Image description

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি। কয়েকবার দিন বদলের পর অবশেষে ২৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে সমাবেশ ডেকে আত্মপ্রকাশ করল তরুণদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। প্রতিশ্রুতি হিসেবে মানুষের সামনে থাকল- নতুন বন্দোবস্ত। কিন্তু ২০ মাস পেরোতে না পেরোতেই দলটির শীর্ষ পর্যায়ের অনেকে ঘোষণা দিয়ে দল ছাড়তে শুরু করেন। সর্বশেষ আজ বৃহস্পতিবার নিজের ফেসবুক আইডিতে দেওয়া পোস্টে এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেন দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন। এ প্রতিটি ঘটনায় বারবার সামনে এসেছে জামায়াত প্রশ্ন।

আগের বিচ্ছিন্ন বিভিন্ন ঘটনা একপাশে সরিয়ে রাখলে নড়েচড়ে বসার মতো ঘটনার শুরুটা গত বছরের ডিসেম্বরে। ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে জোট গঠন নিয়ে তখন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নানা সমীকরণ আর হিসাব-নিকাশ চলছিল। একটি সফল গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের নিয়ে গঠিত নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম হঠাৎই ঘোষণা দেন জামায়াত ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেওয়ার। এতে দলের কারও কারও মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়।

দল গঠনের পর প্রথম জাতীয় নির্বাচনকে সারাদেশে সাংগঠনিক ভিত্তি জোরদারের একটি সুযোগ হিসেবে দেখছিলেন এনসিপির শীর্ষ নেতাদের কেউ কেউ। কিন্তু শেষপর্যন্ত জামায়াত জোটে থাকতে নাহিদ ইসলাম, হাসনাত আব্দুল্লাহ, সারজিস আলমসহ প্রভাবশালী নেতারা অনড় থাকেন। এ অবস্থায় এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেন কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব ও নির্বাহী কাউন্সিলের সদস্য মীর আরশাদুল হক, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচি ডা. তাসনিম জারা, যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ (জারার স্বামী), যুগ্ম আহ্বায়ক তাজনূভা জাবীন এবং কৃষক উইংয়ের প্রধান সমন্বয়ক ও মওলানা ভাসানীর নাতি আজাদ খান ভাসানী।

পদত্যাগকারীদের বক্তব্যে কয়েকটি বিষয় ঘুরেফিরে আসে। এগেুলোর মধ্যে ছিল- জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা থেকে সরে যাওয়া, পুরনো রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে আপস, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অস্বচ্ছতা এবং এনসিপির নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় হারানোর আশঙ্কা।

বিশেষ করে তাসনিম জারা ও তাজনূভা জাবীনের পদত্যাগ রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ আলোচনার জন্ম দেয়। কারণ, তারা দুজনই আসন্ন নির্বাচনে এনসিপির মনোনীত প্রার্থী ছিলেন।

কিন্তু তখন দলের অবস্থানের পক্ষে ছিলেন সামান্তা শারমিন। সামান্তা তখন জামায়াতের সঙ্গে জোটের সমালোচনা করলেও দল ছাড়েননি। বরং দলের ভেতরে থেকেই নিজের অবস্থান তুলে ধরেছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, “দল হিসেবে এনসিপি তার মূল অবস্থান থেকে বিচ্যুত হয়নি, কিছু ব্যক্তি বিচ্যুত হয়েছেন।” পরে জোট নিয়ে তার আপত্তির কথা গণমাধ্যমেও উঠে আসে।

 

সবশেষ, ২০২৬ সালের ২৩ অক্টোবর এনসিপির পুনর্গঠিত কমিটিতে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক থেকে যুগ্ম আহ্বায়ক পদে নামিয়ে আনা হয় শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে শুরু থেকে রাজপথে থাকা এই নেতাকে।

অবশেষে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপির জোট নিয়ে নিজের অসন্তুষ্টির কারণেই ৫ নভেম্বর ২০২৬ দল থেকে পদত্যাগ করেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন ।

ফেসবুক পোস্টে দেওয়া পদত্যাগের ব্যাখ্যায় সামান্তা বলেন, প্রায় এক বছর আগে জোট গঠনের প্রশ্নে তিনি ভিন্ন অবস্থান নিয়েছিলেন। তার বক্তব্য ছিল, “জামায়াতে ইসলামী নীতিগত কিংবা কৌশলগত কোনো ক্ষেত্রেই এনসিপির মিত্র হওয়ার উপযুক্ত নয় এবং তাদের সঙ্গে জোট করলে দলকে কঠিন রাজনৈতিক মূল্য দিতে হবে।”

অধ্যাপক মো. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে এক বর্ণাঢ্য আয়োজনের মাধ্যমে রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। নতুন এই দলকে ঘিরে সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকলেও একে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সুদিনের একটি প্রত্যাশা তৈরি হয়।

