Image description

বিএনপিপন্থী অ্যাক্টিভিস্ট রেজাউল করীম রনি ৩০ আগস্ট এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, "কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুনাফা বেড়ে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা" এটা আজকের প্র. আলুর খবর। এটা বিগত বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। গত বছরের প্রায় দ্বিগুন। লাভের এই পুরো টাকা সরকারকে দেয়া হয়।

 

আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে মো. মোস্তাকুর রহমানের নাম ঘোষণা করা হয়, সাথে সাথে তাকে নিয়ে যতরকম কু-কথা সম্ভব বলা শুরু হয়ে যায়। যতভাবে তাকে অপমান ও অপবাদ দেয়া সম্ভব সবই করা হয়েছে। তাকে শুধু একজন সোয়েটার ব্যবসায়ী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ঋণ খেলাপি বলা হয়েছে।… যারা উনাকে নিয়ে ভুয়া প্রপাগান্ডা করেছে তারা কি এই ধরণের মিথ্যা রটানোর জন্য কোন অপমান/আপরাধ বোধ করেন। সরি ফিল করেন। জানি- করেন না। কারণ- এরা প্রতিটি বিষয়ে এই ভাবেই রাজনীতি করতে চায়। এই ভাবেই নিজেদের স্বার্থ ও লুটের সুযোগ নষ্ট হলেই প্রপাগান্ডাতে মেতে উঠে।’’

 

বিএনপিপন্থী আরেক অ্যাক্টিভিস্ট মাহবুব নাহিদ লিখেছেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে মো. মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগের পর থেকেই একটি বিশেষ মহল তাঁর বিরুদ্ধে ব্যাপক অপপ্রচার শুরু করে।… সবশেষ বাংলাদেশ ব্যাংকের মুনাফা বেড়ে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা হয়েছে, যা বিগত বছরগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ এবং গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। লাভের এই পুরো টাকাই সরকারকে দেওয়া হয়। যাঁরা নিজেদের স্বার্থ ও লুটের সুযোগ নষ্ট হওয়ায় এই ভুয়া প্রপাগান্ডা চালিয়েছিলেন, তাঁরা এই সাফল্যের পরও নিজেদের মিথ্যার জন্য লজ্জিত হবেন না। তবে চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও একের পর এক এই সাফল্য প্রমাণ করে যে তিনি একজন অত্যন্ত যোগ্য মানুষ এবং সঠিক পথেই আছেন।’’

 

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুনাফা বৃদ্ধি পাওয়ায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে দেওয়া এমন আরও কিছু পোস্ট দেখুন এখানেএখানে এবং এখানে

 

বেঙ্গল লেন্স যাচাই করে দেখেছে, গত বছরের তুলনায় এই বছরের মুনাফার হার প্রায় দ্বিগুণ হওয়ার দাবিটি বিভ্রান্তিকর। বরং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিট মুনাফা আগের বছরের তুলনায় ১৫ শতাংশ বেড়েছে।

এই মুনাফা বৃদ্ধির প্রবণতাকে বিশেষজ্ঞরা কিভাবে মূল্যায়ন করেন তা যাচাই করার চেষ্টা করেছে বেঙ্গল লেন্স।

 

ইংরেজি দৈনিক নিউ এজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “আর্থিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই রেকর্ড মুনাফার পেছনে আংশিকভাবে ব্যাংকিং খাতের সংকট দায়ী। ব্যাংকগুলো উচ্চ সুদে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিচ্ছে, সরকার অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করছে, বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত এবং বিনিময় হার ও বৈদেশিক মুদ্রার পরিস্থিতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যালেন্স শিটকে নতুন রূপ দিচ্ছে।

আর্থিক বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ ব্যাংকের আয় নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যদিও এই আয়ের উৎসগুলো ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপের বিষয়টিই প্রতিফলিত করে।

তারা বলেন, দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ এবং স্থবির পুঁজিবাজারের কারণে ব্যাংক ও অন্যান্য বিনিয়োগকারীদের সামনে আকর্ষণীয় বিনিয়োগের সুযোগ কমে গেছে। এর ফলে সরকারি সিকিউরিটিজ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুবিধার ওপর তাদের নির্ভরতা বেড়েছে।

একই সময়ে, কিছু ব্যাংকে তারল্য সংকট দেখা দেওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে রেপো এবং অন্যান্য স্বল্পমেয়াদি অর্থায়নের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের আয় বাড়িয়ে দিয়েছে। এই উচ্চ মুনাফা কিন্তু অর্থনীতি বা ব্যাংকিং খাতের স্বাস্থ্যের উন্নতির ইঙ্গিত দেয় না।

একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ক্ষেত্রে উচ্চ মুনাফা সাধারণত ভালো ব্যবসায়িক কর্মক্ষমতা প্রকাশ করে। কিন্তু একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষেত্রে, অস্বাভাবিক উচ্চ আয় অনেক সময় অর্থনীতির অন্যান্য ক্ষেত্রে আর্থিক সংকটের প্রতিফলন ঘটায়।

