Image description

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বিএনপি চেয়ারপারসনের পদটি এখন ‘শূন্য’। অন্যদিকে, প্রতিকূল প্রেক্ষাপটে গত দীর্ঘ এক দশকেও দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সম্মেলন (কাউন্সিল) করতে পারেনি বিএনপি। আর এই দশ বছরে শুধু দলের চেয়ারপারসনই নন, না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন অনেক কেন্দ্রীয় নেতাও। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শুধু মাঝেমধ্যে গুটিকয় নেতার হয়েছে পদোন্নতি। কিন্তু বেশকিছু পদ এখনো শূন্য। ফলে খালেদা জিয়ার সাম্প্রতিক প্রয়াণে বিএনপির কাউন্সিল বা জাতীয় সম্মেলন আয়োজনের ইস্যুটি নতুন করে আবারও আলোচনায় এসেছে। কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে এই মুহূর্তে পুরোপুরি মনোযোগী বিএনপি। যে কারণে আপাতত দলটির জাতীয় কাউন্সিল হচ্ছে না বলে জানতে পেরেছে কালবেলা। তবে বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রদত্ত ক্ষমতাবলে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্বয়ংক্রিয়ভাবে চেয়ারম্যানের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছেন। যদিও বিএনপির পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারাও কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তা ছাড়া তারেক রহমানের নামের উপাধিতে ‘চেয়ারম্যান’ পদটিও ব্যবহার করা হচ্ছে না।

জানা গেছে, সর্বশেষ ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। যদিও দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, তিন বছর পরপর কাউন্সিল করে জাতীয় নির্বাহী কমিটি নির্বাচন করার কথা দলটির। সে অনুযায়ী ১০ বছর আগেই মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে জাতীয় নির্বাহী কমিটি। যদিও একাধিকবার কাউন্সিল করার উদ্যোগ নিয়েছিল বিএনপি, কিন্তু ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের দমননীতির কারণে সম্মেলন করতে পারেনি। তবে এই সময়ের মধ্যে দলের অনেক নেতা মারা গেছেন, অনেকে দল ত্যাগ করেছেন, অনেকে স্বেচ্ছায় রাজনীতি থেকে অবসরে গেছেন। আবার অনেক কেন্দ্রীয় নেতা দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ক্রিয়। আবার কেউ কেউ বয়সের ভারে ন্যুব্জ। ফলে স্থায়ী কমিটির ৩টি, ভাইস চেয়ারম্যানের ১৬টি এবং চেয়ারপারসনের উপদেষ্টার ১০টি পদ এখনো শূন্য। সবমিলিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটির শতাধিক পদ এখনো খালি রয়েছে। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কয়েকটি পদে পদায়ন করা হয়েছে।

বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির মোট সদস্য সংখ্যা ১৯ জন। ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল শেষে ১৭ জনের নাম ঘোষণা করা হয়েছিল। চেয়ারপারসন সদ্য প্রয়াত খালেদা জিয়াও স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন। তিনি গত ৩০ ডিসেম্বর ভোরে ইন্তেকাল করেন। ফলে একসঙ্গে চেয়ারম্যান ও স্থায়ী কমিটির পদটি শূন্য। এ ছাড়া মারা গেছেন তরিকুল ইসলাম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আ স ম হান্নান শাহ, এম কে আনোয়ার ও ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। ২০১৮ সাল থেকেই গুরুতর অসুস্থ ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া। সেই থেকেই তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রয়েছেন। এ ছাড়া রাজনীতি থেকে অবসর নিয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান। যদিও তার পদত্যাগপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান কোনোটিই করেনি বিএনপি। ২০২৪ সালের ১৬ আগস্ট স্থায়ী কমিটির শূন্য পদে দুজন ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম ও অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেনকে পদায়ন করা হয়। বর্তমানে স্থায়ী কমিটির চারটি পদ শূন্য।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, ‘চাইলেই তো একটি বড় রাজনৈতিক দলের কাউন্সিল করা যায় না। এজন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও পরিবেশ দরকার। আমরা চেষ্টা করছি চেয়ারপারসনের মৃত্যুতে শোক কাটিয়ে এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষে একটি উপযুক্ত সময়ে জাতীয় কাউন্সিল করার।’

