জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় স্থানীয় বিএনপি নেতার বাড়ি, জামায়াতের তিনটি অফিস, একটি দোকান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাসে আগুন দেওয়া হয়েছে। পক্ষান্তরে বিএনপি নেতা বাচ্চু মিয়ার বাড়ি কুপিয়ে তছনছ এবং দলীয় কার্যালয় ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে।
অপরদিকে ঠাকুরগাঁওয়ে মোটরসাইকেল রাখা নিয়ে বিএনপি ও জামায়াত সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। এতে নারীসহ তিনজন গুরুতর আহত হন। তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
?কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, রবিবার রাত ১১টার দিকে একদল লোক উপজেলার শুভপুর ইউনিয়নের ধনিজকরা গ্রামের বিএনপি নেতা বাচ্চু মিয়ার বাড়িঘর কুপিয়ে তছনছ করে। এ সময় হামলাকারীরা প্রাণনাশের হুমকি দেয়। বাচ্চু মিয়া দাবি করেন, ওই দিন বিকালে রাজনৈতিক কথা-কাটাকাটির জের ধরে জামায়াত-শিবির নেতা-কর্মীরা হামলা চালিয়ে তাঁর বাড়িঘর চাঙচুর করেন। একই রাতে একই গ্রামে জামায়াতের নির্বাচনি অফিসে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এরপর গভীর রাতে পার্শ্ববর্তী গাছবাড়িয়া গ্রামের তেলিপুকুর পাড়ে জামায়াতের নির্বাচনি কার্যালয়ে মোটরসাইকেলে আসা মুখোশধারী তিন যুবক আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে ওই অফিস ও অফিস লাগোয়া একটি মুদি দোকান পুরোপুরি ভস্মীভূত হয়ে যায়। এতে ১৫ লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেন দোকানি নাছির। এ ছাড়া একই রাতে পার্শ্ববর্তী কালিকাপুর ইউনিয়নের সমেশপুর মোসলেম মার্কেটে জামায়াতের নির্বাচনি অফিসে পেট্রোল ঢেলে আগুন দেওয়া হয়। এ ছাড়া বাতিসা ইউনিয়নের নানকরা আয়েশা ছিদ্দিকা (রা.) মহিলা মাদ্রাসার ছাত্রীদের বহনকারী বাসে আগুন লাগিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। এ নিয়ে উত্তেজনায় পরদিন দুপুরে ধনিজকরা বাজারে উভয় পক্ষের হামলায় উপজেলা বিএনপির প্রচার সম্পাদক গাজী ইসমাইল, ছাত্রদল নেতা শাহাদাত হোসেন, জামায়াত সমর্থক তাসকিনসহ পাঁচজন আহত হয়েছেন।
কালিকাপুর ইউনিয়নের সমেশপুরের এক বাসিন্দা বলেন, দুই ছাত্রদল কর্মী জামায়াত অফিসে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেন। পক্ষান্তরে হামলায় তছনছ ঘরের মালিক ধনিজকরার বিএনপি নেতা বাচ্চু বলেন, গরু বিক্রির ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা নিয়ে গেছেন জামায়াতের নেতা-কর্মীরা।
?চৌদ্দগ্রাম উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মো. বেলাল হোসাইন বলেন, ‘নির্বাচন নিয়ে চৌদ্দগ্রামকে অশান্ত করতে পাঁয়তারা করছেন বিএনপির অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা। এরই অংশ হিসেবে তারা তিনটি নির্বাচনি অফিস জ্বালিয়ে দিয়েছে। রেহাই পায়নি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গাড়ি ও জামায়াত অফিস সংলগ্ন মুদি দোকান।’
?চৌদ্দগ্রাম উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার শাহ আলম রাজু বলেন, ‘রবিবার রাতে জামায়াতের সশস্ত্র নেতা-কর্মীরা ধনিজকরায় বিএনপি সমর্থক বাচ্চু মিয়ার বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও লুটপাট করেছে। পাশাপাশি ওই বাজারে আমাদের পার্টি অফিসও ভাঙচুর করে।’
?চৌদ্দগ্রাম মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. গুলজার আলম বলেন, ‘ধনিজকরায় জামায়াত-বিএনপির সংঘর্ষের সংবাদ শুনে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনি। জামায়াত-বিএনপির পাল্টাপাল্টি অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনায় কেউ লিখিত অভিযোগ দিলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি জানান, ঠাকুরগাঁওয়ে মোটরসাইকেল রাখা নিয়ে রবিবার বিকালে বিএনপি ও জামায়াত সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে নারীসহ তিনজন গুরুতর আহত হয়েছেন। আহতরা হলেন শিবগঞ্জ মহব্বতপুর কারিগরি উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ও মহেষপুর চৌধুরী বাড়ি জামে মসজিদের ইমাম আবু সাঈদ (৩২), ওই এলাকার ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি জামিল সরকার সাদ্দাম (৩০) এবং খোরশেদ আলীর স্ত্রী সেলিনা বেগম (৪৫)। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আবু সাঈদ জামায়াত কর্মী। সদর উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের শিবগঞ্জ মহেষপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
এলাকাবাসী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রবিবার বিকালে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের জামায়াতের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন নির্বাচনি কার্যক্রমের অংশ হিসেবে মহেষপুর গ্রামে তার আত্মীয় আবু সাঈদের বাড়িতে যান। এ সময় কয়েকটি মোটরসাইকেল বাড়ির আশপাশে রাখা হয়। উঠান বৈঠক শেষে দেলাওয়ার হোসেন ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
