Image description
ঢাকা ৫

রাজধানীর প্রবেশদ্বার ঢাকা-৫ আসন। যাত্রাবাড়ী ও ডেমরা এলাকা নিয়ে গঠিত এই আসনটিতে শুরু হয়ে গেছে ভোটের আমেজ। প্রার্থীরা কেউ যাচ্ছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে, কেউ অংশ নিচ্ছেন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে। গণসংযোগ আর প্রতিশ্রুতিতে মুখর পুরো এলাকা। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী প্রতীক নিয়ে ২১শে জানুয়ারি থেকে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করবেন প্রার্থীরা। চায়ের দোকান, পাড়ার অলিগলি থেকে শুরু করে বাসাবাড়িতেও এখন একটাই আলোচনা কে হচ্ছেন ঢাকা-৫ এর পরবর্তী সংসদ সদস্য। ভোটাররা প্রার্থী ও দলের কর্মকাণ্ড গভীরভাবে বিশ্লেষণ করছেন। প্রার্থীদের অতীত কর্মকাণ্ড, প্রতিশ্রুতি ও বর্তমান ভূমিকা বিচার করেই ভোট দেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে চান তারা।

সরজমিন দেখা যায়, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালসহ এই এলাকা থেকে দক্ষিণাঞ্চল, পূর্বাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের অন্তত ১৮টির বেশি জেলার বাস চলাচল করে। ফলে প্রতিদিনই লাখো মানুষের যাতায়াত এই আসনের ওপর নির্ভরশীল। তবে নাগরিক সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে দীর্ঘদিন ধরেই অবহেলিত এই আসন। এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, এখানে সবচেয়ে বড় সমস্যা জলাবদ্ধতা। নিচু এলাকা হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তাঘাট ডুবে যায়। অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে পানি জমে থাকে দীর্ঘ সময়। পাশাপাশি একাধিক বাসস্ট্যান্ডকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য ও গ্যাস সংকট নিত্যদিনের ভোগান্তি। এমন বাস্তবতায় ভোটাররা বলছেন, আর প্রতিশ্রুতি নয় তারা চান বাস্তব ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ। এলাকার দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে যিনি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন, তাকেই ভোট দিতে আগ্রহী তারা। আর জনগণের প্রত্যাশা পূরণে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন প্রার্থীরা। দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি।

এই আসনে লড়ছেন একাধিক হেভিওয়েট প্রার্থী। বিএনপি’র প্রার্থী ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি’র সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নবীউল্লাহ নবী। জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন দলটির কেন্দ্রীয় শূরা মজলিসের সদস্য মোহাম্মদ কামাল হোসেন। অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন হাজী মোহাম্মদ ইব্রাহিম। তিনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৬৭ নম্বর ওয়ার্ডের দু’বারের নির্বাচিত কাউন্সিলর ছিলেন। 
মাঠপর্যায়ে বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীরা বাড়ি-ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ভোটারদের কাছে নিজেদের বার্তা দিচ্ছেন। বিএনপি প্রার্থী ঘরোয়া সভা, ভোটার সংযোগ, প্রচারণা জোরদার করে তরুণ ও মধ্যবিত্ত ভোটারদের কাছে টানার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে জামায়াত ধর্ম ভিত্তিক- আদর্শিক ভোটার ও যুবকদের আকর্ষণ করতে নানা তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। এ ছাড়া নারীদের ভোট পেতে ডোর টু ডোর ক্যাম্পেইন করছেন তারা।   

মোমেনবাগ সালাহউদ্দিন স্কুলের পাশে দোকানে বসে চা খাচ্ছিলেন হারুন অর রশিদ। তিনি বলেন, গত তিনটি নির্বাচনে ভোট দিতে পারিনি। কেন্দ্রে যাওয়ার পর বলছে ভোট হয়ে গেছে। এবারো নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা ছিল। প্রথমে ভেবেছিলাম এবারে হয়তো ভোট হবে না। কিন্তু তারেক রহমান দেশে ফেরার পর সেই শঙ্কা কেটে গিয়েছে। এই আসনে জলাবদ্ধতা অন্যতম সমস্যা। আমরা চাই যেই জয়ী হোক তিনি যেন এলাকার জলাবদ্ধতা, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও মাদক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কাজ করেন। 

