Image description

দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে রাষ্ট্রপতির পদটি শুধু একটি সাংবিধানিক নয়, ক্ষমতার পালাবদরের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীও। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রপতিরা দেশের রাজনৈতিক সংকট, সামরিক অভ্যুত্থান, সরকার পরিবর্তন এবং সাংবিধানিক টানাপোড়েনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। সেই ইতিহাসে খন্দকার মোশতাক আহমেদের নাম আওয়ামী লীগের কাছে সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়গুলোর একটি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর রাষ্ট্রপতির পদে বসে তিনি যে ভূমিকা পালন করেছিলেন, তা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক স্মৃতিতে তাকে বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীকে পরিণত করেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে সেই রাজনৈতিক স্মৃতিতে আরেকটি নাম বারবার ফিরে আসছে—মো. সাহাবুদ্দিন। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের একটি অংশের রাজনৈতিক বয়ানে রাষ্ট্রপতি হিসেবে মোশতাকের পরেই সাহাবুদ্দিনের নাম উচ্চারিত হচ্ছে। কেন এমন তুলনা? মোশতাক ও সাহাবুদ্দিনের ভূমিকা কি সত্যিই একই ধরনের ছিল? নাকি এটি মূলত আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ক্ষোভ, আস্থার সংকট এবং ক্ষমতা হারানোর অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি একটি তুলনা?

এই প্রশ্নগুলো নতুন করে সামনে এসেছে রাষ্ট্রপতি পদে সাহাবুদ্দিনের অধ্যায় শেষ হওয়ার পর। সাহাবুদ্দিন অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করার পর সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছেন। একই সঙ্গে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে এবং বিএনপির পক্ষ থেকে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রপতির পদ, অতীতের রাষ্ট্রপতিদের ভূমিকা এবং বিশেষ করে আওয়ামী লীগের দুই রাষ্ট্রপতি—মোশতাক ও সাহাবুদ্দিন—কে ঘিরে বিতর্ক আবার আলোচনায় এসেছে।

খন্দকার মোশতাক আহমেদ আওয়ামী লীগের বাইরের কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি ছিলেন না। আওয়ামী লীগের ইতিহাসের সঙ্গেই তার রাজনৈতিক জীবন গভীরভাবে যুক্ত। ১৯৪২ সালে রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার পর তিনি তৎকালীন পূর্ববঙ্গ আওয়ামী মুসলিম লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম সম্পাদক হন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিবনগর সরকারের পররাষ্ট্র, আইন ও সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভায় বিদ্যুৎ, সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং পরে বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।

আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো—সবকিছুর সঙ্গেই মোশতাকের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল। এ কারণেই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর তার রাষ্ট্রপতি হওয়া আওয়ামী লীগের কাছে শুধু ক্ষমতার পালাবদলের ঘটনা ছিল না। বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নিহত হওয়ার পর দলেরই একজন দীর্ঘদিনের নেতা রাষ্ট্রপতির পদে বসেছিলেন। ফলে মোশতাকের নামের সঙ্গে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক স্মৃতিতে যুক্ত হয়েছে বিশ্বাসভঙ্গের সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায়।

১৫ আগস্টের পর মোশতাক রাষ্ট্রপতি হন। তার সময়েই বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দায়মুক্তি দেওয়ার জন্য ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। ৩ নভেম্বর কারাগারে জাতীয় চার নেতা হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটে তার রাষ্ট্রপতিত্বের সময়। পরে ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। ১৫ আগস্ট থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত হিসাব করলে তার রাষ্ট্রপতিত্বের মেয়াদ ৮৩ দিন।

এই ৮৩ দিনই অবশ্য মোশতাকের রাজনৈতিক পরিচয়ের পুরো ব্যাখ্যা নয়। ইতিহাসে তার অবস্থান নির্ধারিত হয়েছে মূলত বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ এবং সেই হত্যাকাণ্ড-পরবর্তী রাষ্ট্রব্যবস্থার নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে। আওয়ামী লীগের কাছে মোশতাক তাই কেবল একজন সাবেক রাষ্ট্রপতি নন; তিনি দলের ভেতর থেকে উঠে আসা এমন একজন ব্যক্তি, যার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড-পরবর্তী ক্ষমতা গ্রহণের ইতিহাস সরাসরি জড়িয়ে আছে। এমনকি তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের কুশীলবদেরও একজন।

সাহাবুদ্দিনের গল্পটি ভিন্ন। তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ক্ষমতা গ্রহণ করেননি, রাষ্ট্রক্ষমতা দখলও করেননি। কিন্তু আওয়ামী লীগের ক্ষোভের জায়গাটি তৈরি হয়েছে অন্য একটি রাজনৈতিক সংকটে। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তে সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের তার মনোনয়নের কথা ঘোষণা করেন। একই বছরের ২৪ এপ্রিল দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন সাহাবুদ্দিন। তার রাষ্ট্রপতি হওয়ার রাজনৈতিক পরিচয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল—তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের মনোনীত ব্যক্তি।

