সমুদ্রপাড়ের জেলা কক্সবাজার। একদিকে পৃথিবীর দীর্ঘতম বালুকাময় সমুদ্রসৈকত আর সারি সারি পাহাড়, অন্যদিকে সমুদ্রের নৈসর্গিক সৌন্দর্য। পর্যটন নগরী খ্যাত এই জেলার ৯টি উপজেলা নিয়ে চারটি সংসদীয় আসন গঠিত। আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরে দেশের সর্বদক্ষিণের এই ভূখণ্ডে জমে উঠেছে ভোটের প্রচার। নানা কর্মসূচির মাধ্যমে প্রচার চালিয়ে দিন-রাত এক করে ফেলছেন বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীরা।
যুগ যুগ ধরে এই জেলার মানুষ ইসলামপন্থি ও জাতীয়তাবাদী। সে হিসেবে এখানে বিএনপি ও জামায়াতের ভোট বেশি। কিন্তু আওয়ামী জামানায় দেড় দশক ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি স্থানীয়রা। জুলাই বিপ্লবের পর ফিরেছে নির্বাচনের পরিবেশ। রাজনৈতিক দলগুলোর সরব প্রচারে বইছে ভোটের হাওয়া। তবে কয়েকটি আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের কারণে উৎসবের আমেজে কিছুটা ভাটা পড়েছে। অন্তত দুটিতে নেতারা বিদ্রোহ করারও আশঙ্কা আছে।
বিএনপি ও জামায়াত ছাড়াও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি, নেজামে ইসলাম পার্টি, খেলাফত মজলিসসহ বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীরা ভোটের মাঠে তৎপর আছেন। এর মধ্যে কয়েকটি দল আলাদা করে প্রার্থীও ঘোষণা করেছে। তবে ভোটযুদ্ধে মূলত লড়াই হবে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে।
কক্সবাজার-১ (চকরিয়া ও পেকুয়া)
আসনটিতে শেকড় শক্ত করে অনেকটা স্থায়ী আসন গেড়েছে বিএনপি। এখানে ধানের শীষের ভিত্তি তৈরি করেছেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সরকারের প্রথম মেয়াদের সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) থেকে রাজনীতির মাঠে আসা সালাহউদ্দিন এ আসনে কখনো হারেননি। গণহত্যায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা সরকারের ১৫ বছর বাদ দিলে তার আগের একটি নির্বাচনেও হারেননি তিনি। রাজনৈতিক মামলাজনিত কারণে তিনি নিজে প্রার্থী হতে না পারলেও এ আসনে তার স্ত্রী হাসিনা আহমেদ জিতেছিলেন।
এবারও এখানে বিএনপি থেকে প্রার্থী হচ্ছেন সালাহউদ্দিন। দলটি তাকে আনুষ্ঠানিক মনোনয়নও দিয়েছে। যদিও এখনো মাঠে গুঞ্জন আছে যে আসনটিতে নিজের সহধর্মিণী হাসিনা আহমেদকে প্রার্থী করে নিজে লড়বেন কক্সবাজার-২ আসনে।
জামায়াত এখানে দলটির কক্সবাজার শহর শাখার আমির ও সাবেক ছাত্রনেতা আবদুল্লাহ আল ফারুককে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। এর পর থেকে তিনি নিজে ও সাংগঠনিকভাবে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি বড় শোডাউনও দেখিয়েছেন তিনি, যা ছিল চোখে পড়ার মতো। জামায়াতের নেতাকর্মীরা বলছেন, চকরিয়া-পেকুয়ায় দলটির নিজস্ব ভোট ব্যাংক আছে। জুলাই বিপ্লবের পর তাদের দলের প্রতি মানুষের আস্থা বেড়েছে। সে হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী যত হেভিওয়েটই হোক না কেন, ভোটের মাঠে জামায়াতের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তেই হবে।
এছাড়া এবি পার্টি ও গণঅধিকার পরিষদের একজন করে প্রার্থী আছেন। তাদের মধ্যে এবি পার্টির কেন্দ্রীয় সহ-পর্যটনবিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক এবি ওয়াহেদ ও গণঅধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক সহ-সম্পাদক আবদুল কাদের (প্রাইম) এলাকায় নির্বাচনি প্রচার চালাচ্ছেন।
কক্সবাজার-২ (মহেশখালী ও কুতুবদিয়া)
আসনটি জোটবদ্ধ নির্বাচনে জামায়াতকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। এখানে দলটির প্রার্থী হিসেবে জোটের হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক ছাত্রনেতা হামিদুর রহমান আযাদ। এবারও তিনি জামায়াতের ঘোষিত প্রার্থী। তার পক্ষে নিয়মিত ভোটের মাঠ চষে বেড়ান নেতাকর্মীরা। তিনিও মাঝেমধ্যে এলাকায় ফিরে নানা কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। তবে মামলাসংক্রান্ত জটিলতার কারণে গতকাল শুক্রবার তার মনোনয়নপত্র বাতিল করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। তিনি অবশ্য এ আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করবেন বলে জানিয়েছেন।
