প্রায় তিন যুগ আগের কথা। জনপ্রিয় ব্যান্ড মাইলসের অন্যতম সদস্য হামিন আহমেদ তার ফেসবুকে জানালেন খালেদা জিয়াকে নিয়ে তার স্মৃতির কথা।
ফেসবুকে তিনি সদ্য প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে লিখেছেন, এর আগে কখনো বলা হয়নি, আজ শেয়ার করছি।
১৯৯৩-৯৪ সালের দিকের কথা। মাইলস একটি বিশেষ আমন্ত্রণ পেল—তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকারি বাসভবনে সঙ্গীত পরিবেশনের জন্য। সে সময় মাইলসের সদস্য ছিলেন হুমায়ুন, শাফিন, মানাম এবং সম্ভবত মাহবুব। এমন একজন প্রভাবশালী নেতার সামনে গান পরিবেশন—নিশ্চয়ই একটা অন্যরকম অনুভূতি ছিল। উত্তেজনা, কৌতূহল আর একটু ভীতি—সব মিলিয়ে এক আবেগঘন পরিবেশ।
ছায়া ঢাকা শান্ত এক দুপুরে তারা পৌঁছালেন ৬ নন্বর শহীদ মাইনুল রোডে। সঙ্গে ছিলেন ভাই শফিক। প্রথম দেখাতেই বেগম খালেদা জিয়ার সৌজন্য আর ব্যক্তিত্বে সবাই অভিভূত। অথচ তার ব্যবহার ছিল অত্যন্ত স্নেহময় আর মমতাপূর্ণ।
শব্দ পরীক্ষা চলছিল। দুপুর হয়ে গেল। জিয়া পরিবারের আত্মীয়রা ব্যান্ড সদস্যদের বাইরে খাওয়ার প্রস্তাব দিলেও খালেদা জিয়া স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, ‘না, তারা এখানেই খাবে, যা আছে তা দিয়েই।’ সেদিন সবার চোখ কপালে উঠেছিল যখন তিনি নিজ হাতে খাবার তুলে দিয়েছিলেন মাইলস সদস্যদের প্লেটে। সেই মুহূর্তে হুমায়ুন হক তার প্লেটের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলেন—এ কি সত্যি? সেই দৃশ্য এখনো তার চোখে ভাসে, হৃদয়ে বাজে শ্রদ্ধার সুরে।
সেদিন সন্ধ্যায় তারা গান পরিবেশন করেছিলেন বাগানে তৈরি এক অনুষ্ঠানে। বেগম খালেদা জিয়া পর্দা ঘেরা স্থানে বসে গান শুনেছিলেন। পরবর্তীতে তাদের গানের প্রশংসাও করেছিলেন। সেই দিনের অভিজ্ঞতা চিরকাল জেগে থেকেছে হুমায়ুন ও শাফিনের মনে—একটা স্মৃতি, যা তাদের মায়ের কাছ থেকেও শ্রদ্ধার জায়গা পেয়েছিল।
বহু বছর পর, ২০১৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর যখন বাংলা সংগীতের কিংবদন্তি ফিরোজা বেগম চলে গেলেন চিরবিদায় নিয়ে, রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়নি। সরকারি কিছু মন্ত্রী শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানালেও বাসায় এসে শ্রদ্ধা জানালেন না প্রায় কেউই। অথচ এক ব্যক্তি এসেছিলেন—নিজের অসুস্থতা, বয়স আর কষ্ট উপেক্ষা করে। তিনি বেগম খালেদা জিয়া। তিনি ফিরোজা বেগমের কলিন্দির বাসায় এসেছিলেন, পরিবারের পাশে বসেছিলেন, মাথায় হাত রেখে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন।
সেদিন তিনি ছিলেন একজন মা, একজন মানুষ, একজন সত্যিকারের শ্রদ্ধার জায়গা তৈরি করে যাওয়া নেতা।
হুমায়ুন হক বলেন, ‘আজও মনে পড়ে—তিনি যা করেছেন তা কেউ প্রত্যাশাও করেনি। কিন্তু তিনি করেছেন। এজন্যই তিনি বেগম খালেদা জিয়া—মানুষের হৃদয়ে একজন সম্মানিত নাম।’
কাকতালীয় হলেও সত্যি, শেষ বয়সে বেগম খালেদা জিয়ার থাকার বাসার নাম ছিল ‘ফিরোজা’—যা এক আবেগঘন মিলন হয়ে রইল দুই শ্রদ্ধেয় নারীর মধ্যে।
‘রব্বির হামহুমা কামা রাব্বাইয়ানি সগিরা’
আল্লাহ যেন তাকে জান্নাত নসিব করেন।