এরপর এক বছরের কিছু বেশি সময়ের মধ্যেই দেশের রাজনীতিতে ঘটে যায় বড় ধরনের পরিবর্তন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর মুহূর্তে রাষ্ট্রপতি হিসেবে সাহাবুদ্দিনের ভূমিকা সামনে আসে। জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, শেখ হাসিনা তার কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন এবং তিনি তা গ্রহণ করেছেন। ওই সময় রাষ্ট্রপতির ভূমিকা, প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগপত্রের বিষয় এবং সরকার পরিবর্তনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়।

আওয়ামী লীগের ক্ষোভের প্রধান জায়গাটি এখানেই। দলের রাজনৈতিক বয়ানে প্রশ্নটি ছিল—যে ব্যক্তি আওয়ামী লীগের মনোনীত হয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে বসেছিলেন, সেই দল যখন চরম সংকটে পড়ল, তখন রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার ভূমিকা কেন দলের প্রত্যাশার সঙ্গে মিলল না? এই ক্ষোভের সঙ্গে একটি বিশেষ রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব কাজ করেছে। সাহাবুদ্দিন আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ছিলেন না। তিনি আওয়ামী লীগের মনোনীত রাষ্ট্রপতি ছিলেন। ফলে দলের ক্ষমতার পতনের সময় তার অবস্থানকে আওয়ামী লীগের একটি অংশ বিশ্বাসভঙ্গ হিসেবে দেখেছে। তাদের কাছে প্রশ্নটি শুধু সাহাবুদ্দিন কী করেছিলেন, তা নয়; তিনি কী করেননি, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

এই জায়গাতেই মোশতাকের সঙ্গে সাহাবুদ্দিনের তুলনা তৈরি হয়েছে। দুজনই আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পরিসর থেকে উঠে এসেছিলেন। দুজনই রাষ্ট্রপতির পদে বসেছিলেন আওয়ামী লীগের ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে। দুজনের ক্ষেত্রেই দলের ভেতরের মানুষ হিসেবে তাদের পরিচয় রাজনৈতিক মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু সাদৃশ্য এখানেই অনেকটা শেষ।

মোশতাক ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পর সরাসরি রাষ্ট্রপতির পদে বসেছিলেন। তার রাষ্ট্রপতিত্বের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড-পরবর্তী ক্ষমতা কাঠামো সরাসরি যুক্ত। সাহাবুদ্দিনের ক্ষেত্রে ৫ আগস্টের ঘটনা ছিল একটি গণআন্দোলন, সরকার পতন এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার নাটকীয় পরিবর্তন। তিনি সেই পরিবর্তনের সময় রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে ছিলেন, কিন্তু ক্ষমতা দখলকারী ছিলেন না। তাই ইতিহাসের বিচারে দুজনকে এক করে দেখার সুযোগ সীমিত। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক স্মৃতিতে তাদের নাম পাশাপাশি এলেও তাদের ভূমিকার প্রকৃতি এক নয়।

সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে বিতর্ক অবশ্য শুধু ৫ আগস্টের ভূমিকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগের তার ব্যাংকিং-সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তিনি ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ইসলামী ব্যাংকে এস আলম গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পরও তিনি পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকও এস আলম-নিয়ন্ত্রিত ব্যাংকগুলোর একটি ছিল। এই সম্পর্কের কারণে রাজনৈতিকভাবে তাকে এস আলম গোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইসলামী ব্যাংকের এক কর্মকর্তা ২৫১ কোটি টাকার শেয়ার অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে দুর্নীতি, প্রতারণা, জবরদস্তি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে সাহাবুদ্দিনসহ ২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করার আবেদন করেন। এতে এস আলম গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলমসহ ইসলামী ব্যাংকের কয়েকজন সাবেক পরিচালককেও আসামি করার কথা বলা হয়। আদালত অভিযোগটি গ্রহণ করে দুর্নীতি দমন কমিশনকে তদন্তের নির্দেশ দেন।

