Image description

রাজধানীর গুলিস্তানে পতিত স্বৈরাচারের অন্যতম সহযোগী জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদের (ইনু) প্রধান কার্যালয় থেকে গোপন বৈঠক চলাকালীন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী সন্দেহে ২৬০ জনের বেশি নেতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান শুনতে পেয়ে আশপাশের ব্যবসায়ী ও হকাররা কার্যালয়টি ঘেরাও করেন। খবর পেয়ে পুলিশ প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা অভিযান চালিয়ে সেখান থেকে তাদের আটক করে। এরপর তাদের পল্টন ও শাহবাগ থানায় নেওয়া হয়।

এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিএনপির অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী ও বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা সেখানে জড়ো হন। তারা ভবনটি ঘিরে রাখেন এবং ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নানা স্লোগান দিতে থাকেন। একপর্যায়ে লোকজনের ভিড়ের কারণে এক পাশের সড়ক বন্ধ করে দেয় পুলিশ।

ঘটনাস্থল থেকে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের সাবেক সভাপতি আবু জাফর সূর্যও আটক হন। জাসদের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে জানা গেছে। পুলিশ যখন তাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়, তখন সাংবাদিকরা তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেনÑকেন তিনি এমন সভায় এসেছেন। এর কোনো যৌক্তিক উত্তর দিতে পারেননি তিনি। তবে আটক অবস্থায় ফেসবুকে দেওয়া স্ট্যাটাসে সূর্য দাবি করেন, তিনি সেখানে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়েছিলেন।

প্রত্যক্ষদর্শী, পুলিশ ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সকাল ১০টা থেকে শহীদ আবরার ফাহাদ অ্যাভিনিউর ৩৫ নম্বর ভবনের (হোটেল গ্যানিস ইন্টারন্যাশনাল) দ্বিতীয় তলায় কর্নেল তাহের মিলনায়তনে জাসদের কার্যালয়ে বিভিন্ন সারির নেতাকর্মীরা আসতে শুরু করেন। তারা কেউ একসঙ্গে সেখানে যাননি। তারা দুই-তিনজন করে সেখানে জড়ো হন। তাদের কেউ কেউ পাশের বিভিন্ন হোটেলে খাবারও খান। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ওই কার্যালয়ে সভা শুরু হয়।

সেখান থেকে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান শুনতে পান স্থানীয় হকার ও ব্যবসায়ীরা। পরে তারা ওই ভবনের দ্বিতীয় তলায় গেলে ভেতর থেকে দরজা লাগানো হয়। বারবার নক করা হলেও তারা দরজা খোলেননি। একপর্যায়ে তারা দরজা খুললে চার শতাধিক মানুষকে সেখানে দেখে সবাই চমকে যান। এ সময় হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। এর মধ্যে তাদের কেউ কেউ সিঁড়ি দিয়ে নেমে চলে যান। পরে বিক্ষুব্ধ লোকজন বাইরে থেকে কলাপসিবল গেট বন্ধ করে পুলিশকে খবর দেন।

পরে পুলিশ পুরো ভবন ঘেরাও করে প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করে পাঁচটি প্রিজনভ্যানে থানায় নিয়ে যায়। আটকদের রাখার জন্য পল্টন থানায় জায়গা সংকুলান না হওয়ায় বেশ কয়েকজনকে শাহবাগ থানায় নিয়ে রাখা হয়।

 

সরেজমিন যা দেখা গেল

গতকাল বেলা সাড়ে ৩টার দিকে সরেজিমন ওই এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ডানপাশের পুরো সড়ক বন্ধ করে ভেতরে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। গাড়িগুলোকে বিকল্প পথে ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সামনে লোকজনের জটলা। অভিযানের সময় বিএনপি নেতাকর্মীদের সেখানে স্লোগান দিতে দেখা যায়। জাসদ অফিসের পাশেই রয়েছে বন্ধ থাকা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কার্যালয়। এমন একটি সংবেদনশীল স্থানে গোপন বৈঠকে আশ্চর্য স্থানীয় ব্যবসায়ী, হকার ও বিএনপি নেতাকর্মীরা। এ ঘটনায় কারো ইন্ধন আছে কি না, তা খতিয়ে দেখার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

সবুজ নামে এক কাপড় ব্যবসায়ী জানান, এই কার্যালয়ে দীর্ঘদিন তাদের আনাগোনা ছিল। প্রথমে যখন হকার ও ব্যবসায়ীরা ওই ভবনের দ্বিতীয় তলায় যান, তখন অনেকেই সেখান থেকে সটকে পড়েন।

শাহবাগ থানা বিএনপির কর্মী শরিফ জানান, জাসদ অফিসের ওই মিলনায়তনে পাঁচ শতাধিক লোক ছিলেন। তারা সুযোগ বুঝে সেখান থেকে চলে যান। তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

