Image description

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক সন্ধিক্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং এর সঙ্গে যুক্ত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ নিয়ে গণভোট। এই গণভোট কেবল একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়, বরং দেশের আগামীর রাষ্ট্রকাঠামো ও আমূল সংস্কারের রূপরেখা নির্ধারণের এক চূড়ান্ত পরীক্ষা।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ভোটের ফলাফলের ওপরই নির্ভর করছে সংস্কারের দাবিগুলো আইনি বাধ্যবাধকতা পাবে নাকি রাজনৈতিক সদিচ্ছার গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাবে।গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ার অর্থ হলো জুলাই সনদের প্রস্তাবিত সংস্কারগুলোতে জনগণের সরাসরি ম্যান্ডেট বা চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ, যা রাজনৈতিক দলগুলোকে সেই সংস্কার বাস্তবায়নে বাধ্য করবে।

গণভোটে 'হ্যাঁ' ভোটের পক্ষে প্রচারণা শুরু করেছে ব্যাংকগুলো

অন্যদিকে, ‘না’ ভোটের জয় সংস্কার প্রক্রিয়াকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিতে পারে, যেখানে পরিবর্তনের প্রতিটি পদক্ষেপ কেবল রাজনৈতিক দরকষাকষির বিষয়ে পরিণত হবে। তাই এই গণভোটকে দেখা হচ্ছে নতুন বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারণী এক ঐতিহাসিক ম্যান্ডেট হিসেবে।

 

‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে বন্ধ হবে ফ্যাসিবাদের পথ : আলী রীয়াজ

জুলাই সনদের পক্ষে এবং ‘হ্যাঁ’ ভোটের সমর্থনে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তিনি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রধান ছিলেন এবং বর্তমানে উপদেষ্টা পদমর্যাদায় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারীর দায়িত্ব পালন করছেন।

অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন আসবে। এর ফলে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত হবে এবং ক্ষমতার এককেন্দ্রীকরণের পথে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি হবে।

তিনি উল্লেখ করেন, জুলাই সনদের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কমিশন গঠনে সরকার ও বিরোধী দল একযোগে কাজ করবে। ফলে ক্ষমতাসীনরা চাইলেই নিজের ইচ্ছেমতো সংবিধান পরিবর্তন করতে পারবে না; যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে জনগণের সরাসরি সম্মতি নিতে হবে।

দেশে ফিরেছেন আলী রীয়াজ

সংসদে বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার এবং গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হবেন— এমন বিধানের কথা উল্লেখ করে আলী রীয়াজ বলেন, একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে ফ্যাসিবাদের পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে, যে পথ মূলত সংবিধানের দুর্বলতার কারণেই তৈরি হয়েছিল।

সনদ বাস্তবায়িত হলে বেশকিছু স্বাধীন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে— উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব সংস্কারের মাধ্যমে সাংবিধানিক একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ রুদ্ধ হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ও নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার ঢাকা পোস্টকে বলেন, গণভোটে ‘না’ জয়ী হলে জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন পুরোপুরি রাজনীতিবিদদের অনুগ্রহের ওপর নির্ভর করবে। তারা চাইলে করবে, না চাইলে করবে না। জনগণ যদি এই সনদ প্রত্যাখ্যান করে, তবে তা হবে গণঅভ্যুত্থান এবং মানুষের আত্মত্যাগকে ভুলে যাওয়ার শামিল।

গণভোট ইস্যুতে কে কোন পক্ষে?

গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেয়। একই বছরের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং পুলিশ ও জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়।

প্রথম দফায় গঠিত ছয়টি সংস্কার কমিশনের সুপারিশের মধ্য থেকে ১৬৬টি প্রস্তাব নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্য গঠনের লক্ষ্যে গত বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় ঐকমত্য কমিশন কাজ শুরু করে। ৩০টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব প্রস্তাবের ভিত্তিতেই ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ প্রণয়ন করা হয়। এর মধ্যে ৪৮টি প্রস্তাব সংবিধান-সম্পর্কিত, যেগুলোর ওপর ভিত্তি করে আগামী গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ও তাদের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট এবং তাদের নির্বাচনী মিত্র জাতীয় পার্টি, বিকল্পধারা বাংলাদেশ ও ইসলামী গণতান্ত্রিক পার্টিসহ কয়েকটি দলকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী মিত্রদের মধ্যে জাতীয় পার্টি আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশ নিলেও অন্য দলগুলো ভোট বর্জন করছে।

জুলাই জাতীয় সনদে গণভোট প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান ভিন্নমুখী। আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর আগে থেকেই সনদের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ ১১ দলীয় জোটের নেতারা। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকেও ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ব্যানার ও ফেস্টুন প্রদর্শন করতে দেখা গেছে।

