দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফিরেছেন নতুন এক তারেক রহমান। তিনি আমূল বদলে গেছেন। বদলে দিচ্ছেন নির্বাচনী প্রচারের চিরাচরিত ধারা। প্রচারের প্রথম দিন থেকেই দেখাচ্ছেন একের পর এক চমক।
নির্বাচনী জনসভাকে বানিয়ে ফেলছেন আলোচনাসভা। মাইক হাতে বক্তৃতার বদলে করছেন সঞ্চালনা। কোথাও বনে যাচ্ছেন ঝানু অধ্যাপক। সহজ ভাষায় বুঝিয়ে দিচ্ছেন বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে তাঁর এই ব্যতিক্রমী ভিডিও ক্লিপগুলো।
রীতিমতো নতুনত্ব দেখাচ্ছেন তারেক রহমান। তিনি প্রথার বাইরে গিয়ে সাধারণ মানুষের কাউকে মঞ্চে ডেকে নিচ্ছেন, আবার কখনো নিজেই মঞ্চ থেকে নেমে মানুষের কাছে যাচ্ছেন। মানুষের চাহিদার কথা শুনছেন, তুলে ধরছেন নিজের পরিকল্পনাও।
সব আয়োজন যেন সাধারণ মানুষকে ঘিরেই। পরিকল্পনায় আগামী দিনে একটি স্বনির্ভর ও স্বাবলম্বী বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্বাচনী প্রচারাভিযানের চিত্র অনেকটা এমনই। এমন নির্বাচনী প্রচারে প্রশংসায় ভাসছেন তিনি।
সাধারণত নির্বাচনী প্রচারে মঞ্চে বিশাল একটা ব্যাকড্রপ (দৃশ্যপট) থাকে, ডায়াস থাকে।
শীর্ষ নেতার জন্য তোয়ালে দিয়ে ঢেকে বিশাল একটি রাজকীয় চেয়ার রাখা হয়। অন্য নেতাদের জন্য সারি সারি চেয়ার সাজানো হয়। সিনিয়র নেতা থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা মঞ্চে ওঠেন। শীর্ষ নেতা বক্তব্য দেওয়ার সময় অন্য নেতারা পেছনে দাঁড়িয়ে থাকেন। এসব যেন প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এবার নির্বাচনী প্রচারে তারেক রহমান নতুনত্ব এনেছেন। তিনি এসব পছন্দ করছেন না। তিনি রাজকীয় চেয়ারের বদলে বসছেন সাধারণ চেয়ারে।
জানতে চাইলে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পুরনো ধারার রাজনীতি থেকে বের হয়ে আমাদের নেতা তারেক রহমান নতুন রাজনীতি উপহার দিতে চাচ্ছেন। পুরনো স্টাইলে মানুষ বিরক্ত। মানুষ আর প্রতিশ্রুতি চায় না, বাস্তবায়ন চায়। সে কারণে তিনি মানুষের কথা শুনছেন এবং নিজের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরছেন।’
তিনি বলেন, তারেক রহমানের নতুন ধারার রাজনীতি পরবর্তী সময়ে অনেকেই ফলো করবেন। কারণ মানুষ এখন আর ইশতেহার চায় না। এসব নিয়ে আর কোনো চাহিদা নেই। বাস্তবতা হচ্ছে—মানুষ তাদের কথা, চাহিদা জানাতে চায় এবং বাস্তব প্রয়োগ চায়।
বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মওদুদ আলমগীর হোসেন পাভেল কালের কণ্ঠকে বলেন, নির্বাচনী প্রচারণায় মানুষের অভূতপূর্ব সাড়া পাচ্ছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। মঞ্চে উঠে গতানুগতিক কোনো বক্তব্য দিচ্ছেন না। তিনি মানুষের চাহিদার কথা শুনছেন। দল ও নিজের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরছেন।
তিনি বলেন, ‘১৭ বছর ভোট দিতে পারিনি, এখন ভোট দেওয়ার সুযোগ হয়েছে। ভোটকেন্দ্রে আসুন, ভোট দিয়ে যান—এসব কথা বললে মানুষ ভোট দিতে আসবে না। ভোট দিলে মানুষের প্রাপ্তিটা কী হবে, লাভ কী হবে, তা জানাতে পারলেই ভোটকেন্দ্রে আসবে। তারেক রহমান সেই কাজটি করেছেন।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মো. সাহাবুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, উনি (তারেক রহমান) সাধারণত রাজনীতিবিদরা যেভাবে মঞ্চে উঠে গলা ফাটিয়ে বক্তব্য দেন, সে রকমভাবে বক্তব্য দিচ্ছেন না। তাঁর বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে নতুনত্ব আছে। তিনি কখনো কাউকে মঞ্চে ডেকে নিচ্ছেন, কথা শুনছেন, আবার নিজের চেয়ারে বসতে দিচ্ছেন। মানুষের কাছ থেকে সুবিধা-অসুবিধাগুলো শুনতে চাচ্ছেন।
তিনি বলেন, ‘২০০৮ সালের আগেও তিনি এভাবে জনগণের সঙ্গে কানেক্ট থাকার চেষ্টা করেছেন। এবার দেখা যাক, ফাটিয়ে বক্তব্যের বদলে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যাগুলো সামনে তুলে আনা—জনগণ এই নতুনত্বটাকে কিভাবে নিচ্ছে। আরেকটু সময় লাগবে সাধারণ মানুষ ফিডব্যাক কী দেয়, তা জানার জন্য। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভালো ফিডব্যাক আছে। সবকিছু তো আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ফিডব্যাক দিয়ে হয় না।’
এদিকে গত রবিবার চট্টগ্রামে তরুণদের সঙ্গে আলোচনায় তাঁকে ‘স্যার’ না ডেকে ‘ভাইয়া’ ডাকার অনুরোধ জানান তারেক রহমান। চট্টগ্রামের র্যাডিসন ব্লু বে ভিউ হোটেলের মেজবান হলে ‘ইয়ুথ পলিসি টক উইথ তারেক রহমান’ অনুষ্ঠানের সূচনা বক্তব্যে তারেক রহমান বলেন, এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তরুণসমাজ। আগামী ১৫ থেকে ২০ বছর এই ইয়ুথ ফোর্স দেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রধান চালিকাশক্তি হবে। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে। তিনি বলেন, শুধু সমস্যা নিয়ে কথা বললে সমাধান আসে না। দেশকে কিভাবে সাজাতে চান এবং ভবিষ্যতে যারা দেশ পরিচালনা করবে তারা কিভাবে নেতৃত্ব দেবে, সেই ভাবনাগুলোই তিনি শুনতে চান।
অনুষ্ঠানে প্রশ্নোত্তর পর্বে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের এক শিক্ষার্থী প্রশ্ন শুরু করার সময় তারেক রহমানকে ‘স্যার’ সম্বোধন করেন। তখনই তিনি হালকা হাসির সঙ্গে বলেন, ‘একটু থামি। আপনারা চাইলে আমাকে ভাইয়া বলতে পারেন। বয়সের হিসাবে আঙ্কেলও বলতে পারেন। তবে আঙ্কেল ডাকটা খুব একটা পছন্দ করব না, ভাইয়া বললে ভালো লাগবে।’
এরপর ওই শিক্ষার্থী ধন্যবাদ জানিয়ে ‘ভাইয়া’ সম্বোধন করে প্রশ্ন শুরু করেন।