Image description

দীর্ঘদিন পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। তবে দলীয় প্রতীক ও মনোনয়ন না থাকায় একই পদে একাধিক নেতার প্রার্থী হওয়ার সুযোগ থাকছে। এ বাস্তবতায় ভোটের মাঠে দলীয় বিভক্তি এড়াতে স্থানীয় পর্যায়ে একজন করে সমর্থিত প্রার্থী রাখার উদ্যোগ নিয়েছে দলটি।

তৃণমূলের মতামত, স্থানীয় পর্যায়ের সমন্বয় এবং সম্ভাব্য প্রার্থীদের গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনায় নিয়ে শেষ পর্যন্ত একজনকে সমর্থন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপির। দলটির সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত ও নীতিনির্ধারকদের বক্তব্যে এমন অবস্থানের কথা উঠে এসেছে।

গত জুলাইয়ে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে সাংগঠনিক তৎপরতা জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হয়। দলীয় ইউনিটগুলোকে প্রস্তুতি জোরদারের আহ্বান জানানো হয়।

তৃণমূলের মতামত, সিদ্ধান্ত কেন্দ্রে

বিএনপির পরিকল্পনায় স্থানীয় পর্যায়ের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও চূড়ান্তভাবে কাকে দল সমর্থন করবে, সেই সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের হাতেই থাকবে।

অর্থাৎ ইউনিয়ন, উপজেলা, পৌরসভা কিংবা সিটি করপোরেশন পর্যায়ে সম্ভাব্য প্রার্থীদের গ্রহণযোগ্যতা, সাংগঠনিক অবস্থান ও স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সমন্বয়ের চেষ্টা করা হবে। এরপর একজনকে দলসমর্থিত প্রার্থী হিসেবে সামনে রাখার উদ্যোগ থাকবে।

 

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হলে বিএনপি একক প্রার্থী নির্ধারণ করবে।’

দলের এই নীতির বাস্তব চিত্রও বিভিন্ন এলাকায় দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় নির্বাচনের বাইরে থাকার পর বিএনপির বহু নেতা এবার স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী হতে আগ্রহী। ফলে একই ইউনিয়ন, উপজেলা বা সিটি এলাকায় একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী সক্রিয় রয়েছেন।

বরিশাল সদরে ৪-৫ জন করে প্রার্থী

বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং বরিশাল সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী আবু নাসের মুহাম্মদ রহমাতুল্লাহ জাগো নিউজকে বলেন, দীর্ঘদিন নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার কারণে বরিশাল সদর উপজেলার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নে চার-পাঁচজন করে প্রার্থী রয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘দলকে এক্ষেত্রে কঠোর হয়ে একজন প্রার্থী নির্ধারণ করতে হবে। বরিশাল বিএনপির ঘাঁটি। এখানে একক প্রার্থী না হলে ভোটাররা বিভ্রান্ত হবে।’

প্রতীক নেই, তবু দলীয় সমর্থন থাকবে

এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে—দলীয় প্রতীক থাকছে না। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান, সাধারণ সদস্য ও সংরক্ষিত নারী সদস্য পদে আলাদা প্রতীক থাকবে। নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে তিন পদের জন্য মোট ৪২টি প্রতীক চূড়ান্ত করেছে। চেয়ারম্যান পদে ২০টি, সাধারণ সদস্য পদে ১২টি এবং সংরক্ষিত নারী সদস্য পদে ১০টি।

আইনগতভাবে দলীয় প্রতীক না থাকলেও স্থানীয়ভাবে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থী রাখার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।

গত ১০ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক থাকবে না, তবে স্থানীয়ভাবে বিএনপি-সমর্থিত নির্দিষ্ট প্রার্থী থাকবে। উপজেলা বিএনপি সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নে একজন সমর্থিত প্রার্থী ঠিক করে দিতে পারে বলেও জানান তিনি।

এর আগে ২০ আগস্ট বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানিয়েছিলেন, আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে অংশ নেবে।

