যেকোনো নির্বাচনে জিততে হলে ভোটারদের আকৃষ্ট ও মন জয় করতে হয়। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের ফল নিজেদের ঘরে তুলতে সুনির্দিষ্ট কৌশল ও পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। জোট গঠন, সুপরিকল্পিত ইশতেহার, জনগণ ও দেশ নিয়ে ভাবনা এবং সামাজিক সহযোগিতার মাধ্যমে ভোটারদের কাছে টানার চেষ্টা করছে দলটি। প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় নারী ও পুরুষ ভোটারদের আস্থায় নিতে দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন জামায়াত নেতাকর্মীরা।
এ ছাড়া আসন ও অঞ্চলভিত্তিক সমস্যা চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন দল ও জোটের প্রার্থীরা। সম্প্রতি জামায়াতের পলিসি সামিটে ইশতেহারের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়ে ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছে।
জামায়াত নেতারা মনে করছেন, বিগত সময়ে ভোট দিতে পারেননি, তবে আসন্ন নির্বাচনে প্রথম ভোট দেবেন এমন ভোটারের সংখ্যা অনেক বেশি। তাঁদের অধিকাংশ তরুণ-তরুণী।
নির্বাচনে এই তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে সরাসরি তাঁদের কাছে পৌঁছানোর পাশাপাশি অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্বল্প দৈর্ঘ্যের ভিডিও, নির্বাচনী গান, ই-পোস্টার, ফটোকার্ড ইত্যাদি ব্যবহার করা হচ্ছে। আবার অ্যানালগ পদ্ধতিতে লিফলেট নিয়ে ভোটারদের সঙ্গে ওয়ান টু ওয়ান যোগাযোগও করা হচ্ছে।
জামায়াতের নির্বাচনী প্রচারের অংশ হিসেবে গ্রাম-মহল্লায় নিয়মিত উঠান বৈঠক করা হচ্ছে। এই কৌশল তৃণমূলের ভোটের চিত্র পাল্টে দিতে পারে।
জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের প্রতিটি সাংগঠনিক ইউনিটকে এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে।
জামায়াত আমিরের জনসম্পৃক্ততা ভোটের মাঠে প্রভাব ফেলছে : জামায়াত নেতারা কালের কণ্ঠকে জানান, জামায়াত আমির ৫ আগস্টের পর থেকে জনগণের যেকোনো বিপদে-আপদে ছুটে গেছেন। সিলেটের বন্যা, ফেনীর বন্যা, রাজধানীতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাসহ যেকোনো বড় সমস্যায় মানুষের পাশে দ্রুত ছুটে গেছেন তিনি। জনগণের যেকোনো সমস্যায় পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। এ ছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত ও শহীদ পরিবারের পাশে থেকেছেন।
এতে জনগণের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন জামায়াত আমির। নানা জটিল সমীকরণ মাড়িয়ে ইসলামী ও মধ্যপন্থার বিভিন্ন দল মিলে ১১ দলের জোট গঠনও জনগণের মধ্যে তাঁর ব্যাপারে আস্থা তৈরি করেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা ও ম্যান্ডেট পাওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন তিনি।
জনমনে প্রশ্ন ছিল, জামায়াত নির্বাচনে জিতলে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। কিন্তু সম্প্রতি যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও প্রতিবেশী দেশের কূটনীতিকরা জামায়াত আমিরের সঙ্গে আলোচনায় বসায় সে প্রশ্ন অনেকটা দূর হয়েছে। জামায়াত আমিরের নেতৃত্বে দলটি কূটনীতিকদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছে—দলটি ক্ষমতায় গেলে দেশের সংবিধান অনুযায়ী শাসন পরিচালনা করবে। নারীদের জন্য কঠোর আইন প্রয়োগ করা হবে না। নারীশিক্ষা ও অধিকার, ভিন্নধর্মের মানুষের জন্য সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা সমানভাবে নিশ্চিত করা হবে।
