Image description

বাংলাদেশের মূলধারার রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে গড়ে উঠেছে ছাত্র রাজনীতি। শিক্ষাঙ্গন থেকে শুরু হওয়া এ রাজনীতি কখনোই কেবল ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক ছিল না। ভাষা আন্দোলন থেকে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন হয়ে সাম্প্রতিক কোটা সংস্কার ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান; প্রতিটি পর্যায়েই ছাত্র শক্তি জাতীয় রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণে ভূমিকা রেখেছে। এই দীর্ঘ ধারায় ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগের নেতৃত্বই মূলত প্রাধান্য পেয়েছে, আর স্বাধীনতার পর ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবির যুক্ত হলেও শিবির সাধারণত থেকেছে পর্দার আড়ালে।

কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও ৫ আগস্ট-পরবর্তী বাস্তবতায় সেই প্রচলিত ভারসাম্যে স্পষ্ট পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। দীর্ঘ সময় কোণঠাসা থাকার পর দেশের প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ইসলামী ছাত্রশিবিরের সংগঠিত পুনরুত্থান ও ধারাবাহিক নির্বাচনী সাফল্য কেবল ছাত্র রাজনীতির ভেতরকার শক্তির পুনর্বিন্যাস নয়, বরং আগামী জাতীয় রাজনীতিতে নেতৃত্ব, আদর্শ ও ক্ষমতার সমীকরণ কীভাবে বদলাতে পারে, সে প্রশ্নও সামনে এনে দিয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগর ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সবখানেই শিবিরের এই আধিপত্য কেবল ছাত্র রাজনীতির পরিবর্তন নয়, বরং জাতীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথের একটি স্পষ্ট বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। জুলাইয়ের আন্দোলনে ছাত্রশিবিরের কৌশলগত ভূমিকা ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত।

সরাসরি দলীয় ব্যানারে না এসেও মাঠ পর্যায়ে লজিস্টিক সাপোর্ট, আন্দোলন সমন্বয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণায় তারা অভাবনীয় দক্ষতা দেখিয়েছে।

ছাত্রদল বিগত দিনগুলোতে সাধারণ সভা-সেমিনার ও কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক লাইনের ওপর নির্ভরশীল ছিল, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতিতে বাম সংগঠনগুলোর উপস্থিতি ছিল খুবই সীমিত। মিছিল, সভা ও রাজনৈতিক বিবৃতির মধ্যেই তাদের কার্যক্রম বেশি দেখা গেছে। শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন সমস্যা সমাধান বা সাংগঠনিক বিস্তারে তেমন কোনো সক্রিয়তা ছিল না বললেই চলে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে অংশ নিলেও তাদের ভূমিকা প্রান্তিকই থেকে যাচ্ছে। অধিকাংশ সময় তারা প্রার্থী দিলেও নির্বাচনী প্রচারণা, ভোটার সংযোগ বা জয়ের কৌশলে তেমন সক্রিয়তা দেখা যায়নি। ফলে নির্বাচনে তাদের ভোটের হার ও প্রতিনিধিত্ব খুবই কম ছিল।

নির্বাচন শেষে বাম ছাত্র সংগঠনগুলো সাধারণত ফলাফল প্রত্যাখ্যান, অনিয়মের অভিযোগ বা বিবৃতি দেওয়ার মধ্যেই তাদের অবস্থান প্রকাশ করেছে। এরপর সংগঠনের দৃশ্যমান কার্যক্রম আবারও স্তিমিত হয়ে পড়ে।

এতে করে ছাত্র রাজনীতিতে তাদের প্রভাব ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে। ক্যাম্পাসে শক্ত সাংগঠনিক ভিত্তি ও নেতৃত্ব তৈরি না হলে আগামী জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব রাখার সক্ষমতাও আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

শিবির শুরুতে নিজেদের ‘প্রতিবাদী ছাত্রশক্তি’ হিসেবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে। মূলত এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশের মধ্যে তারা নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা পুনঃস্থাপন করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্যানেলগুলোয় শিবির-সমর্থিত প্রার্থীদের জয় তারই প্রমাণ।

চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠনগুলোকে কার্যত অপ্রাসঙ্গিক করে দিয়ে শিবিরের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এছাড়া অনেক ক্যাম্পাসে দেখা গেছে, দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী ছাত্র সংগঠন ও বাম সংগঠনগুলো প্রার্থী দেওয়ার মতো সাংগঠনিক শক্তিও হারিয়েছে, সেখানে শিবির সুসংগঠিত প্যানেল নিয়ে হাজির হয়েছে। ফলে সাম্প্রতিক বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও হল সংসদ নির্বাচনের ফলাফল শিবিরের রাজনৈতিক উত্থানের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হিসেবেই উঠে এসেছে।

এই পরিবর্তনের কারণ অনুসন্ধান করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ছাত্রলীগের দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতিতে দেশের বহু ক্যাম্পাসে একটি স্পষ্ট সংগঠনিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে। সেই শূন্যতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে শিবির তাদের কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে জোরদার করেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন আবাসিক হলে নিয়মিত বৈঠক, ধর্মীয় আলোচনা, পাঠচক্র এবং শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত ও একাডেমিক সমস্যায় সহায়তার মাধ্যমে তারা ধীরে ধীরে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছে। প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচির পরিবর্তে নীরব, ধারাবাহিক ও শৃঙ্খলাবদ্ধ সাংগঠনিক তৎপরতাকে কৌশল হিসেবে বেছে নিয়েছে। 

একই সঙ্গে প্রশাসনিক নজরদারি দুর্বল হয়ে পড়ায় এসব কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। এর ফলে ক্যাম্পাস রাজনীতির প্রচলিত ভারসাম্য বদলে যাচ্ছে এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন ধরনের রাজনৈতিক মেরুকরণ দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।

এই প্রক্রিয়াটি হঠাৎ করে শুরু হয়নি। বরং এটি একটি নীরব ও দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক অভিযাত্রার ফল। দীর্ঘ সময় ধরে প্রকাশ্যে অনুপস্থিত থাকলেও দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিবির নিজেদের সংগঠনকে অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে টিকিয়ে রেখেছিল। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে প্রকাশ্যে না আসার কৌশলটি ছিল একদিকে তাদের অস্তিত্ব রক্ষার উপায়, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ পুনরুত্থানের প্রস্তুতি।

এ সময় শিবিরের একটি অংশ প্রভাবশালী ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের ভেতরে গোপনে ঢুকে পড়ে এবং সেখান থেকেই নেটওয়ার্ক ও কার্যক্রম বিস্তৃত করে। এই গোপন অনুপ্রবেশ ও দীর্ঘস্থায়ী সাংগঠনিক ধৈর্য তাদের কৌশলগত সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

দেশের প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একই ধরনের কৌশল অনুসরণ করে ধাপে ধাপে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করেছে ছাত্রশিবির। ফলে ২০২৪ সালের পর যে দৃশ্যমান উত্থান দেখা যাচ্ছে, তা কোনো তাৎক্ষণিক বা আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং বহু বছর ধরে নীরবে গড়ে ওঠা একটি সংগঠনিক কাঠামোর প্রকাশ্য আত্মপ্রকাশ মাত্র।

এ প্রসঙ্গে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রদল সভাপতি ফয়সাল আহমেদ সজল বাংলানিউজকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিবিরের জয়ের মূল কারণ হলো ছাত্রদলের বিপরীতে থাকা প্যানেলের প্রার্থীরা দীর্ঘদিন ছাত্রলীগের ছত্রছায়ায় ক্যাম্পাসে সক্রিয় ছিল। তারা ছাত্রলীগের পরিচয়ে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালানোয় ছাত্রলীগের সমর্থনও পেয়েছে। অন্যদিকে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা মামলা, হামলা ও বাধার কারণে ক্যাম্পাসে স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারেনি, এমনকি পরীক্ষা দিতেও বাধার মুখে পড়েছে। এ কারণেই বিশ্ববিদ্যালয় ও হল সংসদ নির্বাচনী ফলাফলে বিপত্তি হয়েছে।