আইনি সুরক্ষা ও আদালতে প্রশ্ন না তোলার অঙ্গীকার চায় কমিশন

অন্যদিকে, বিএনপি শুরু থেকেই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ইতিবাচক অবস্থান জানালেও নির্বাচনী প্রচারণার শুরুর দিকে সরাসরি ভোট চাইতে দেখা যায়নি। গত ২২ জানুয়ারি সিলেট থেকে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করলেও ৩০ জানুয়ারি রংপুরের জনসভায় প্রথমবারের মতো বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। তবে দলটির নির্বাচনী মিত্র গণসংহতি আন্দোলন ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিকে শুরু থেকেই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে জোরালো প্রচারণা চালাতে দেখা গেছে।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদেরকে শুরু থেকেই গণভোটের বিপক্ষে অবস্থান নিতে দেখা গেছে। অন্যদিকে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ না নেওয়া দলগুলোকে গণভোটের পক্ষে বা বিপক্ষে এখনো প্রকাশ্যে কোনো প্রচারণা চালাতে দেখা যায়নি।

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হলে দেশের ভবিষ্যৎ নিরাপদ থাকবে না বলে মন্তব্য করেছেন জিএম কাদের। গত ১ ফেব্রুয়ারি রংপুরে নিজ নির্বাচনী এলাকায় গণসংযোগকালে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি উগ্রপন্থী সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত হবে। বাইরের কোনো শক্তির আধিপত্য এ দেশে হতে দেওয়া যাবে না। এই অন্তর্বর্তী সরকারের গণভোট করার কোনো আইনি অধিকার নেই; কেবল নির্বাচিত সরকার গণভোট আয়োজন করতে পারে।

ইসলামী গণতান্ত্রিক পার্টির চেয়ারম্যান এম এ আউয়াল বলেন, আমরাও সংস্কার চাই। কিন্তু নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত সব রাজনৈতিক দলকে অন্তর্ভুক্ত করে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ প্রণয়ন করা হয়নি। যেসব রাজনৈতিক দলের মতামত নেওয়া হয়নি, তাদের পেছনে দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষের সমর্থন রয়েছে। তাছাড়া সনদের বিষয়বস্তু সম্পর্কেও আমরা পুরোপুরি অবগত নই। এমতাবস্থায় আমরা কীভাবে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাব?

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় অংশ নিলেও সিপিবি, বাসদ ও বাসদসহ (মার্কসবাদী) কয়েকটি বাম দল গণভোটের বিরোধিতা করছে।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রথম বৈঠক শুরু

সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, “আমরা জুলাই সনদে স্বাক্ষর করিনি। কারণ, এই সনদে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত সংবিধানের ৪টি মূলনীতি বাতিল করার প্রস্তাবসহ আরও অনেকগুলো বিষয় রয়েছে। এছাড়া সনদের মুখবন্ধের ভাষার সঙ্গেও আমরা একমত নই।”

তিনি আরও বলেন, “আমাদের কাছে জাতীয় সংসদ নির্বাচনই প্রধান। এটি একটি অপ্রয়োজনীয় গণভোট, যার কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। তবে আগামী সংসদ যদি প্রয়োজন মনে করে সংবিধানের বিশেষ সংশোধনী আনে এবং সংবিধানে গণভোটের বিধান পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় (যেহেতু বর্তমানে সংবিধানে গণভোটের বিধান নেই), কেবল তখনই গণভোট করা যেতে পারে। যার ফলে এখন আমরা গণভোটের ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’— কোনোটির পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছি না।”

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতলে সংবিধানে যেসব সংস্কার আসবে

বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি তার ক্ষমতায় প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দিতে পারেন। জুলাই সনদের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়াই জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সদস্য নিয়োগ দিতে পারবেন। যদিও এ বিষয়ে বিএনপি ভিন্নমত জানিয়েছে।

বর্তমানে রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের প্রকাশ্য ভোটে নির্বাচিত হন। জুলাই সনদ কার্যকর হলে উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের সংসদ সদস্যদের গোপন ব্যালটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন।

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রস্তাব অনুমোদনের ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে উচ্চকক্ষের আসন বণ্টনের প্রস্তাব রয়েছে। এক্ষেত্রেও বিএনপি ভিন্নমত জানিয়েছে।

বর্তমানে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসনের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্যের ভোট প্রয়োজন হয়। জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী, নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষ— দুই কক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করা যাবে।

সংসদ ভবন এলাকায় সমাবেশ-মিছিল নিষিদ্ধ

বিদ্যমান ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি সরকারের অনুমোদনে যেকোনো অপরাধীকে ক্ষমা করতে পারেন। জুলাই সনদে বলা হয়েছে, কেবল ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা পরিবারের সম্মতিতে রাষ্ট্রপতি অপরাধীকে ক্ষমা করতে পারবেন।

সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার সাধারণত সরকারি দল থেকে নির্বাচিত হন। জুলাই সনদ কার্যকর হলে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবেন বিরোধী দল থেকে।

বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী, সংসদ সদস্যরা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিলে সদস্যপদ বাতিল হয়। জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হলে অর্থবিল ও আস্থা ভোট ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন।

বিদ্যমান ব্যবস্থা অনুযায়ী একজন ব্যক্তি কত বছর প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন, তার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন থাকতে পারবেন। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান একই ব্যক্তি হতে পারবেন না— এমন বিধানও রাখা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিএনপি ভিন্নমত পোষণ করেছে।

বর্তমানে সার্চ কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়। জুলাই সনদের প্রস্তাবনা অনুযায়ী, স্পিকারের সভাপতিত্বে ডেপুটি স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা ও আপিল বিভাগের একজন বিচারপতিকে নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে।

জাতীয় সংবিধান দিবস আজ

জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হলে সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে আপিল বিভাগ থেকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা হবে। আপিল বিভাগের বিচারক সংখ্যা নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতির চাহিদাকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। এছাড়া হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক নিয়োগের ক্ষমতা প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন একটি স্বাধীন কমিশনের হাতে ন্যস্ত হবে।

পাশাপাশি, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে জরুরি অবস্থার সময়ও নাগরিকের মৌলিক অধিকার খর্ব না করা, নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট ও ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা শক্তিশালী করার পথ প্রশস্ত হবে।

গণভোটের ব্যালটে যে চারটি প্রশ্ন থাকবে

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আলী রীয়াজ জানান, জুলাই সনদের ৮৪টি প্রস্তাবের মধ্যে সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত ৪৮টি প্রস্তাব নিয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এই প্রস্তাবগুলোকে চারটি প্রধান প্রশ্নে সংক্ষিপ্ত করে ভোটারদের সামনে উপস্থাপন করা হবে।

চারটি প্রশ্ন হলো—

১. নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান কি জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ায় গঠন করা হবে?

২. দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠন এবং ভোটের আনুপাতিক হারে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট উচ্চকক্ষ কি প্রতিষ্ঠা করা হবে?

৩. নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সময়সীমা নির্ধারণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতাসহ ৩০টি প্রস্তাব বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা কি থাকবে?

৪. জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার কি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা হবে?

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতলে বিএনপির ভিন্নমতের কী হবে

বিএনপি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করলেও সনদের একাধিক ধারায় আপত্তি জানিয়েছে। সংবিধান সংস্কারসংক্রান্ত ৩০টি প্রস্তাবের মধ্যে দলটি ৮টিতে ভিন্নমত দিয়েছে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে এবং বিএনপি সরকার গঠন করলে তাদের ভিন্নমতের প্রস্তাবগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এ বিষয়ে আলী রীয়াজ ঢাকা পোস্টকে বলেন, “গণভোটে জনগণ যদি ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়, তবে যে কোনো রাজনৈতিক দলের জন্য নৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে পুরো সনদ বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে। আমরা আশা করি বিএনপি বা যে দলই বিজয়ী হোক না কেন, তারা বিষয়টি সেভাবেই বিবেচনা করবে।”

একই প্রসঙ্গে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “নোট অব ডিসেন্ট (ভিন্নমত) মানে খুবই ক্ষুদ্র অংশের দ্বিমত। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। জনগণ যদি গণভোটে এই সনদ অনুমোদন করে, তবে প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।”

মাসে হাজারের বেশি ভোটার হচ্ছে সিলেটের জেলাগুলোতে

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংলাপে বিএনপির পক্ষ থেকে অংশ নিয়েছিলেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ ও বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ইসমাইল জবিউল্লাহ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। অন্যদিকে, সালাহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে সংবিধান সংস্কারের তৃতীয় ধাপ শুরু হবে। সেই অনুযায়ী, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে একটি ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন করা হবে। নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা একযোগে জাতীয় সংসদ এবং সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

জুলাই সনদের বাস্তবায়ন আদেশে বলা হয়েছে, সংস্কার পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে সর্বোচ্চ ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের ফলাফলের আলোকে সংবিধান সংস্কার কার্যক্রম সম্পন্ন করবে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংস্কার প্রক্রিয়া শেষ না হলে তার পরিণতি বা পরবর্তী করণীয় কী হবে— সে বিষয়ে বাস্তবায়ন আদেশে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা নেই।

অন্যদিকে, গণভোটে ‘না’ ভোট জয়ী হলে সংবিধান-সম্পর্কিত সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের কোনো আইনি বা রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা থাকবে না। সে ক্ষেত্রে সংস্কার কার্যক্রম কতটা এগোবে, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করবে ভবিষ্যতে কোন রাজনৈতিক দল সরকার গঠন করবে এবং সংসদে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কতটা শক্তিশালী হবে তার ওপর।