নারী ভোটারদের কাছে টানতে জামায়াতের মহিলা শাখা তৎপর : আসন্ন নির্বাচনে ছয় কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৫২৪ জন নারী ভোটার রয়েছেন। জামায়াতের মহিলা শাখা অত্যন্ত তৎপর। ৫ আগস্টের পর থেকে প্রতিটি এলাকায় জামায়াতের মহিলা শাখার নেতাকর্মীদের মাধ্যমে কোরআন, হাদিসের দারসের মাধ্যমে নারী ভোটারদের কাছে পৌঁছানো হয়েছে। প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে নারী ভোটারদের সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে। এতে ভালো ফল পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছে জামায়াতের মহিলা শাখা। এ ছাড়া জামায়াতের মহিলা শাখার কেন্দ্রীয় নেতারা সরাসরি রাজনীতি ও পলিসি তৈরিতে কাজ করছেন। সম্প্রতি জামায়াতের পলিসি সামিটে জামায়াতের নারী নেতারা নারীদের নিরাপত্তা, শিক্ষা ও কাজের সুযোগ নিয়ে পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছেন।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম মাসুম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নারী অধিকারের বিষয়ে ইসলাম মা, বোন ও স্ত্রীকে যে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছে, আমরা সমাজে তাই হুবহু প্রতিষ্ঠিত করব। বর্তমানে নারীরা যে নির্যাতন, হয়রানি বা যৌতুকের বলি হচ্ছেন, তা বন্ধে আমরা সর্বোচ্চ ন্যায়বিচার কায়েম করব। আমাদের এই অঙ্গীকার মানুষকে আকৃষ্ট করছে।’
নির্বাচনী ইশতেহারে জনগণের সম্পৃক্ততা : ভোটারদের আকৃষ্ট করতে পাঁচ বছরের কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী ইশতেহার সাজায় দলগুলো। জানা গেছে, আসন্ন নির্বাচন ঘিরে বড় ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে ইশতেহার সাজিয়েছে জামায়াত। এরই মধ্যে ইশতেহার প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। আগামীকাল রবিবার জামায়াতের ইশতেহার প্রকাশের কথা রয়েছে।
এক ফেসবুক বার্তায় জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান জানান, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই প্রথম জনগণের সরাসরি মতামতের ভিত্তিতে নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়নে ‘জনতার ইশতেহার’ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ ‘জনতার ইশতেহার’-এর ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপ আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে দেশের সর্বস্তরের মানুষ আগ্রহ নিয়ে মতামত দিয়েছেন। এই ‘জনতার ইশতেহার’ প্ল্যাটফর্মে ৩৭ হাজারের বেশি মতামত পাওয়া গেছে। এই মতামতগুলো এসেছে জাতীয় খাতভিত্তিক, ৩০০টি সংসদীয় আসনভিত্তিক, পেশাভিত্তিক, অঞ্চল, শহর ও জেলাভিত্তিক ক্যাটাগরি থেকে।
চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি নির্মূলের অঙ্গীকার : গত ২২ জানুয়ারি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরুর পর থেকে দেশের উত্তরবঙ্গ, দক্ষিণবঙ্গ, ঢাকাসহ দেশজুড়ে চষে বেড়াচ্ছেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। এ সময় ভোটারদের আকর্ষণ করতে অঞ্চলভিত্তিক সমস্যা চিহ্নিত করে সমস্যা সমাধানের আশাবাদের পাশাপাশি চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি নির্মূলের অঙ্গীকার করছেন জামায়াত আমির। এ ছাড়া নির্বাচনের ইশতেহারেও থাকছে দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান। জামায়াতের এই অবস্থান দলটির ভোট বাড়াতে ভূমিকা রাখবে।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম মাসুম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশে দীর্ঘদিন ধরে চলা দুর্নীতি ও দেশবিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে দেশকে রক্ষা করতে হলে সৎ, জবাবদিহিসম্পন্ন যোগ্য ও অভিজ্ঞ লোকের প্রয়োজন। আমাদের বিশ্বাস, জনগণ যদি আমাদের বিবেচনা করে তবে সমাজ থেকে অন্যায় ও দুর্নীতি দূর হবে এবং মানুষের অধিকার ও একটি শান্তিপূর্ণ মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে।’