তিকালে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বিশেষ করে নারীদের মাঝে সিঁথির সাবলীল উপস্থিতি নারী ভোটারদের এক বৃহৎ অংশকে বিএনপির বাক্সের দিকে টানার একটি কার্যকর প্রচেষ্টা।
তারেক রহমানের পক্ষে নির্বাচনি প্রচারের সময় মরহুম আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী সৈয়দা শামিলা রহমান সিঁথি।
বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণে জামায়াতে ইসলামির উত্থান ও সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে মাথায় রেখে বিএনপি হয়তো তাদের উদার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল করতে চায়। সেখানে জাইমা রহমান বা শামিলা রহমান সিঁথির মতো নারীদের সম্মুখ সারিতে আনা একটি কৌশলগত পালটা চাল। রক্ষণশীলতার তকমা ঝেড়ে ফেলে একটি আধুনিক ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের তুলে ধরার এই প্রয়াস অত্যন্ত সময়োপযোগী। জাইমা রহমান এখনো সরাসরি মঞ্চে না উঠলেও তার উপস্থিতি যে কোনো মুহূর্তে বিএনপির নির্বাচনী পালে নতুন হাওয়া বইয়ে দিতে পারে।
বলা যায়, বিএনপির এই ‘ফ্যামিলি কার্ড’ খেলা কেবল আবেগের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং অত্যন্ত পরিপক্ক রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের ফল। তরুণ ভোটারদের পালস বোঝা এবং নারী ভোটারদের আস্থা অর্জনে জিয়া পরিবারের এই নতুন মুখগুলো দলের জন্য এক শক্তিশালী সম্পদে পরিণত হতে যাচ্ছে। জাইমা রহমান ও শামিলা রহমান সিঁথির এই পদচারণা আগামী নির্বাচনে ধানের শীষের পক্ষে কতটুকু গণজোয়ার তৈরি করতে পারে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে এটা স্পষ্ট যে, বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে নেতৃত্বের ব্যাটন পরিবর্তনের একটি সূক্ষ্ম কিন্তু বলিষ্ঠ প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে।
জিয়া পরিবারের নতুন মুখ: বিএনপির কৌশলী বাঁক বদল
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘জিয়া পরিবার’ সবসময়ই একটি বড় ফ্যাক্টর। তবে ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই পরিবারের রাজনৈতিক সক্রিয়তায় এক নতুন সমীকরণ দেখা যাচ্ছে। তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমান এবং আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী সৈয়দা শামিলা রহমান সিঁথির রাজপথে পদচারণা কেবল পারিবারিক উত্তরাধিকার নয়, বরং বিএনপির এক সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক কৌশলের অংশ বলে মনে করা হচ্ছে।
উত্তরাধিকার ও তারুণ্যের সংযোগ
জাইমা রহমানকে ঘিরে সাধারণ মানুষের কৌতূহল এখন তুঙ্গে। লন্ডনে আইন পেশায় যুক্ত থাকা জাইমা যখনই কোনো অনুষ্ঠানে উপস্থিত হচ্ছেন, সাধারণ মানুষের নজর কেড়ে নিচ্ছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. সলিমুল্লাহ খান মনে করেন, “বিএনপি মূলত জাইমা রহমানকে দিয়ে জেনারেশন জে বা তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে একটি সেতুবন্ধন তৈরি করতে চাইছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর যে তরুণ ভোটাররা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মূল কারিগর ছিল, তাদের কাছে একজন শিক্ষিত ও আধুনিক মনস্ক নেতৃত্ব উপহার দেওয়াই বিএনপির লক্ষ্য।” যদিও তিনি এখনো আনুষ্ঠানিক পদে নেই, তবে তাকে ধীরে ধীরে সামনে আনা দলের নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা রক্ষার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত।
মাঠে শামিলা রহমান: তৃণমূলের নতুন আবেগ
এতদিন গুঞ্জন ছিল যে কেবল তারেক রহমানের পরিবারই লাইমলাইটে থাকবে, কিন্তু ঢাকা-১৭ আসনে শামিলা রহমান সিঁথির গণসংযোগ সেই ধারণা পাল্টে দিয়েছে। ধানের শীষের পক্ষে লিফলেট বিতরণ ও উঠান বৈঠকে তার উপস্থিতি স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে বিপুল উৎসাহের সৃষ্টি করেছে। বিএনপির একজন কেন্দ্রীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “শামিলা রহমানের মাঠে নামা প্রমাণ করে যে জিয়া পরিবারের সবাই দলের প্রয়োজনে ঐক্যবদ্ধ। এটি তৃণমূলের কর্মীদের মাঝে এক ধরনের আবেগীয় শক্তি জোগায়, যা নির্বাচনের সময় ভোট ব্যাংক রক্ষায় অত্যন্ত কার্যকর।”
নারী নেতৃত্ব ও কৌশলগত অবস্থান
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করছে, জামায়াতে ইসলামিকে প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ধরে নিয়ে বিএনপি তাদের নারী নেতৃত্বের একটি আধুনিক ভাবমূর্তি দাঁড় করাতে চাইছে। জাইমা ও সিঁথির মাধ্যমে বিএনপি নারী ভোটারদের এই বার্তা দিতে চায় যে, তারা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও আধুনিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী। কড়াইল বস্তির মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সিঁথির উঠান বৈঠক সেই কৌশলকেই স্পষ্ট করে, যেখানে তিনি সরাসরি নারীদের কাছে ভোট ও দোয়া চেয়েছেন।
প্রচারণার নতুন ডাইমেনশন
যদিও জুবাইদা রহমান এবং শামিলা রহমান সিঁথিকে মাঝে মাঝে দেখা যাচ্ছে, জাইমা রহমান এখনো সরাসরি মঞ্চের প্রধান বক্তা হিসেবে আবির্ভূত হননি। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে জাইমা রহমানকে ‘মাস্টার কার্ড’ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে বিএনপি। এটি কেবল প্রচারণায় চমক সৃষ্টি করবে না, বরং দলের ভবিষ্যৎ কাণ্ডারি হিসেবে তাকে জনগণের কাছে পরিচিত করে তুলবে। রাজপথের আন্দোলনে পরিবারটির দীর্ঘ ত্যাগের গল্পের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের আধুনিক শিক্ষার মিশ্রণ বিএনপিকে একটি ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে যেতে পারে।