Image description

নির্বাচিত হলে ঢাকা দক্ষিণের জনদুর্ভোগ লাঘবে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন বিএনপি মনোনীত চার প্রার্থী। সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি নির্মূল, যানজট, মাদক ও জলাবদ্ধতা দূর করতে সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনে জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। ইতোমধ্যে তারা ঢাকা দক্ষিণের জনগণের কাছ থেকে ব্যাপক সাড়াও পেয়েছেন বলে দাবি করেছেন।

দৈনিক আমার দেশ-কে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে এমনটিই বলেন ঢাকা-৮ আসনে বিএনপি প্রার্থী মির্জা আব্বাস, ঢাকা–৩ আসনের গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ঢাকা-৬ আসনের ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন এবং ঢাকা-৪ আসনের তানভীর আহমেদ রবিন।

সাক্ষাৎকারে বিএনপির শীর্ষ নেতা ও এমপি প্রার্থীরা বলেছেন, ঢাকা সিটি করপোরেশনকে বিভক্ত করে ফ্যাসিবাদী সরকার কোনো ভালো কিছু করতে পারেনি, বরং জটিলতা তৈরি করেছে। তারা এসব করেছে শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিহিংসায়।

এই চার প্রার্থীর প্রত্যাশা, দুর্নীতি-চাঁদাবাজি ও স্বজনপ্রীতির অবসান ঘটিয়ে রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন তারা আনতে পারবেন।

ঢাকা-৮ আসনে বিএনপি প্রার্থী মির্জা আব্বাসের প্রতিশ্রুতি : বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং ঢাকা-৮ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী মির্জা আব্বাস দৈনিক আমার দেশ-কে বলেছেন, শুধু তার এলাকা নয়, রাজধানীর সবচেয়ে বড় সমস্যা যানজট। তিনি নির্বাচিত হলে যানজট নিরসনের জন্য সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে আলোচনা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

তিনি বলেন, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও মাদক দূর করতে দরকার সামাজিক বিপ্লব। সামাজিক বিপ্লব ছাড়া এগুলো দূর করা সম্ভব নয়। চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী, চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে যেমন ব্যবস্থা নিতে হবে, তেমনি কেউ যাতে চাঁদা না দেয় সেজন্য জনগণকেও সচেতন করতে হবে। তা না হলে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড মঙ্গল বয়ে আনবে না।’

মির্জা আব্বাস বলেন, ‘যে কয়েকবার এমপি, মন্ত্রী হয়েছি, কখনো প্রতিশ্রুতি দিয়ে হইনি। তারপরও সর্বশক্তি দিয়ে এলাকার উন্নয়ন করেছি। আমি নির্বাচিত হলে জনগণ সব সময় আমাকে পাশে পাবেন।’

তিনি বলেন, জলাবদ্ধতা আমার এলাকার আরেক বড় সমস্যা। আমি জানি জলাবদ্ধতা সমাধানের প্রক্রিয়া, যেটা অন্য কেউ জানে না। নির্বাচিত হলে এই বিষয়টিকে ঢাকা সিটি করপোরেশনকে ভাগ করে কোনো লাভ হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন মির্জা আব্বাস। তিনি বলেন, নিউ ইর্য়ক সিটিটা কত বড়, সেটা তো ভাগ হয়নি। তাহলে ঢাকা ভাগ করার মধ্যে কী লাভ হলো? বরং আরো জটিলতা বেড়েছে।

মির্জা আব্বাস বলেন, ৭১’র মুক্তিযোদ্ধাদের মতোই জুলাই বিপ্লবে পঙ্গু ও হতাহতদের জন্য স্থায়ীভাবে কিছু সুযোগ-সুবিধা দেওয়া উচিত। জনগণ আমাকে নির্বাচিত করলে তাদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে কথা বলব সরকারের সঙ্গে।

কেরানীগঞ্জকে পরিকল্পিতভাবে গড়তে চান গয়েশ্বর : বিশিষ্ট রাজনীতিক ও বিএনপি সরকারের সাবেক প্রতিমন্ত্রী বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটি সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেছেন, কেরানীগঞ্জকে আগামী ৫০-৬০ বছরের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে হবে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বসবাসযোগ্য পরিবেশ—সবকিছু মাথায় রেখে আধুনিক নগরায়ণের দিকে এগোতে হবে। লক্ষ্য একটাই—এমন একটি কেরানীগঞ্জ গড়া, যেখানে মানুষ উন্নত নাগরিক সুবিধা পেয়ে ঢাকামুখী হতে বাধ্য না হয়।