এরপর মোটরসাইকেল রাখা নিয়ে আবু সাঈদের সঙ্গে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দল সভাপতি জামিল সরকার ও আরেক কর্মী সেলিম রেজার কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে বিষয়টি হাতাহাতিতে রূপ নেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেলিম রেজার মা সেলিনা বেগম ঘটনাস্থলে গেলে তিনিও আহত হন। পরে স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে ঠাকুরগাঁও জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করান। বর্তমানে তিনজনই চিকিৎসাধীন।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন জামিল সরকার বলেন, ‘আমার বাড়ির পাশে জামায়াতের মিটিং ছিল। হঠাৎ দেখি ৫০-৬০টি মোটরসাকেল ঢুকে পড়ছে। আমি তাদের বলতে যাই আপনারা এখানে মোটরসাইকেলগুলো রাখবেন না। যেহেতু আমরা সপরিবার বিএনপি করি। আপনারা ওই দিকে মিটিং করে চলে যান। পরে আবু সাঈদ এসে বলছে যে এটা কি তোমার জমি যে বাধা দিচ্ছ? পরে আমাকে নানা ধরনের হুমকিধমকি দেয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আবু সাঈদ ১৭ বছর ছিল আওয়ামী লীগ, এখন জামায়াত হয়ে গেছে। পরে আমাকে তারা মারধর এবং তার হাতে থাকা খুর দিয়ে আঘাত করে। এতে আমি ও আমার ভাই সেলিম এবং তার মা আহত হন।’
অপরদিকে শিক্ষক আবু সাঈদ অভিযোগ করে বলেন, ‘মোটরসাইকেল রাখা নিয়ে স্বচ্ছাসেবক দলের জামিল সরকার সাদ্দাম বাজেভাবে গালিগালাজ শুরু করেন। সেখানে গেলে সে আমাকে বলে এটা বিএনপির এলাকা, এখানে কোনো জামায়াত কথা বলতে পারবে না। ভালোই ভালো চলে যান। নইলে পরিস্থিতি ভালো হবে না বলে তেড়ে আসে সাদ্দাম ও সেলিম।’
এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার খোদাদাদ হোসেন বলেন, আহতরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আচরণবিধি লঙ্ঘনে চার প্রার্থীকে শোকজ জবাব দিতে নির্দেশ : নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী ফ্রন্ট ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানাকে শোকজ করেছে নির্বাচনি অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি। তাদের সবাইকে সশরীরে হাজির হয়ে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী জানান, আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনের জামায়াত প্রার্থী অধ্যাপক মজিবুর রহমানকে শোকজ করেছে নির্বাচনি অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি। রবিবার কমিটির হয়ে রাজশাহীর যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ প্রথম আদালতের বিচারক মোছা. কামরুন নাহার কারণ দর্শানোর এ নোটিস পাঠান। এতে মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টায় তাকে যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ প্রথম আদালতে সশরীরে হাজির হয়ে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কারণ দর্শানোর নোটিসে বলা হয়েছে, অধ্যাপক মজিবুর রহমানের উপস্থিতিতে গোদাগাড়ীর রিশিকুল ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডে এক উঠান বৈঠকে বিরোধী দলের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য প্রদান এবং প্রকাশ্যে ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকে ভোট প্রার্থনা করা হয়েছে। এই ভিডিও বিভিন্ন সমাজমাধ্যমে প্রচার ও প্রকাশ করা হয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি জানান, আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ-বিজয়নগরের দুই ইউনিয়ন) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানাকে শোকজ করা হয়েছে। রবিবার রাতে রিটার্নিং অফিসার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক শারমিন আক্তার জাহান স্বাক্ষরিত চিঠিতে ২২ জানুয়ারি বেলা ১১টায় উপস্থিত হয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়। না হলে তার অনুপস্থিতিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে রুমিন ফারহানা জানান, নির্ধারিত সময়ে আইনজীবী গিয়ে জবাব দিয়ে আসবেন। নির্বাচনের প্রচার শুরুর আগে রিটার্নিং অফিসার এমন চিঠি দিতে পারেন না উল্লেখ করেন তিনি। এর আগে গত শনিবার তার বিরুদ্ধে ‘মব’ সৃষ্টির অভিযোগ করা হয়েছে।
হবিগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে হবিগঞ্জ-৪ আসনের বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের এমপি প্রার্থী আলোচিত ইসলামি বক্তা মো. গিয়াস উদ্দিন তাহেরীকে শোকজ করেছে নির্বাচনি অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি। বৃহস্পতিবার কমিটির চেয়ারম্যান মো. রবিউল হাসান স্বাক্ষরিত নোটিসে এ আদেশ দেওয়া হয়। তবে বিষয়টি গতকাল দুপুরে নিশ্চিত করেছেন জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক আবু হাসনাত মোহাম্মদ আরেফিন। নোটিসে উল্লেখ করা হয়, নির্বাচনি বিধি অনুসারে ভোট গ্রহণের জন্য নির্ধারিত দিনের তিন সপ্তাহ আগে কোনো প্রকার নির্বাচনি প্রচারণার সুযোগ নেই। কিন্তু গিয়াস উদ্দিন তাহেরী তার ফেসবুক পেজ থেকে নির্বাচনি প্রচারসংক্রান্ত ভিডিও প্রচার করেন। ২০ জানুয়ারি সশরীরে বা প্রতিনিধির মাধ্যমে নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হয়ে লিখিতভাবে কারণ দর্শানোর জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এদিকে হবিগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপি প্রার্থী সৈয়দ ফয়সলকেও একই অভিযোগে শোকজ করেছে নির্বাচনি অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি। ২০ জানুয়ারি লিখিতভাবে কারণ দর্শানোর জবাব দিতে বলা হয়েছে।