ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে ঢাকা-১৯ (সাভার-আশুলিয়া) আসনে নয় জন এবং ঢাকা-২০ (ধামরাই) আসনে ছয় জন প্রার্থীকে বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে যাচাই-বাছাইয়ের সময় ঢাকা-১৯ আসনে বাংলাদেশ মুসলিম লীগের প্রার্থী মো. কামরুলের মনোনয়নপত্র স্থগিত রাখা হয়। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তিনি আপিল করেছেন।
দুটি আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী থাকলেও তৃণমূল পর্যায়ে ভোটের রাজনীতিতে এখনও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেননি। এ অবস্থায় বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীদের মধ্যেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে মনে করছেন ভোটাররা। ভোটারদের দেওয়া তথ্যমতে, এই দুই আসনে নির্বাচন মূলত বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই প্রার্থীরা সভা-সমাবেশ, জনসংযোগ ও লিফলেট বিতরণসহ নানা কর্মসূচির মাধ্যমে প্রচারণা শুরু করেন। ভোটারদের কাছে তুলনামূলকভাবে কম পরিচিতি এবং সামগ্রিকভাবে প্রচারে পিছিয়ে থাকায় এনসিপির চেয়ে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীরা মাঠে এগিয়ে রয়েছেন বলে মত ভোটারদের।
দুটি আসনের বিভিন্ন এলাকার ভোটাররা মনে করছেন, প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলত বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেই হবে। তাদের মতে, ভোটার উপস্থিতি এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ভোটের ভাগ কোন দিকে যায়, তার ওপর জয়-পরাজয় অনেকটাই নির্ভর করবে। এ ছাড়া জামায়াতের সঙ্গে জোটভুক্ত দলগুলোর আসন সমঝোতা নিয়ে আলোচনা থাকায় এই দুই আসনে এনসিপি ও জামায়াত-উভয় দলের প্রার্থী থাকলেও শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়, তা নিয়েও কৌতূহল রয়েছে।
ঢাকা-১৯ (সাভার-আশুলিয়া)
এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য ১১ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। যাচাই-বাছাই শেষে বিভিন্ন দলের নয় জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়। বিএনপির প্রার্থী হিসেবে এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন। তিনি ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে সাভার এলাকা নিয়ে গঠিত তৎকালীন ঢাকা-১২ আসন থেকে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। বর্তমানে তিনি বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-পরিবার কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক। মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিনে ঢাকা জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব খান মনোনয়ন নিলেও পরে আর জমা দেননি।
জামায়াতের দলীয় প্রার্থী হিসেবে এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মো. আফজাল হোসাইন। তিনি জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা জেলার সেক্রেটারি এবং স্থানীয় ভোটারদের মধ্যে তার পরিচিতি তুলনামূলকভাবে শক্ত।
আসনটিতে শুরুতে এনসিপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে দলের যুগ্ম সদস্যসচিব ও শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক ফয়সাল মাহমুদ শান্ত মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করলেও শেষ পর্যন্ত তা জমা দেননি। পরে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিনে এনসিপির প্রার্থী হিসেবে দলের সদস্য দিলশানা পারুল মনোনয়নপত্র দাখিল করেন।
জামায়াতের প্রার্থী মো. আফজাল হোসাইন বলেন, ‘দীর্ঘদিনের নির্যাতন, নিপীড়ন, অন্যায় থেকে মানুষ পরিত্রাণ পেতে চায়। ইতিবাচক পরিবর্তন চায়। আমরাও সেই লক্ষ্যে কাজ করছি এবং ভবিষ্যতেও করবো। প্রচারণার সময় ভোটারদের কাছ থেকে ভালোই সাড়া পেয়েছি। আশা করছি তারা আমাকে ভোট দিয়ে দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করার সুযোগ দেবেন।’
বিএনপির প্রার্থী দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বলেন, ‘তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়েই নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়েছি। সকল নেতাকর্মীও গিয়েছেন।’