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ব্যাপক ঋণ গ্রহণ ব্যাংকিং খাতের মধ্যে তারল্য সংকট, দুর্বল তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং ব্যালেন্স শিটের সমস্যা নির্দেশ করতে পারে।”

 

ডেইলি স্টারের প্রতিবদনে বলা হয়েছে, ‘‘সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিট মুনাফা আগের বছরের তুলনায় ১৫ শতাংশ বেড়েছে। এই মুনাফার একটি বড় অংশ এসেছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ঋণ দেওয়া এবং বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের বিনিয়োগ থেকে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব ও বাজেট বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অর্থনীতিতে মন্দা থাকা সত্ত্বেও তাদের ঋণ কার্যক্রম শক্তিশালী ছিল।

রাজস্ব আদায় কমে যাওয়ায় সরকার এবং বাণিজ্যিক ব্যাংক উভয়ই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তাদের ঋণের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের আয় বাড়াতে সহায়তা করেছে।

এছাড়াও, বিভিন্ন দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বিনিয়োগ থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ভালো মুনাফা অর্জন করেছে, যা এর সামগ্রিক মুনাফা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।

ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, অর্থনীতি যখন ভালো চলে তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুনাফা কম হয়, আর অর্থনৈতিক মন্দার সময়ে মুনাফা বেশি হওয়ার প্রবণতা থাকে।’’

 

প্রথমআলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘‘অর্থনীতিতে মন্দাভাব বিরাজ করলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম চাঙা ছিল। রাজস্ব আয় কম হওয়ায় সরকার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বেশি টাকা ধার করেছে। আবার ব্যাংকগুলোও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আগের চেয়ে বেশি টাকা ধার করেছে। ফলে বেশি সুদ আয় হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। আবার রিজার্ভের অর্থ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ থাকায় সেখান থেকেও ভালো মুনাফা হয়েছে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুনাফা বেড়েছে।

ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, অর্থনীতি চাঙা থাকলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কম মুনাফা করে। আর অর্থনীতিতে মন্দা থাকলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেশি মুনাফা করে। এমনটাই দীর্ঘদিন ধরে হয়ে আসছে। অন্য দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোরও পরিস্থিতি একই রকম।’’

 

সাংবাদিক রাজিব আহাম্মদ এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘‘দেশের অন্যতম খ্যাতিমান তরুণ বুদ্ধিজীবী লিখেছেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের রেকর্ড ২৬ হাজার কোটি টাকা মুনাফা এক বিরাট সাফল্য। যে মোনাফেকেরা গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগের বিরোধিতা করেছিল, তাদের জন্য জবাব।’ এটা পড়ে আধাঘণ্টা তব্দা ছিলাম। কী করে বোঝাই, বাংলাদেশ ব্যাংক মুনাফার খবরটা সুখের না বরং অর্থনীতির জন্য খারাপ লক্ষণ।’’

 

এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের সঙ্গে কথা হয় বেঙ্গল লেন্সের। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই মুনাফা বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি নেতিবাচক দিকের বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, সরকার যদি ব্যাংক ঋণের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে তা মারাত্মক অর্থনৈতিক ঝুঁকি সৃষ্টি করে। কারণ, সরকার ঋণকৃত অর্থ উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় করে না। বরং তা ভর্তুকী প্রদান কিংবা সুদ পরিশোধের মতো খাতে ব্যয় হয়। আর সরকারি ঋণ বৃদ্ধি পেলে বেসরকারী খাতে ঋণ প্রদানের সক্ষমতা কমে আসে। ফলে ব্যক্তিগত বিনিয়োগ হ্রাস পায়, উৎপাদন হ্রাস পায় এবং বেকারত্ব বাড়ে।

 

অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম আরও বলেন, "বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অধিক ঋণ নেওয়ার একটি বড় কারণ হতে পারে তারল্য সংকট। আর এই সংকট তৈরি হয় মানুষ বেসরকারী ব্যাংকে টাকা জমা না রাখায়। যা সার্বিকভাবে দেশের অর্থনৈতিক সংকটকে নির্দেশ করে।"

 

"গত অর্থবছরের মতো এই অর্থবছরেও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য মূল বেতনের ৬ গুণ হারে প্রণোদনা বোনাস দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই প্রণোদনার পরিমাণটা বেশি। সরকার যেহেতু রাজস্ব সংকটে ভুগছে, কেন্দ্রীয় ব‍্যাংকের অর্জিত মুনাফা থেকে আরও বেশি অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া যেত।" যুক্ত করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এই অধ্যাপক।

 

তবে ড. সাইফুল মনে করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের মুনাফা বৃদ্ধি পাওয়াকে ঢালাওভাব নেতিবাচক বিবেচনার সুযোগ নেই। এছাড়া কোনো ব্যাংক উচ্চ সুদে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিতে পারে না। কেননা ব্যাংক রেট নির্ধারিত থাকে। বৈদেশিক মুদ্রা বহির্দেশে বিনিয়োগ করে প্রাপ্ত মুনাফাও আগের চেয়ে বেশি, কারণ বর্তমানে বৈশ্বিক সুদের হার পূর্বের তুলনায় বেশি।