তিনি বলেন, কেরানীগঞ্জে ভূমিদস্যু, বিভিন্ন হাউজিং সোসাইটির দৌরাত্ম্যে নগরায়ণে সবচেয়ে বড় বাধা। নগরায়ণে যে বাধা, তার লাগাম টানতে হবে। পরিকল্পিত নগরায়ণের জন্য অন্তত ৫০-৬০ বছরের মাস্টারপ্লানে আনার জন্য সুপারিশ করব সরকারের কাছে। পাঁচটা আসনের এমপিদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে সুন্দর নগরায়ণ করতে হবে। কেরানীগঞ্জসহ ঢাকা দক্ষিণ সিটিকে বাসযোগ্য করে গড়ে তুলতে হলে শুধুমাত্র ঢাকা-৩ আসন নয়, অন্তত পাঁচটা আসনের সংসদ সদস্যদের নিয়ে এসব পরিকল্পনা করতে হবে। তা না হলে সফলতা অর্জন করা যাবে না। তবে ঢাকাকে বাসযোগ্য করে গড়ে তুলতে হলে ঢাকামুখী মানুষের চাপ কমাতে হবে।

তিনি আরো বলেন, কেরানীগঞ্জকে মাদকমুক্ত করতে হলে শুধু এলাকায় নয়, উৎসমুখগুলো বন্ধ করতে হবে। সীমান্তজুড়ে মাদক পাচারের রুট বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে এলাকায় মাদকাসক্ত যুবকদের ফিরিয়ে আনার ব্যাপারেও জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে সরকারকেই।

তিনি বলেন, ওয়ার্ডভিত্তিক কোনো স্বাস্থ্য ক্লিনিক নেই। ১০ ফুট রাস্তার পাশে আটতলা, ১০তলা বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। এত ঘিঞ্জি ও সরু রাস্তাঘাট যে, ভেতরে চলাচলের কোনো সুযোগ নেই। সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। এলাকার মানুষ সব ধরনের নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। মনে হয় যেন এই এলাকার কোনো অভিভাবক নেই, এটি বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।

গ্যাস সংকট সমাধানে আশ্বাস ঢাকা-৬ আসনের প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার ইশরাকের : পুরান ঢাকার দীর্ঘদিনের সবচেয়ে বড় সমস্যা যানজট। একই সঙ্গে গ্যাস সংকট, জলাবদ্ধতা, ভাঙা রাস্তা, দূষণের মতো জটিল সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন ঢাকা-৬ আসনের বিএনপি প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন।

নির্বাচনি এলাকার জনতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও ভোটারদের প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে ইশরাক হোসেন বলেছেন, বর্তমানে এই এলাকায় গ্যাসের তীব্র সংকটই সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেখানেই যাচ্ছি সেখানেই মানুষ এই অভিযোগটি করছেন। এ বিষয়ে ভোটারদের আশ্বস্ত করে বলতে চাই, নির্বাচিত হলে গ্যাসের সংকট নিরসনে কাজ করে যাব।

এছাড়া জলাবদ্ধতা, যানজট ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানের পাশাপাশি দেশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন নিয়েও তিনি নিজের পরিকল্পনার কথা ব্যক্ত করেন। জনকল্যাণমূলক এই অঙ্গীকারগুলো পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘জলাবদ্ধতা, যানজট, পরিবেশ দূষণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন নাগরিক সমস্যার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি আমার রয়েছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ নিয়ে যে পরিকল্পনা রয়েছে, তার মধ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বেকারত্ব দূরীকরণের বিষয়গুলো নিয়েও আমি ভোটারদের সঙ্গে কথা বলছি।

অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশন নিয়েও ভাবছেন ইশরাক। তিনি বলেছেন, দলীয় প্রধানের সঙ্গে আলোচনা করে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা বিষয়টি সংসদে উপস্থাপন করব। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, ঢাকা শহরকে যদি সার্ভিস ওরিয়েন্টেড করতে হয়, তাহলে একে ৮/১০ ভাগে বিভক্ত করুক, সেখানে আঞ্চলিক একজন মেয়র থাকতে পারে। এই কাঠামোটা তো সরকার তৈরি করবে। সরকার যদি আন্তরিক হতো তাহলে বিগত দিনে তারা এটা করত। কিন্তু তারা নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ সিদ্ধির জন্য ঢাকা শহরকে দুই ভাগে ভাগ করেছে এবং বাস্তবে সেবা বা উন্নয়ন কিছুই হয়নি বরং জটিলতা বেড়েছে। যা অপ্রয়োজনীয় ও নগরবাসীর জন্য ভালো ফল বয়ে আনেনি।