নির্বাচনকে সামনে রেখে আসনটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার লক্ষ্যে মোট ১৬ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এদের মধ্যে বিএনপি’র নবী উল্লাহ নবী ও জামায়াতের মো. কামাল হোসেনসহ ১৪ জনের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। অন্যরা হলেন- বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের শাহিনুর আক্তার সুমি, জাতীয় নাগরিক পার্টির এস এম শাহরিয়া, জাতীয় পার্টির মীর আব্দুস সবুর, বাংলাদেশ নেজামে ইসলামী পার্টির মোখলেসুর রহমান কাছেমী, বাংলাদেশ কংগ্রেসের মোহাম্মদ সাইফুল আলম, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মো. আতিকুর রহমান নান্নু মুন্সী, গণঅধিকার পরিষদের সৈয়দ মোহাম্মদ ইব্রাহিম, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের মো. তাইফুর রহমান রাহী, বাংলাদেশ লেবার পার্টির গোলাম আযম, আমার বাংলাদেশ পার্টির মো. লুৎফুর রহমান  ও এলডিপি’র হুমায়ুন কবির। 

মনোনয়ন বৈধ প্রার্থী ১৪ জন হলেও মাঠের আলোচনায় মূলত বিএনপি, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনকে ঘিরে। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের আসন সমঝোতা না হওয়ায় এ আসনে ইসলামী আন্দোলন ও জামায়াতের নেতাকর্মীরা নিজেদের দলের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন। তারা বলছেন, আসন সমঝোতা চূড়ান্ত হলে দলের সমর্থন দেয়া প্রার্থীর পক্ষেই প্রচারণা চালিয়ে যাবেন।

আমুলিয়া রোডে কথা হয় ব্যাংকে কর্মরত শাহেদ শিকদারের সঙ্গে- তিনি বলেন, এই এলাকার প্রধান সমস্যা জলাবদ্ধতা, ছিনতাই, মাদক ও কিশোর গ্যাং। বিশেষ করে ডেমরা এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য অনেক বেশি। এ এলাকায় অল্পতে পানি জমে যায়।  এ ছাড়া বাসস্ট্যান্ডে চাঁদাবাজি তো আছেই। 
শনিরআখড়া রুপসি গার্মেন্টস সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা রাজু হোসেন বলেন,  কোনো দল করি না। অবশ্যই প্রার্থী দেখে তার কাজকর্ম দেখেই ভোট দেবো। মানুষ এবার অনেক চিন্তা-ভাবনা করে ভোট দেবে। মাঠে নবী ভাইয়ের একক আধিপত্য রয়েছে।  অন্যদিকে জামায়াতের ভোট ভেতরগতভাবে আছে- ওরা প্রকাশ করে কম। এ ছাড়া এ অঞ্চলের মানুষ ইসলামিক চিন্তাধারার। নির্বাচন সুষ্ঠু হলে এখানে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে, কে জিতবে বলা মুশকিল। 

ঢাকা-৫ আসনটি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৪৮, ৪৯, ৫০, ৬২, ৬৩, ৬৪, ৬৫, ৬৬, ৬৭, ৬৮, ৬৯ ও ৭০ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত। এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৫ হাজার ৬৯২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৫৯ হাজার ৫৪৩ জন এবং নারী ভোটার ২ লাখ ৪৬ হাজার ১৪৬ জন। ঢাকা-৫ আসনে নির্বাচন ঘিরে একধরনের নীরব হিসাব চলছে। শান্ত পরিবেশের আড়ালে ভোটারদের মনে চলছে নানা প্রশ্ন ও বিশ্লেষণ । সবমিলিয়ে নির্বচনের ফলাফল কার পক্ষে যাবে জানতে অপেক্ষা করতে হবে ভোটের দিন পর্যন্ত।