গঠনতন্ত্রবলে তারেক রহমানই বিএনপির ‘চেয়ারম্যান’: আপসহীন নেত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর একদিকে শোকে স্তব্ধ বিএনপি, অন্যদিকে দলের চেয়ারপারসনের পদটি শূন্য। তবে নতুন বছর ও সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে ধীরে ধীরে শোক কাটিয়ে উঠছেন দলটির নেতাকর্মীরা। পাশাপাশি দলের চেয়ারম্যান পদে এবার পূর্ণাঙ্গরূপে অধিষ্ঠিত হতে তারেক রহমানকে পরামর্শও দিয়েছেন দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যরা। তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠরা জানান, এখনো ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবেই কাজ করতে আগ্রহী তারেক রহমান। চেয়ারম্যান হিসেবে পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব তিনি সরাসরি তৃণমূলের মতামতের পর গ্রহণ করতে চান। যদিও বর্তমানে খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গঠনতন্ত্রের ৭ (গ) ধারায় দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের কর্তব্য, ক্ষমতা ও দায়িত্বের উপধারা ৩ অনুযায়ী তিনিই ‘চেয়ারম্যান’ হয়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, আগামী সপ্তাহে বিএনপির স্থায়ী কমিটির নিয়মিত বৈঠকে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পরিবেশ ও অন্যান্য কার্যক্রমের পাশাপাশি সাংগঠনিক বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় উঠবে। এরপর বিএনপির তরফে দলের চেয়ারম্যান বিষয়ে কোনো ঘোষণা আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

বিএনপির শীর্ষ নেতারা বলছেন, গঠনতন্ত্রের স্পষ্ট বিধান থাকার কারণে বিএনপির চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানের নিযুক্তির জন্য আলাদা কোনো ঘোষণা দেওয়ার দরকার নেই। যদিও দলের বিভিন্ন সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এখনো তারেক রহমানকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।

বিএনপির একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মতামতের পর তারেক রহমান তা এখনই কার্যকর না করার পরামর্শ দেন। বিশেষ করে বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু ও তার পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে আরও কিছু দিন অপেক্ষা করার জন্য মত দেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা কালবেলাকে বলেন, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তারেক রহমানই এখন দলের চেয়ারম্যান। তবে কৌশলগত কারণে তা ঘোষণা করা হচ্ছে না। খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে পুরো দেশ এখন শোকার্ত। তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক গতকাল শেষ হয়েছে। দলীয়ভাবে সাত দিনের শোক চলছে। এমন পরিস্থিতিতে স্থায়ী কমিটির আগামী সভায় এ বিষয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা আসতে পারে।

জানা যায়, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর দলের হাল ধরেছিলেন সদ্যপ্রয়াত খালেদা জিয়া। রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার আড়াই বছরের মধ্যে তিনি চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। সেই দায়িত্বের ৪১ বছর পূর্ণ হয় গত মে মাসে। এই দীর্ঘ সময়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি তিনবার বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় যায়।

বিএনপির গঠনতন্ত্রে যা বলা আছে : বিএনপির গঠনতন্ত্রের ধারা-৭ এ বলা আছে ‘প্রধান কর্মকর্তা হিসেবে দলের একজন চেয়ারম্যান থাকবেন। ৩০ বছরের কম বয়স্ক কোনো ব্যক্তি দলের চেয়ারম্যান হতে পারবেন না।’ ৭-ক ধারায় চেয়ারম্যান নির্বাচন প্রক্রিয়া বিষয়ে বলা আছে- ‘জাতীয় কাউন্সিলের সদস্যবৃন্দের সরাসরি ভোটে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে ৩ বছরের জন্য দলের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হবেন। মেয়াদ শেষে চেয়ারম্যান পদে একই ব্যক্তি পুনরায় নির্বাচিত হতে পারবেন। কাউন্সিল কর্তৃক নির্বাচিত চেয়ারম্যান দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান এবং জাতীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন বলে গণ্য হবেন। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পরবর্তী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত চেয়ারম্যান স্বপদে বহাল থাকবেন।’ ‘চেয়ারম্যান নির্বাচনের সময় একই সঙ্গে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান পদেও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ৩ (তিন) বছরের জন্য নির্বাচিত হবেন। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পরবর্তী সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান স্বপদে বহাল থাকবেন।’