তিনি বলেন, আগামীতে ছাত্রদল সাংগঠনিক কাঠামো শক্ত করবে এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরলে সাধারণ শিক্ষার্থীরাই তাদের বেছে নেবে। শিবির ধর্মীয় আবেগ ব্যবহার করে ক্যাম্পাসে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির উত্থান ঘটিয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ। 

ছাত্রশিবিরের সদ্য সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, ছাত্রশিবিরের উত্থান হঠাৎ কোনো ঘটনা নয়। ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সংগঠনটি একটি নির্দিষ্ট আদর্শ নিয়ে ধারাবাহিকভাবে ছাত্রবান্ধব কাজ করে আসছে। এই দীর্ঘ সময়ে শিবিরকে বহু চড়াই-উতরাই, দমন-পীড়ন ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। জুলাই-আগস্টের আগেই ২৩৪ জন সদস্য শহীদ হয়েছেন, শত শত সদস্য গুম হয়েছেন, যাদের মধ্যে এখনো সাতজন নিখোঁজ। অনেকেই পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। এই ত্যাগের ধারাবাহিকতার ফলেই আজকের অবস্থানে পৌঁছানো, যা কোনোভাবেই আকস্মিক উত্থান নয়।

তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগে ক্যাম্পাসগুলোয় একদলীয় আধিপত্য ও সহিংস পরিবেশ ছিল, যেখানে শিবির কার্যত কাজ করার সুযোগ পায়নি। জুলাই-আগস্টের পর পরিস্থিতি বদলেছে। এখন গণতান্ত্রিক পরিবেশে শিবির শিক্ষার্থীদের কাছে সরাসরি যেতে পারছে, তাদের কাজ ও আদর্শ তুলে ধরতে পারছে। শিক্ষার্থীদের মানসিকতা ও সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সংগঠনের কর্মসূচিও হালনাগাদ করা হয়েছে। সচেতন শিক্ষার্থীরা নিজেরাই বিচার করছে তারা কোন আদর্শ কী চায় এবং কার লক্ষ্য কী।

ছাত্র সংসদে জয় প্রসঙ্গে শিবিরের সদ্য সাবেক সভাপতি বলেন, ছাত্র সংসদ নির্বাচনে শিবিরের সাফল্যের পেছনে বড় কারণ হলো কাদা ছোড়াছুঁড়ি ও সংঘাতের রাজনীতি এড়িয়ে ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও কৌশলের সঙ্গে কাজ করা। ক্যাম্পাসে সহাবস্থান, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও গণতান্ত্রিক চর্চার একটি নতুন সংস্কৃতি গড়ে উঠছে। এই অভিজ্ঞতা থেকে শিবির জাতীয় রাজনীতির জন্য একটি বার্তা দিতে চায়, রাজনীতিতে গুণগত ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন দরকার। ক্ষমতার রাজনীতি নয়, বরং পারস্পরিক সম্মান, উদারতা ও সহাবস্থানের রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হোক। আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। তাই মেধাবীদের হাত ধরেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে মনে করেন তিনি।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও রাজনীতি বিশ্লেষক মোহাম্মদ মোবাশ্বের হোসেন টুটুল বাংলানিউজকে বলেন, ছাত্র সংসদগুলোয় ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের বিজয় মূলত বাংলাদেশে উদার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক নেতৃত্বের দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। রাজনৈতিক আদর্শকে বিকশিত করার জন্য নেতৃত্বের দায়িত্ব হচ্ছে ক্রমাগত নিজেদের আদর্শকে জনগণের সামনে নিয়ে গিয়ে তাদের অনুপ্রাণিত করা, উদ্বুদ্ধ করা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিগত দুই দশক ধরে রাজনীতিকে জনবিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছে এবং এক ধরনের কোটা ব্যবস্থায় গড়ে তোলা হয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থায়ও আমূল পরিবর্তন হয়েছে। মুক্তচিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা স্তিমিত হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে মধ্যবিত্তের একটি বিরাট অংশ মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ঝুঁকে পড়েছে।