ঢাকা জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব খান বলেন, ‘মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করা হলেও দলীয় সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত ছিল। দলীয় সিদ্ধান্ত অনুসারে সম্মিলিতভাবে দলীয় প্রার্থীকে বিজয়ী করতে আমরা কাজ করছি।’
এনসিপির প্রার্থী দিলশানা পারুল বলেন, ‘শুনেছি জোটের প্রার্থী হিসেবে ঢাকা-১৯ আসনে আমাকে প্রার্থী করা হয়েছে। তবে পরবর্তীতে যেকোনো বিষয়ে দলের সিদ্ধান্তই হবে আমার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।’
ঢাকা-২০ (ধামরাই)
এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য ছয় জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। যাচাই-বাছাই শেষে সবার মনোনয়নপত্রই বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। বিএনপির প্রার্থী হিসেবে এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মো. তমিজ উদ্দিন। তিনি ধামরাই উপজেলা বিএনপির সভাপতি।
নির্বাচনে অংশ নেওয়ার লক্ষ্যে ঢাকা জেলা যুবদলের সভাপতি মো. ইয়াছিল ফেরদৌস মুরাদ এবং ঢাকা জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক নাজমুল হাসান অভি মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করলেও দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শেষ পর্যন্ত তারা মনোনয়নপত্র জমা দেননি। তবে নির্বাচনি মাঠে অংশ নেওয়ার লক্ষ্যেই তারা দুজনই আসনের বিভিন্ন এলাকায় জোরালো প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছিলেন। এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মো. আব্দুর রউফ।
বিভিন্ন এলাকার ভোটাররা জানান, নানা কারণে রাজনীতির মাঠে বিএনপির প্রার্থী মো. তমিজ উদ্দিন তুলনামূলকভাবে কম সক্রিয় থাকায় ভোটারদের মধ্যে এখনও তিনি নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেননি। তবে তাদের ধারণা, বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অধিকাংশ ভোট তমিজ উদ্দিনের পক্ষেই যেতে পারে।
এই আসনে এনসিপির পক্ষে স্থানীয়ভাবে সক্রিয় ছিলেন আসাদুল ইসলাম মুকুল। তবে দল তাকে মনোনয়ন দেয়নি। পরে এনসিপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নাবিলা তাসনিদ মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করলে বিষয়টি আলোচনায় আসে। মনোনয়ন দাখিলের শেষ দিনে স্থানীয় এনসিপির নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেন, তিনি তাদের সঙ্গে পরিচিত নন এবং জুলাই-আগস্টের আন্দোলন ও পরবর্তী সময়ে সংগঠনের কোনও কার্যক্রমে সম্পৃক্ততা ছিল না। এসব অভিযোগ তুলে উপজেলা কমিটির সমন্বয়কারীসহ এনসিপির নেতাকর্মীরা তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন।
বিএনপির প্রার্থী মো. তমিজ উদ্দিন বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে আমি জড়িত। সংগ্রাম ও সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে ধামরাইয়ে দলটিকে দাঁড় করিয়েছি এবং দলের প্রতি ধামরাইবাসীর আস্থা রয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি এবারের নির্বাচনে ধামরাইয়ের ভোটাররা যে পরিমাণ ভোট ধাণের শীষে দেবেন এটা ইতিহাস হবে। ভোটারদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলনের চেষ্টা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমার অবস্থানের কারণে ভোটারদের কাছে আমার প্রতি আস্থা রয়েছে বলে মনে করি।’
জামায়াতের প্রার্থী মো. আব্দুর রউফ বলেন, ‘এনসিপি আসনটি চাচ্ছে। কোনও সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি। তবে আমি আশাবাদী সেভাবেই কাজ করতেছি। দল যে সিদ্ধান্ত নেবে সেটাই হবে আমার সিদ্ধান্ত।’
এনসিপির প্রার্থী হিসেবে নাবিলা তাসনিদ বলেন, ‘রাজনীতিতে আমার যাত্রা নতুন। তবে এটি আমার জন্য একটি বড় সুযোগ। রাজনীতির বড় একটি অংশ হচ্ছে নেতৃত্ব। দীর্ঘদিন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে লিডারশিপের জায়গায় থাকার কারণে নেতৃত্ব দেওয়ার সেই যোগ্যতা রয়েছে আমার। নেতৃত্বের শূন্যতা দূর করতে যোগ্যদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। সবাইকে নিয়েই দেশ ও জাতীর স্বার্থে কাজ করার সুযোগ ভোটাররা ভোটের মধ্য দিয়ে দেবেন এটাই প্রত্যাশা।’