ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দলের মনোনয়ন ফরম বিক্রি করে মোটা অঙ্কের অর্থ আয় করেছে কয়েকটি রাজনৈতিক দল। কোটি টাকার বেশি আয় হয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি)। আর ফরম বিতরণে টাকা নেয়নি দুই বড় দল বিএনপি ও জামায়াত।
কয়েকটি দল প্রতি আসনের বিপরীতে একাধিক মনোনয়ন বিক্রি করা হলেও জোটের কারণে বেশিরভাগ আসনেই নিজেদের প্রার্থী দিতে পারেনি। মনোনয়ন না পাওয়া এই নেতাদের টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।
এছাড়া ফরম বিক্রি বাবদ টাকা নেয়নি চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি। আর কয়েকটি দল জানিয়েছে, তারা নামেমাত্র ফি নিয়েছে।
তবে মনোনয়ন ফরম বিক্রি করে বড় অঙ্কের অর্থ আয় করেছে তরুণদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির নির্বাচনি মিডিয়া উপ-প্রধান মাহবুব আলম বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, তাদের ১ হাজার ৫০০টি মনোনয়ন ফরম বিক্রি হয়েছে।
সাধারণ প্রার্থীদের কাছ থেকে প্রতিটি ফরম বাবদ নেওয়া হয়েছে ১০ হাজার টাকা করে। এর মধ্যে জুলাইযোদ্ধা ও কৃষক-শ্রমিক প্রতিনিধিদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ২ হাজার টাকা করে। তবে এই ক্যাটাগরির প্রার্থী কতজন আছে, তা সঠিকভাবে তিনি বলতে পারেননি। এদের মধ্যে ২০০ জন প্রার্থী হলেও এখান থেকে আয় হয় ৪ লাখ টাকা।
বাকি ১ হাজার ৩০০টি ফরম ১০ হাজার টাকা হিসেবে বিক্রি করে আয় হয়েছে ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে মোট আয় হয়েছে ১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। তবে জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার কারণে মাত্র ৪৬টি আসনে প্রার্থিতা জমা দিয়েছে এনসিপি। এমনটি জানান মাহবুব।
মনোনয়ন ফরম বিক্রি নিয়ে প্রকাশ্যে কোনও তথ্য জানায়নি বিএনপি। এ বছর নির্দিষ্ট আসনে দলীয় প্রতীকে প্রার্থিতা করার কারণে সাধারণভাবে ফরম বিক্রি করেনি তারা। যদিও বিএনপির একজন উচ্চ পর্যায়ের নেতা বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছিলেন, মনোনয়ন ফরম বিক্রি করেই তাদের বেশিরভাগ আয় আসে।
সর্বশেষ ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের কাছে ফরম বিক্রি করে বিএনপির আয় হয়েছিল দুই কোটি ২৯ লাখ টাকা। তখন তারা চার হাজার ৫৮০টি ফরম বিক্রি করেছে প্রতিটি পাঁচ হাজার টাকা করে।
বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) ও শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) বিএনপির একাধিক দায়িত্বশীল নেতার কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলেও তারা উদ্ধৃত হতে সম্মত হননি। নয়া পল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের একজন জানান, এ বছর কেন্দ্রীয় অফিস থেকে নির্বাচনের ফরম বিক্রি হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চেয়ে নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট একজন নেতাকে কল করা হলেও তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
ফরম বিক্রির বিষয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, তাদের মোট ৩০০টি মনোনয়ন ফরম বিতরণ করা হয়েছিল। তবে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে জমা দিয়েছেন ২৭০টি আসনের প্রার্থী। আর আসন সমঝোতার কারণে ৩০ জন জমা দেননি।