পুলিশ জানিয়েছে, ওই বৈঠকে নাশকতার কোনো পরিকল্পনা করা হচ্ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

পল্টন থানায় সরেজমিনে গিয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আটকদের পরিচয় যাচাই-বাছাই এবং ট্র্যাক রেকর্ড খুঁজে বের করার জন্য দেশের বিভিন্ন থানায় বার্তা পাঠানো হয়েছে। থানাগুলো থেকে তথ্য পাওয়ার পর যাচাই-বাছাই শেষে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঘটনাস্থল থেকে কয়েকটি মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়েছে।

আটকদের পল্টন থানার বিভিন্ন রুমে রাখা হয়েছে। অনেকের কাছে মোবাইল ফোন রয়েছে। নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলছেন। থানার লকআপে স্বল্পসংখ্যক মানুষ রাখা যায় বলে আপাতত এভাবে রাখা হয়েছে বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তারা।

জাসদ কার্যালয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জড়ো হয়েছেন অভিযোগ করে যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম নয়ন এবং পল্টন থানা যুবদলের নেতাকর্মীরা কার্যালয়টি ঘিরে রাখেন। নয়নের নেতৃত্বে সেখানে একাধিক মিছিল বের করে যুবদলসহ বিএনপির একাধিক অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

নয়ন সাংবাদিকদের জানান, পলাতক ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা বিদেশে বসে নানা হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। এই গোপন বৈঠকে কোনো ষড়যন্ত্র করা হছিল কি না তা পুলিশকে খতিয়ে দেখতে হবে। তিনি আরো জানান, আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী লীগের ‘দোসররা’ যাতে ঢাকার কোথাও মিছিল-মিটিং করতে না পারে; সে বিষয়ে ঢাকা মহানগর যুবদলের প্রতিটি ইউনিটকে নির্দেশনা দেওয়া আছে।

শাহবাগ থানা যুবদলের সদস্য সচিব মোয়াজ্জেম হোসেন তপন জানান, কুষ্টিয়া, যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে লোক নিয়ে এসে তারা গোপন বৈঠক করছিল। দেশে জ্বালাও-পোড়াও করার জন্য তারা ওই বৈঠক করছিল।

অভিযানের সময় অনেকের স্বজন জাসদ কার্যালয়ের সামনে ভিড় করেন। স্নিগ্ধা নামের এক তরুণী নিজেকে এনসিপির গুলশান থানার নেত্রী বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, আমার বাবার নাম রুহুল আমিন। আমাদের গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধা। বাবা গ্রামের বাড়িতে থাকেন। শনিবার ঢাকায় এসেছেন। আগে জাসদ করতেন, এখন করেন না। তিনি এখানে আটক হয়েছেন বলে ফোনে আমাদের জানিয়েছেন। এজন্য এসেছি। কিন্তু পুলিশ কোনো তথ্য দেয়নি। পরে তিনি পল্টন থানায় যান।

ডিএমপির গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের ডিসি মো. আকতার হোসেন জানান, জাসদ কার্যালয়ের ভেতরে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া হয়েছে। সেখানে বৈঠক চলছে এমন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়। পল্টন থানার ওসি আরিফুর ইসলাম জানান, আটকদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

এদিকে জাসদের দপ্তর সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেছেন, শনিবার সকালে জাসদের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সভা ছিল। সারা দেশ থেকে প্রায় ৪০০ নেতাকর্মী প্রতিনিধি সভায় যোগ দেন। সকাল সাড়ে ১০টায় তাদের অনুষ্ঠান শুরু হয়। প্রথমে বিএনপির নেতাকর্মীরা এসে তাদের নেতাকর্মীদের মারধর করেন। সেখানে পুলিশ সদস্যরা ছিলেন। পরে বিকালে পুলিশ এসে নেতাকর্মীদের আটক করতে শুরু করে। তাদের কোনো নেতাকর্মী বের হতে পারেননি। পর্যায়ক্রমে সবাইকে আটক করে নিয়ে গেছে পুলিশ।

জাসদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রতিনিধি সভায় মাইক ব্যবহার ও নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য পুলিশের কাছে আবেদন করা হয়েছিল। ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার ও ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের ডিসির কাছে গত ২৩ ও ২৪ সেপ্টেম্বর আবেদন করেছিলেন তারা। এমন একটি চিঠিও রয়েছে বলে তারা দাবি করেন। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে ওই অনুমতির বিষয়ে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

গত ৩০ জুন বিগত আওয়ামী লীগ স্বৈরাচারের অন্যতম দোসর হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ১০ বছরের সাজার রায় ঘোষণা করে ট্রাইব্যুনাল। এ মামলায় ইনুর বিরুদ্ধে আটটি অভিযোগ আনা হয়েছিল। এর মধ্যে তিনটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়। তিনটি অভিযোগেই তাকে ১০ বছর করে সাজা দেওয়া হয়।