দল থেকে বহিষ্কারের ঘটনা স্বাভাবিক হলেও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর দিনই সেই আদেশ আসায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন রুমিন ফারহানা। একই সঙ্গে তিনি এটিকে নিজের জীবনের ‘নতুন অধ্যায়ের সূচনা ও নতুন যাত্রা’ বলেও উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেন, যেহেতু তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন, তাই বহিষ্কারের ঘটনা ঘটবে সেটি তিনি আগেই জানতেন।
মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) ভোরে খালেদা জিয়া মারা যান। পরে সকাল এগারোটায় বিএনপির স্ট্যান্ডিং কমিটির বৈঠকে রুমিন ফারহানাসহ নয়জনকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে ওই দিনই বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি জানানো হয়।
দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগে রুমিন ফারহানাসহ নয়জনকে বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব পর্যায়ের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়।
রুমিন ফারহানা বলেন, ‘বহিষ্কার আদেশ এসছে এটা স্বাভাবিক। এটাতো হবেই। তবে উনি যেদিন চলে গেলেন সেদিনই বহিষ্কার আদেশ আসাটা, এটাকে আমি বলবো যে, এটা আল্লাহর একটা ইশারাও বটে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যিনি আমাকে এনেছিলেন, যার ছায়ায় আমি ছিলাম, তিনি যেদিন চলে গেলেন, বিএনপির সাথে আমার যাত্রাও সেদিনই শেষ হলো।’
শোকের দিনে বৈঠক নিয়ে প্রশ্ন
রুমিন ফারহানার রাজনৈতিক জীবনের শুরু ২০১২ সালে, বাবা অলি আহাদ মারা যাওয়ার পর। তিনি পেশায় আইনজীবী। তার বাবা রাজনীতিবিদ হলেও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। ওই সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহালের দাবিতে বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনের মধ্যে বিএনপির আন্তর্জাতিক কমিটির সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে তিনি রাজনীতিতে পথচলা শুরু করেন।
পরবর্তী সময়ে বিএনপির পক্ষে গণমাধ্যমে সরব ভূমিকার কারণে তিনি আলোচনায় আসেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে তার প্রথম বক্তব্যেই ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। তিনি সংসদে বলেন, এই সংসদ জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয়—এ কথা বলতেই সরকারদলীয় সদস্যরা শোরগোল শুরু করেন। পরে নানা ইস্যুতে বক্তব্যের কারণে তিনি আলোচিত হন এবং একপর্যায়ে বিএনপির এমপিরা সংসদ থেকে ওয়াকআউটও করেন।
রুমিন ফারহানা বলেন, তিনি খালেদা জিয়ার ‘আহ্বানে, অভিভাবকত্বে এবং ছায়ায়’ ১৭ বছর বিএনপির সঙ্গে ছিলেন। অনেক সময় বয়স ও অভিজ্ঞতার তুলনায় বড় দায়িত্ব পেলেও খালেদা জিয়া তাকে সে সুযোগ দিয়েছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুর দিনেই বৈঠক করে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া নিয়ে তিনি বলেন, ‘সাধারণত বাঙালি সংস্কৃতি বলেন বা পশ্চিমা সংস্কৃতিই বলেন, মৃত্যুর একটা ভাবগাম্ভীর্য আছে। এরকম দিন আমরা সাধারণত কোনো রকম সিদ্ধান্তে যাই না’।
তিনি আরও বলেন, ‘খালেদা জিয়ার মৃত্যুর দিন, যেখানে রাষ্ট্রীয় শোক... সেদিন দলের স্ট্যান্ডিং কমিটির মিটিং হওয়া, বহিষ্কার আদেশ আসা... আমি জানি না, বাংলাদেশের মানুষ এটাকে কীভাবে নেবে,’।
এই বহিষ্কার আদেশকেই বিএনপির সঙ্গে তার যাত্রার শেষের ‘ক্লিয়ার ইনডিকেশন’ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
‘নতুন অধ্যায়ের সূচনা ও নতুন যাত্রা’
রুমিন ফারহানা জানান, গত ১০ বছর ধরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া–২ আসনে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিলেন দলীয় সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই। ২০১৮ সালে ওই আসনে বিএনপি থেকে নির্বাচন করেছিলেন উকিল আব্দুস সাত্তার। পরে ২০২৩ সালে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন। সে সময় ওই আসনে নির্বাচন করার নির্দেশ দলীয় হাইকমান্ডই দিয়েছিল বলে দাবি করেন রুমিন ফারহানা।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ওই আসনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট থেকে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নেতা জুনায়েদ আল হাবিবকে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেন।
তিনি বলেন, ‘আমি গত ১০ বছর ধরেই কাজ করছিলাম। এখন হঠাৎ করে জুনায়েদ আল হাবিব জোটের প্রার্থী আসাটা আমার জন্য একটু বিস্ময়কর ছিলো’।
বহিষ্কৃত নয়জনই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিয়েছিলেন।
বিএনপিতে দলীয় রাজনীতির সমাপ্তি হলেও তিনি এটিকে জীবনের নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘রাজনীতিতে এমপি বা মন্ত্রী হওয়া এগুলো একেকটা ঘটনা। কিন্তু রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠা অনেক বড় একটা ব্যাপার। আমি একজন রাজনীতিবিদ হতে চাইছি’।
তিনি জানান, এলাকার মানুষের চাওয়ার প্রেক্ষিতেই তিনি একা লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।