চলতি বছরের জুলাইয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানান, ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক কমিশনার হিসেবে সাহাবুদ্দিনের দায়িত্ব পালনের সময়কার দুর্নীতির অভিযোগ সরকার যাচাই করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও জানায়, সাহাবুদ্দিনকে ব্যক্তিগতভাবে লক্ষ্য করে আলাদা কোনো তদন্তের পরিকল্পনা নেই; তবে চলমান প্রাতিষ্ঠানিক তদন্তে তার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে তার ব্যক্তিগত হিসাব থেকে টাকা উত্তোলনের অনুমতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। চলতি বছরের জুনে তিনি চিকিৎসা ও পারিবারিক ব্যয়ের কথা উল্লেখ করে ৩০ লাখ টাকা উত্তোলনের আবেদন করেছিলেন। বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ অনুমতি দিয়ে ২০ লাখ টাকা উত্তোলনের সুযোগ দেয়। পরে সাহাবুদ্দিন জানান, শেষ পর্যন্ত অর্থটি তিনি নেননি। ঘটনাটি নিজে কোনো অপরাধের প্রমাণ নয়। তবে সমস্যাগ্রস্ত একটি ব্যাংকের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত আর্থিক সম্পর্কের বিষয়টি জনমনে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও সাহাবুদ্দিনকে শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ বা মিত্র হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। দ্য ইকোনমিস্ট তাকে শেখ হাসিনার অনুগত রাষ্ট্রপতি হিসেবে উল্লেখ করে তার অপসারণের দাবির বিষয়টি তুলে ধরেছিল। গত ২৪ জুলাই তার পদত্যাগের খবর প্রকাশের সময় রয়টার্স তাকে শেখ হাসিনার সাবেক মিত্র হিসেবে বর্ণনা করে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসও তাকে শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে উল্লেখ করে এবং ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তার পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভের কথা জানায়।

তবে সাহাবুদ্দিনের দাবি, তার পদত্যাগের আনুষ্ঠানিক কারণ ছিল শারীরিক ও মানসিক অসামর্থ্য। ২৪ জুলাই তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ান। হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনি জটিলতা ও বাইপাস অস্ত্রোপচারের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই পদত্যাগের কথা ভাবছিলেন এবং কোনো চাপের কারণে তিনি পদত্যাগ করেননি। অন্যদিকে রাজনৈতিক মহলে তার পদত্যাগের পেছনে চাপের কথাও আলোচিত হয়েছে। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে তাকে পদত্যাগের বার্তা দেওয়া হয়েছিল—এমন প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়।

ফলে সাহাবুদ্দিনের বিদায়কে কেবল স্বাস্থ্যগত সিদ্ধান্ত বা কেবল রাজনৈতিক চাপের ফল—কোনোটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। আনুষ্ঠানিক কারণের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও বিবেচনায় নিচ্ছেন তারা। এখন প্রশ্ন, আওয়ামী লীগের চোখে তাহলে সাহাবুদ্দিন কেন মোশতাকের পরের অবস্থানে? এর উত্তর মূলত রাজনৈতিক আস্থার সংকটে।

আওয়ামী লীগের কাছে মোশতাক ছিলেন দলের ভেতরের এমন একজন নেতা, যিনি বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। আর সাহাবুদ্দিন ছিলেন দলের মনোনীত রাষ্ট্রপতি, যার দায়িত্বকাল শেষ হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে। দুই ঘটনায় ঐতিহাসিক পার্থক্য অনেক বড় হলেও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক স্মৃতিতে একটি বিষয় মিলেছে—দলের সংকটের মুহূর্তে ‘নিজেদের মানুষ’ বলে বিবেচিত একজন রাষ্ট্রপতির ভূমিকা দলের প্রত্যাশার সঙ্গে মেলেনি।

মোশতাকের ক্ষেত্রে এই আস্থাভঙ্গ ছিল বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড-পরবর্তী ক্ষমতা গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত। সাহাবুদ্দিনের ক্ষেত্রে আস্থাভঙ্গের অভিযোগের কেন্দ্রে ৫ আগস্টের ভূমিকা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যাংকিং খাতের বিতর্ক এবং তার রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন। ফলে আওয়ামী লীগের একাংশের কাছে সাহাবুদ্দিনের নাম দ্রুতই একটি নেতিবাচক রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হয়েছে। তাকে ‘দ্বিতীয় মোশতাক’ বলা হচ্ছে।

 

রাজনীতিতে ক্ষমতার সময়ে যে ব্যক্তি ‘নিজেদের মানুষ’ হিসেবে পরিচিত হন, সংকটের সময়ে তার প্রতিটি সিদ্ধান্তই হয়ে উঠতে পারে সেই পরিচয়ের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। সাহাবুদ্দিন সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নন; কিন্তু তার রাষ্ট্রপতিত্ব আওয়ামী লীগের সামনে পুরোনো একটি প্রশ্ন নতুন করে হাজির করেছে—ক্ষমতার সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে বসানো একজন মানুষ যখন দলের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে প্রত্যাশিত অবস্থানে থাকেন না, তখন রাজনৈতিক স্মৃতিতে তার পরিচয় কত দ্রুত বদলে যেতে পারে।