বিএনপি এখানে সাবেক সংসদ সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। তবে দলটির মনোনয়নপ্রত্যাশী আরো একাধিক নেতা। এ কারণে শেষ পর্যন্ত আলমগীর ফরিদের মনোনয়ন থাকবে কি না, তা নিয়ে আশঙ্কা আছে নেতাকর্মীদের একাংশের। এখানে দলটির নেতাকর্মীরা অন্তত চার ভাগে বিভক্ত। এর মধ্যে তিন গ্রুপ প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে সোচ্ছার আছে। এর মধ্যে সাবেক এমপি নুরুল বশর চৌধুরী, কুতুবদিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি জালাল আহমেদ ও মহেশখালী উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবু বকর ছিদ্দিকের গ্রুপ বেশ শক্তিশালী।
এছাড়া এনসিপির প্রার্থী হয়েছেন দলটির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব ও কক্সবাজারের সমন্বয়ক এ এস এম সুজা উদ্দিন। মাঠে সরব আছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাওলানা ওবাইদুল কাদের নদভী, নেজামে ইসলাম পার্টির কক্সবাজার জেলা শাখার নায়েবে আমির মাওলানা শওকত ওসমান কুতুবীও।
কক্সবাজার-৩ (সদর, রামু ও ঈদগাঁও)
আসনটি সব সময় বিএনপির ঘরেই থাকে। দলটির প্রার্থী যে-ই হোন না কেন, জেতে ধানের শীষ। তবে প্রতিবারই এখানে বিএনপির প্রার্থিতা নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। সেই সমস্যা সমাধান করে এবার একক প্রার্থী ঘোষণা করেছে দলটি। সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির মৎস্যজীবীবিষয়ক সম্পাদক লুৎফুর রহমান কাজল এবারও মনোনয়ন পেয়েছেন।
জামায়াতের এখানে সাংগঠনিক কার্যক্রম বেশ মজবুত। অনেক আগেই এখানে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করে রেখেছে দলটি। এবারের নির্বাচনে তাদের প্রার্থী কক্সবাজার সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি ও সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান শহিদুল আলম বাহাদুর, যিনি ভিপি বাহাদুর নামেই বেশি পরিচিত। তিনিও সাংগঠনিক ভিত্তি নিয়ে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। নেতাকর্মীরা মনে করেন, তারা ইতোমধ্যে সবকিছু কাভার করে নিয়েছেন। সাধারণ মানুষ ভিপি বাহাদুরকেই ভোট দিয়ে জিতিয়ে আনবে।
আসনটিতে এবি পার্টি, নেজামে ইসলাম পার্টির প্রার্থী তাদের মনোনীত প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। যদিও দল দুটির ভোটের মাঠে তেমন কোনো প্রভাব নেই। এবি পার্টির প্রার্থী হয়েছেন সাবেক ছাত্রনেতা সরওয়ার সাঈদ। এছাড়া নেজামে ইসলাম পার্টির কক্সবাজার জেলা শাখার আমির মাওলানা আ হ ম নুরুল কবির হিলালীর প্রার্থিতার কথাও বলছে দলটি। এছাড়া ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী হয়েছেন দলটির জেলা সভাপতি ও রামু চাকমারকুল দারুল উলুম মাদরাসার মুহাদ্দিস মাওলানা আমিরুল ইসলাম মীর।
কক্সবাজার-৪ (উখিয়া ও টেকনাফ)
সীমান্তের এ আসনে বিএনপির হয়ে দীর্ঘকাল ধরে ভোট করছেন জেলা শাখার সভাপতি ও সাবেক হুইপ শাহজাহান চৌধুরী। তিনি অনেকবার এখানে জিতেছেন। অনেকেই মনে করেন, ভোটের খেলায় তিনি পারদর্শী। এবারও বিএনপির হয়ে লড়ছেন তিনি। কিন্তু তার জন্য ‘পথের কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছেন জেলা বিএনপির অর্থ সম্পাদক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ। তিনি দীর্ঘদিন ধরে শাহজাহানের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছেন। আবদুল্লাহ আলাদা একটি রাজনৈতিক বলয়ও তৈরি করেছেন। বিশেষ করে টেকনাফে তার আছে একচ্ছত্র প্রভাব। দলীয় টিকিট না পেয়ে আবদুল্লাহ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন।
জামায়াত এখানে দলটির জেলা আমির মাওলানা নূর আহমেদ আনোয়ারীকে প্রার্থী করেছে। তিনি বর্তমানে টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান। তিনি ওই ইউনিয়ন পরিষদে প্রতিবারই চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তিনি একটি মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এবং এলাকায় সাধারণ মানুষের কাছে বেশ গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছেন। এলাকাবাসী মনে করে, ‘জোব্বাওয়ালা’ (মাওলানা নূর) যত দিন বেঁচে থাকবেন, তত দিন তিনিই চেয়ারম্যান হতে থাকবেন!
ইউনিয়ন পরিষদের এই জনপ্রিয়তাকে তিনি এবার সংসদ নির্বাচনে কাজে লাগাতে চাইছেন। জামায়াত অনেক আগেই তাকে আনুষ্ঠানিক প্রার্থী ঘোষণা দিয়েছে। তিনি এখন মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। উখিয়া ও টেকনাফে জামায়াতের দলীয় ভিত্তি মজবুত। জামায়াতের নেতাকর্মীরা আশা করছেন, এবার এই আসন তাদের কাছ থেকে কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না।
এছাড়া এনসিপির প্রার্থী হয়েছেন তরুণ সংগঠক মোহাম্মদ হোছাইন এবং দৈনিক ইনকিলাবের কক্সবাজার অফিসের প্রধান ও এবি পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা শামসুল হক শারেকও তৎপর আছেন।