এ ছাড়া ৭-খ ধারায় চেয়ারম্যানের কর্তব্য, ক্ষমতা ও দায়িত্ব প্রসঙ্গে বলা আছে যে, ১. দলের প্রধান কর্মকর্তা হিসেবে চেয়ারম্যান দলের সর্বময় কার্যাবলি নিয়ন্ত্রণ, তদারক ও সমন্বয় সাধন করবেন এবং তদুদ্দেশে জাতীয় কাউন্সিল, জাতীয় স্থায়ী কমিটি, জাতীয় নির্বাহী কমিটি, বিষয় কমিটিগুলো এবং চেয়ারম্যান কর্তৃক মনোনীত অন্যান্য কমিটিগুলোর ওপর কর্তৃত্ব করবেন এবং তাদের কার্যাবলির নিয়ন্ত্রণ, তদারক ও সমন্বয় সাধন করবেন। ২. উপরোক্ত কমিটিগুলোর সদস্যদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও চেয়ারম্যান প্রয়োজনবোধে নিতে পারবেন। ৩. জাতীয় নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে উক্ত কমিটির কর্মকর্তাদের দায়-দায়িত্ব, ক্ষমতা ও কর্তব্য নিরূপণ করবেন। ৪. চেয়ারম্যান প্রয়োজন মনে করলে জাতীয় নির্বাহী কমিটি, জাতীয় স্থায়ী কমিটি, বিষয়ভিত্তিক উপকমিটিগুলো এবং চেয়ারম্যান কর্তৃক মনোনীত অন্যান্য কমিটিগুলো বাতিল করে দিতে এবং পরবর্তী কাউন্সিলের অনুমোদন সাপেক্ষে পুনর্গঠন করতে পারবেন। ৫. চেয়ারম্যান জাতীয় কাউন্সিল, জাতীয় নির্বাহী কমিটি এবং জাতীয় স্থায়ী কমিটির সভাগুলোর সভাপতিত্ব করবেন, তবে এ ক্ষমতা প্রয়োজনবোধে তিনি অন্য সদস্যদের ওপর অর্পণ করতে পারবেন। ৬. চেয়ারম্যান জাতীয় স্থায়ী কমিটি এবং জাতীয় নির্বাহী কমিটি এবং বিষয়ভিত্তিক উপকমিটিগুলোর শূন্যপদ পূরণ করতে পারবেন।

২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পান। বিএনপির গঠনতন্ত্রের ৭(গ) ধারায় দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের কর্তব্য, ক্ষমতা ও দায়িত্বের উপধারা ২ অনুযায়ী ‘চেয়ারম্যানের সাময়িক অনুপস্থিতিতে তিনিই দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে চেয়ারম্যানের সমুদয় দায়িত্ব পালন করবেন।’ এই ধারার নিয়মে তারেক রহমান ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন। সেই থেকে তিনি এ দায়িত্ব পালন করছেন।

এখন খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গঠনতন্ত্রের ৭(গ) ধারায় দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের কর্তব্য, ক্ষমতা ও দায়িত্বের উপধারা ৩ অনুযায়ী ‘চেয়ারম্যান’ হয়েছেন। এই ধারায় বলা হয়েছে, ‘যে কোনো কারণে চেয়ারম্যানের পদ শূন্য হলে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান বাকি মেয়াদের জন্য চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন এবং গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পরবর্তী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি চেয়ারম্যানের দায়িত্বে বহাল থাকবেন।’

বিএনপির গঠনতন্ত্রের ৭(গ) ধারায় বলা আছে- ‘জাতীয় কাউন্সিলের মোট সদস্য সংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের দাবিকৃত জাতীয় কাউন্সিলের মোট সদস্য তিন-চতুর্থাংশের ভোট যদি চেয়ারম্যানের অপসারণের অনুকূলে হয় তাহলে চেয়ারম্যানকে অপসারণ করা যাবে। তবে জাতীয় কাউন্সিলের উক্ত দাবিতে চেয়ারম্যানের অপসারণই সভার একমাত্র বিষয়বস্তু হিসেবে দেখাতে হবে এবং অপসারণের কারণ সুস্পষ্টভাবে লিখিত থাকতে হবে।’