তিনি জানান, তারা মনোনয়ন বাবদ কারও কাছ থেকে কোনও টাকা নেননি। ফরম দেওয়ার সময় শর্ত ছিল—দলের পক্ষ থেকে নির্দেশ দেওয়া হলে প্রত্যাহার করতে হবে। আর প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কেন্দ্রের বাইরেও স্থানীয় নেতাদের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
ফরম বিক্রি করে আয়ের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে তরুণদের আরেক রাজনৈতিক দল গণঅধিকার পরিষদ।
দলের উচ্চতর পরিষদের সদস্য আবু হানিফ বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, তার দল থেকে মোট ২৭০টি আসনে মনোনয়ন ফরম বিক্রি করা হয়েছে। প্রতিটি ফরমের দাম ২০ হাজার টাকা। সে হিসাবে তাদের আয় হয়েছে ৫৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
তিনি বলেন, ‘২৭০টি আসনে মনোনয়ন ফরম বিক্রি করা হলেও বিএনপির সঙ্গে আসন সমঝোতার কারণে মাত্র ১০৪টি আসনে প্রার্থীরা ফরম জমা দিয়েছেন।’
ধর্মভিত্তিক দ্বিতীয় বড় দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রচার ও দাওয়া সম্পাদক শেখ ফজলে করীম মারুফ জানান, তারা ৩০০ আসনে মনোনয়ন ফরম বিতরণ করেছেন। তবে জামায়াতসহ অন্যান্য দলের সঙ্গে আসন সমঝোতার কারণে তারা মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন ৭২টিতে। তিনি জানান, তার দল মনোনয়ন ফরম বাবদ প্রার্থীদের কাছ থেকে কোনও টাকা নেননি।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল ক্বাফী রতন বলেন, ‘‘আমরা মোট ৬৫টি ফরম বিতরণ করেছি। তবে এক্ষেত্রে কারও কাছ থেকে ন্যূনতম ফিও নেওয়া হয়নি।’ তিনি আরও জানান, কেন্দ্রীয়ভাবে কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। প্রার্থী বাছাই করেছে স্থানীয় সংগঠন।
বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, তারা মোট ১১টি ফরম বিতরণ করেছেন। এর মধ্যে ৭টি আসনের জন্য ফরম জমা দিয়েছেন মনোনীত প্রার্থীরা। আর দুটিতে মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। তারা আপিলে ফেরত না পেলে আমাদের প্রার্থী থাকবে ৫ জন। মনোনয়ন ফরম বিতরণে কারও কাছ থেকে তারা কোনও ফি নেননি বলে জানান সাইফুল হক।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক হাসান জুনাইদ জানান, জোটের সঙ্গে আসন সমঝোতা নিয়ে তারা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন। তাই তারা মনোনয়ন বিতরণ শুরু করেছেন ২৮ ডিসেম্বর থেকে। তাদের ফরম বিক্রি হয়েছে ১৫৫টি। আর জমা দিয়েছেন ৯০টি। প্রতিটি ফরম বিক্রি করা হয়েছে এক হাজার টাকা করে। সে হিসাবে তাদের আয়ের পরিমাণ এক লাখ ৫৫ হাজার টাকা।
গণসংহতি আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য বাচ্চু ভূঁইয়া জানান, তারা মোট ২৬টি ফরম বিতরণ করেছেন। প্রতিটি ফরম এক হাজার টাকা করে বিক্রি করা হয়েছে। সে অনুযায়ী তাদের আয় ২৬ হাজার টাকা। তিনি বলেন, ‘‘আসন সমঝোতার কারণে ১৮টি আসনে গণসংহতির প্রার্থীরা মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন।’’
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, তারা ১১০টি আসনে মনোনয়ন ফরম বিতরণ করেছেন। প্রতিটি ফরমের জন্য ফি নেওয়া হয়েছে ৫০০ টাকা করে। সে হিসাবে দলের আয় হয়েছে ৫৫ হাজার টাকা।’’ তিনি জানান, তারা ৪৫টি আসনে মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন। এর মধ্যে ৪১টি বৈধ হয়েছে।
এবি পার্টি শতাধিক মনোনয়ন ফরম বিক্রি করেছে। তাদের আয় খুব বেশি হয়নি বলে জানান একজন নেতা। তার ভাষ্য, ‘‘ফরমের মূল্য রাখা হয়েছে সৌজন্যমূলক।’’