কিন্তু মাত্র ১ বছর ৮ মাস সময়ে গণআন্দোলনে রাজপথে থাকা অনেকেই দলটি থেকে পদত্যাগ করলেন। বিশ্লেষণে দেখা যায় দলটির প্রতি গভীর ভালোবাসা ও আনুগত্য থাকলেও একাত্তরে বিতর্কিত ভূমিকার জন্য সমালোচিত ও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের সাথে সখ্যের কারণেই এনসিপি ত্যাগ করছেন অনেক পরিচিত ও সম্ভাবনাময় মুখ।

জাতীয় নির্বাচনের আগেই বছরের শুরুর দিন জামায়াত-ঘনিষ্ঠতা মেনে নিতে না পেরে এনসিপি ত্যাগ করেছিলেন কেন্দ্রীয় পর্যায়ের সাত নেতা–মুশফিক উস সালেহীন, খান মুহাম্মদ মুরসালীন, ফারহাদ আলম ভূঁইয়া, আল আমিন আহমেদ টুটুল, আসিফ নেহাল, মীর হাবিব আল মানজুর ও মারজুক আহমেদ।

আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে পৃথকভাবে জমা দেওয়া পদত্যাগপত্রে মোটা দাগে এদের সবারই আপত্তির জায়গা একই ছিল। মুশফিকের ভাষ্য ছিল, “জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার ফলে এনসিপি নতুন বন্দোবস্তের রাজনীতি থেকে সরে পুরনো ধারার রাজনীতিতেই ঢুকে পড়েছে।”

জামায়াতের সঙ্গে জোটের সিদ্ধান্তের বিষয়ে আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম গণমাধ্যমে সে সময় বলেছিলেন, নির্বাহী পর্যায়ের আলোচনা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দলের ভেতরে ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক বলেও তিনি উল্লেখ করেছিলেন।

এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াও তখন জানিয়েছিলেন, নির্বাচনী জোটের সিদ্ধান্তের কারণে কয়েকজন দল ছেড়েছেন। তবে দলের দরজা তাদের জন্য খোলা রয়েছে বলেও জানিয়েছিলেন দলের মুখপাত্র।

কিন্তু যারা দল ছেড়েছেন তাদের কেউ আর এনসিপিতে ফিরে যাননি। বরং নির্বাচনের পরপর গত ৫ মার্চ উজ্জ্বল চাকমা, দিবাকর চাকমা, মিশন চাকমা, ঊষাপ্রু মারমা, প্রণয় বিকাশ চাকমা, বিনয় চাকমা ও সুলেখা চাকমাসহ রাঙামাটি জেলা কমিটির সাত নেতা পদত্যাগ করেন। পদত্যাগপত্রে তারা লেখেন, জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা থেকে সরে এনসিপি স্বতন্ত্র আদর্শ বিসর্জন দিয়ে একটি বৃহৎ দলের সঙ্গে জোট করেছে। এরপর জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের লোকদের কমিটিতে ঢোকানোর অভিযোগ তুলে ২০ মার্চ এনসিপি ছাড়েন রংপুর জেলা যুগ্ম সদস্যসচিব শেখ রেজওয়ান।

গত মাসে (অক্টোবর) জামায়াতের সঙ্গে আদর্শিক মতপার্থক্যের কারণে এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেন দক্ষিণাঞ্চলের কেন্দ্রীয় সংগঠক মো. আব্দুর রহমান।

আলোচিত নেতা সামান্তা শারমিনের পদত্যাগের বিষয়ে এনসিপির আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এই প্রতিবেদন তৈরির সময় পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এনসিপির জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দলের রাজনৈতিক পরিচয় নির্ধারণ ও সাংগঠনিক ঐক্য পুনর্গঠন করা। প্রতিষ্ঠার সময় যে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার সঙ্গে নির্বাচনী জোট, পুরনো রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক এবং বাস্তব ক্ষমতার রাজনীতির সমন্বয় কীভাবে হবে, সেটি দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

সামান্তাসহ দলের পরিচিত মুখগুলোর একে একে এনসিপি ত্যাগের ঘটনায় স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় হারিয়ে এনসিপির প্রতিষ্ঠাকালীন সমর্থকদের মধ্যে হতাশা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে দলের প্রতিষ্ঠাকালীন নেতৃত্বের একটি অংশ যদি মনে করে, দলের ভেতরে থেকে নীতিগত পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হতে পারে।

তবে ধারাবাহিক পদত্যাগ এবং গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ার ঘটনাকে নিছক স্বাভাবিক সাংগঠনিক পরিবর্তন বলে উপেক্ষারও সুযোগ নেই।

সব মিলিয়ে এনসিপির সংকট এখন নেতৃত্বের সংকটের চেয়ে বেশি রাজনৈতিক পরিচয়ের সংকট। দলটি কি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে ভিত্তি করে স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে গড়ে উঠবে, নাকি নির্বাচনী বাস্তবতায় পুরনো রাজনৈতিক সমীকরণের অংশ হয়ে উঠবে- এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে দলটির ভবিষ্যৎ।

সামান্তা শারমিনের পদত্যাগ সেই প্রশ্নকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।