তিনি বলেন, উদার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলসমূহ তরুণদের রাজনৈতিক দলে যুক্ত করার তেমন কোনো উদ্যোগ না নিয়ে প্রথাগত জাতীয় রাজনীতির সমস্যা সমাধানে ব্যস্ত ছিলেন। এমতাবস্থায় প্রতিটি উদার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের উচিত হবে তরুণদের কাছে নিজেদের আদর্শকে আকর্ষণীয় করার জন্য গভীরভাবে গবেষণা করে প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া। আজকের তরুণরাই আগামীর ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনায় ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশের মতো অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা দেশ, যা মূলত বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল, সেটি যদি ধর্মীয় রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ে, তার প্রভাব জাতীয় জীবনযাত্রার মানে ব্যাপকভাবে পড়তে পারে।

রাজনীতি বিশ্লেষক মহিউদ্দিন খান মোহন বাংলানিউজকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা পরিষ্কার ভাবমূর্তির নেতৃত্ব চায় এবং স্বাভাবিকভাবেই তারা ক্ষমতাসীন বা সম্ভাব্য ক্ষমতাসীন শক্তির বিরুদ্ধে থাকে। এই বাস্তবতায় ছাত্রদলকে শিক্ষার্থীদের চোখে চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব ও টেন্ডারবাজির সঙ্গে যুক্ত একটি দুর্বল সিন্ডিকেট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তারা শিক্ষার্থীদের স্বার্থে আদর্শিক কাজ, সংগঠিত যোগাযোগ বা গ্রাসরুট রাজনীতি গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং তারা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করে থেকেছে, ভেবেছে ক্ষমতার পালাবদল হলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। এর বিপরীতে শিবির গোপনে সুসংগঠিত থেকে জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব বাড়িয়েছে। ছাত্রদলের বড় সংকট হলো অছাত্র ও বয়সে বড় নেতাদের আধিপত্য, যা সংগঠনের ছাত্রসত্তা ও রাজনৈতিক শক্তি নষ্ট করেছে। ফলে একসময় গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শক্ত স্তম্ভ ছাত্রদল এখন বিএনপির জন্য বোঝা। এই শূন্যতার সুযোগে জামায়াত-শিবির ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রক্ষমতার দিকে এগোচ্ছে।

উত্তরণের পথ হিসেবে তিনি বলেন, প্রকৃত ছাত্রদের দিয়ে সংগঠন পুনর্গঠন, গ্রাসরুট পর্যায়ে আদর্শিক রাজনীতি এবং শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোই একমাত্র সমাধান।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনের ফলাফল জাতীয় নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে না বলে মনে করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের ছেলেগুলো ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে কাজ করেছিল। হামলা-মামলার কারণে ছাত্রদলের ছেলেগুলো তখন সাংগঠনিক কার্যক্রম করতে পারেনি।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক ছাত্রদল সভাপতি শামসুজ্জামান দুদুও একই মত দেন। তিনি বাংলানিউজকে বলেন, ছাত্র রাজনীতি এবং জাতীয় রাজনীতি এক নয়। অতীতে দেখা গেছে, ছাত্র রাজনীতির ক্ষেত্রে বাম ছাত্র সংগঠন অনেক ভালো করেছে। কিন্তু সেসব বাম সংগঠন জাতীয় নির্বাচনে খুব একটা ভালো কিছু করতে পারেনি। আগামী জাতীয় নির্বাচন হলে এটি পরিষ্কার হয়ে যাবে।

তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, ছাত্র রাজনীতিতে শিবিরের এই প্রাধান্য কেবল একটি সাময়িক জোয়ার নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি ও আগামী রাজনীতির নেতৃত্ব প্রস্তুতির ফল। অন্যান্য দলগুলো যখন তাদের আখের গোছাতে ব্যস্ত, তখন তারা সাধারণ মানুষের ভালোবাসা ও সমর্থন কুড়াতে দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন। এই ধারা বজায় থাকলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জাতীয় রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য এবং আদর্শিক লড়াইয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের মতো অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা দেশ, যা মূলত বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল; সেটি যদি ধর্মীয় রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ে তার প্রভাব জাতীয় জীবনযাত্রার মানে ব্যাপকভাবে পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তারা।