তিনি বলেন, ‘আমি এমপি নির্বাচিত হলে গ্যাস সংকট, বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা, মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ, যানজট সমস্যা, পরিবহনে মাফিয়া, মিডিয়ার মাফিয়া, বিগত ১৭ বছরে শেখ হাসিনার মাফিয়া সিন্ডিকেটের হোতা, খাদ্য সেক্টরের মাফিয়া, ভূমিদস্যুÑএদের সঙ্গে বিন্দুমাত্র আপস করব না। এই মাফিয়াদের কারণে আজ বাংলাদেশের এই অবস্থা, এত বছর হাসিনা রাজত্ব করতে পেরেছে।

তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, সরকারি টেন্ডার থেকে শুরু করে বাংলাদেশের প্রত্যেকটি জায়গায় যে মাফিয়া সিন্ডিকেট রয়েছে, এদের বিরুদ্ধে শক্তভাবে অবস্থান নিতে হবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে সেই অবস্থান অবশ্যই নেব। এর কোনো বিকল্প নেই, আর জনগণ সেটাই চায়। আমার দায়বদ্ধতা জনগণের কাছে। আমি তাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স অবলম্বন করব ইনশাল্লাহ।

তিনি বলেন, যদি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হই, তখন চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেব। চাঁদাবাজির অভিযোগের ব্যাপারে বলব, কিছু সমস্যা অবশ্যই আছে। কিন্তু চাঁদাবাজি নিয়ে বিশাল সংঘবদ্ধ অপপ্রচারের শিকার আমাদের হতে হয়েছে। শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধেও চাঁদাবাজির অভিযোগ আনা হয়েছে। চাঁদাবাজির ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স থাকবেÑ সে যেই হোক না কেন। আমার পরিবারের কেউ বা নিকটাত্মীয় হলেও তাকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে।

দুর্নীতি-চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে বিএনপি মন্তব্য করে তিনি জানান, যারা অবৈধভাবে বিভিন্ন জায়গায় স্থাপনা নির্মাণ করছে ফুটপাতে, রাস্তায় অবৈধ স্থাপনা গড়ে তুলছে এবং সেখান থেকে চাঁদা তুলছে, তাদের ব্যাপারে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছি। কোনো অবৈধ স্থাপনা ও অবৈধ কর্মকাণ্ড আমাদের দল অনুমোদন করে না। আমরাও এর বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান নিয়েছি।

কোনো চাঁদাবাজকে প্রশ্রয় দেবেন না ঢাকা-৪ আসনের তানভীর আহমেদ রবিন : ঢাকা-৪ আসনে বিএনপি প্রার্থী তানভীর আহমেদ রবিন আমার দেশ-কে বলেন, তার নির্বাচিত এলাকা ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৪ নম্বর আসনের শ্যামপুর-কদমতলী দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত রয়েছে। পানি নিষ্কাশন থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে, যা আমি নিজ চোখে দেখেছি।

কিশোর গ্যাং ও চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে বলেন, আমি নির্বাচিত হলে ঢাকা-৪ আসনে কোনো চাঁদাবাজ বা সন্ত্রাসীর জায়গা হবে না। জিরো টলারেন্স নীতিতে তাদের নির্মূল করা হবে। স্থানীয় জনগণ ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের মাধ্যমে কিশোর গ্যাং চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নারীর মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘নারীদের জন্য ফ্যামিলি কার্ডের ব্যবস্থা করা হবে, যাতে স্বাবলম্বী হয়ে নারীরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেন। এছাড়াও এলাকা থেকে মাদক নির্মূল করাসহ সন্তানের সুষ্ঠু বিকাশ, তাদের বেড়ে ওঠা এবং বিপথগামী হওয়া থেকে বিরত রাখার জন্য আটটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বিএনপি। যদি ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করার সুযোগ পায়, তাহলে আটটি বিষয় নিয়ে কাজ করব।’

একই সঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ মহানগর বিএনপির এই নেতা ও প্রার্থী বলেছেন, ঢাকা-৪ আসনের অনেক ভোটার কৃষিনির্ভর, তাদের জন্য বিএনপি কৃষিকার্ডের ব্যবস্থা করবে, যেখানে একজন কৃষক পর্যাপ্ত সার, পরামর্শ এবং ফসল আবাদের জন্য ব্যাংক লোন গ্রহণ করতে পারবেন। যার ফলশ্রুতিতে অর্থের অভাবে কোনো মানুষ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে না।