কেন একক প্রার্থীর ওপর জোর

বিএনপির স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে দলটির সামনে কয়েকটি বাস্তব সমস্যার চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় নির্বাচনের বাইরে থাকায় পুরোনো নেতাদের পাশাপাশি নতুন করে সক্রিয় হওয়া নেতারাও প্রার্থী হতে চাইছেন। কোথাও একই পদে একাধিক নেতা মাঠে রয়েছেন, আবার কোথাও একাধিক পক্ষ নিজেদের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে প্রচার চালাচ্ছে।

এ অবস্থায় দলীয়ভাবে একজনকে সমর্থন না দিলে একই দলের একাধিক প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। এতে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি হওয়ার পাশাপাশি ভোটের মাঠেও দলীয় সমর্থন ভাগ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে—এমনটাই মনে করছেন স্থানীয় নেতারা।

তবে বিএনপির জন্য চ্যালেঞ্জ শুধু প্রার্থী বাছাইয়ে সীমাবদ্ধ নয়। একজনকে সমর্থন দেওয়ার পর অন্য আগ্রহী নেতাদের দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করানোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

গত ১১ জুলাই বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে উপস্থিত নেতারা, ফাইল ছবি
 
গত ১১ জুলাই বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে উপস্থিত নেতারা, ফাইল ছবি

 

স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে সংগঠন গোছানোর উদ্যোগ

গত ১১ জুলাই বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে দলীয় ইউনিটগুলোর সাংগঠনিক তৎপরতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি মেয়াদোত্তীর্ণ সাংগঠনিক কমিটি পুনর্গঠন ও তৃণমূলকে সক্রিয় করার বিষয়েও আলোচনা হয়।

এর ফলে স্থানীয় নির্বাচনকে শুধু ভোটের প্রস্তুতি হিসেবে নয়, সাংগঠনিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে বিএনপি—এমন চিত্র পাওয়া যাচ্ছে।

কখন চূড়ান্ত হবে প্রার্থী

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হলে একক প্রার্থী নির্ধারণ করা হবে। ফলে এখন সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা থাকলেও আনুষ্ঠানিক নির্বাচনি প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর দলীয়ভাবে প্রার্থী বাছাইয়ের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।

এদিকে নির্বাচন কমিশনও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে। ২৪ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার জানিয়েছেন, নভেম্বর-ডিসেম্বরে বার্ষিক ও পাবলিক পরীক্ষা থাকায় ওই সময়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু না করে আগামী বছরের জানুয়ারিতে নির্বাচন শুরু করার আশা করছে কমিশন।

অর্থাৎ নির্বাচন কমিশনের সময়সূচি চূড়ান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিএনপির প্রার্থী সমন্বয়ের প্রক্রিয়াও আরও দৃশ্যমান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তৃণমূলের মতামত থেকে কেন্দ্রের অনুমোদন

সব মিলিয়ে বিএনপির স্থানীয় নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রার্থী বাছাইয়ের কাঠামো দাঁড়াচ্ছে—প্রথমে সম্ভাব্য প্রার্থীদের সক্রিয়তা ও স্থানীয় অবস্থান চিহ্নিত করা, এরপর তৃণমূলের মতামত ও স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনা করা, সংশ্লিষ্ট সাংগঠনিক ইউনিটের সঙ্গে সমন্বয় এবং শেষ পর্যন্ত একজনকে দলসমর্থিত প্রার্থী হিসেবে সামনে রাখা।

অর্থাৎ প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ থাকবে অনেকের, কিন্তু নির্বাচনের মাঠে দলীয় সমর্থনের ক্ষেত্রে একজনকেই সামনে রাখার চেষ্টা করবে বিএনপি। বরিশাল সদর উপজেলার মতো যেখানে একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী সক্রিয়, সেখানে এই সমন্বয় প্রক্রিয়াই হবে বড় পরীক্ষা।

দলীয় প্রতীক না থাকলেও স্থানীয় নির্বাচনে বিএনপি সাংগঠনিকভাবে একক সমর্থিত প্রার্থী রাখার উদ্যোগ নিয়েছে—সাম্প্রতিক বক্তব্য ও সিদ্ধান্তে এ বিষয়টি স্পষ্ট। তবে তৃণমূলের মতামত কীভাবে নেওয়া হবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় চূড়ান্ত প্রার্থী নির্ধারণ করা হবে, তা নির্বাচনি প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর আরও স্পষ্ট হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।