কেন্ট ট্রাসকট (বাঁয়ে) টেক্সাসে যাওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করে কানাডার আটলান্টিক প্রদেশগুলো ঘুরে দেখার সিদ্ধান্ত নেন। ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ বয়কট করছেন কানাডিয়ানরা। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হিসেবে পুনর্নির্বাচনের পর তার নীতি ও কানাডাবিরোধী বক্তব্যে ক্ষুব্ধ অনেকেই। তাই যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ থেকে দূরে থাকছেন তারা।
কেউ যুক্তরাষ্ট্রের বদলে ঘুরছেন নিজের দেশেই। কেউ আবার বেছে নিচ্ছেন ইউরোপ, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন গন্তব্য।
দুই দেশের সম্পর্কের টানাপড়েনের পাশাপাশি শুল্কনীতি ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বাড়তে থাকা অনাগ্রহও এই সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে। ফলে কানাডীয় পর্যটকদের ভ্রমণের তালিকা থেকে ধীরে ধীরে বাদ পড়ছে যুক্তরাষ্ট্র।
আগে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়মিত ভ্রমণ করতেন অন্টারিওর লন্ডনের বাসিন্দা কেন্ট ট্রাসকট ও তার পরিবার। ক্যালিফোর্নিয়াসহ বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছেন তারা। সর্বশেষ ২০২৩ সালে গিয়েছিলেন নিউ ইয়র্কেও। কিন্তু ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ পুরোপুরি বয়কটের সিদ্ধান্ত নেন তারা।
এর ফলে গত বসন্তে তার ভাইয়ের সঙ্গে টেক্সাসে স্পেসএক্সের স্টারশিপ উৎক্ষেপণ দেখতে যাওয়ার পরিকল্পনাও বাতিল করেন ট্রাসকট। টরন্টো থেকে বিমানে গিয়ে গাড়ি ভাড়া করে এক সপ্তাহ থাকার পরিকল্পনা ছিল তাদের। এতে খরচ হওয়ার কথা ছিল কয়েক হাজার কানাডীয় ডলার। পরে সেই অর্থ তারা খরচ করেন কানাডাতেই। ভ্রমণের জন্য বেছে নেন নোভা স্কশিয়া ও প্রিন্স এডওয়ার্ড আইল্যান্ড।
ট্রাসকটের মতো অনেক কানাডীয়ই এখন যুক্তরাষ্ট্রের বদলে বেছে নিচ্ছেন নিজেদের দেশ কিংবা অন্য দেশের পর্যটনকেন্দ্র। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আরোপিত শুল্কসহ তাদের এই সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার বিষয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যও।
কানাডার আটলান্টিক অঞ্চল তাজা সামুদ্রিক খাবার, রঙিন বাড়ি ও ছোট ছোট নৌকার জন্য বিখ্যাতজাতীয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিলে কানাডিয়ানরা যুক্তরাষ্ট্রে সড়কপথে ভ্রমণ কিছুটা বাড়ালেও ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় ভ্রমণের সংখ্যা ছিল প্রায় ৮ লাখ কম। ২০২৪ সালে ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়ার আগে যে সংখ্যায় কানাডিয়ানরা যুক্তরাষ্ট্রে যেতেন, তার তুলনায় এই পতন উল্লেখযোগ্য।
এই বয়কটের ফলে গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের পর্যটন খাতে রাজস্ব কমেছে প্রায় ৩৩০ কোটি কানাডীয় ডলার বা ২৩৫ কোটি মার্কিন ডলারের। সেই অর্থের একটি অংশ কানাডিয়ানরা খরচ করছেন নিজেদের দেশেই। কেউ আবার যুক্তরাষ্ট্রের বদলে যাচ্ছেন বিদেশের বিভিন্ন গন্তব্যে।
কানাডিয়ান পর্যটকদের ফিরিয়ে আনতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহর ও অঙ্গরাজ্য উদ্যোগ নিয়েছে নানা প্রচার ও বিশেষ ছাড়ের। জুলাইয়ে নিউ ইয়র্ক সিটির পর্যটন কর্তৃপক্ষ কানাডিয়ান পর্যটকদের জন্য ব্রডওয়ে শোয়ের টিকিট ও হোটেল কক্ষে ৩০ শতাংশ ছাড় দেওয়ার ঘোষণা দেয়।
তবে শুধু ট্রাম্পের নীতিই নয়, কানাডীয় ডলারের দুর্বল অবস্থানও যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণকে ব্যয়বহুল করে তুলেছে অনেকের কাছে। তারপরও অনেক কানাডিয়ান মনে করছেন, দুই দেশের সম্পর্ক এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখান থেকে আগের অবস্থায় ফিরতে বড় ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন।
কেন্ট ট্রাসকট ও তার স্ত্রী আটলান্টিক কানাডায় ভ্রমণের সময় গাড়ি ভাড়া করে কাবট ট্রেইলে হাঁটেন। আটলান্টিক মহাসাগরের পাশে একটি নারী পরিচালিত রিসোর্টেও থাকেন তারা। স্থানীয় খাবারের অভিজ্ঞতাও হয়ে ওঠে তাদের ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ।
ট্রাসকট জানিয়েছেন, কবে আবার যুক্তরাষ্ট্রে যাবেন, তা তিনি জানেন না। অভিবাসনবিরোধী অভিযান, ট্রাম্পের বিভিন্ন নীতি এবং কানাডাকে নিয়ে তার বক্তব্যে তিনি হতাশ। ট্রাম্প চলে গেলেই দুই দেশের সম্পর্ক আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে যাবে, এমনটা ভাবারও সুযোগ নেই।
নিউইয়র্ক থেকে শুরু হওয়ার কথা থাকা একটি ক্রুজ ভ্রমণ বাতিল করে লিন্ডা ও জো রুশো ইতালিতে গিয়ে প্রাচীন রোমান স্থাপনা ঘুরে দেখেনটেক্সাসে প্রায় ১৯ বছর বসবাসের পর কানাডায় অবসরজীবন কাটাতে ফিরে আসেন লিন্ডা রুশো ও তার স্বামী জো। ট্রাম্পের পুনর্নির্বাচনে ক্ষুব্ধ হয়ে তারা নির্ধারিত সময়ের আগেই ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ফিরে আসেন কানাডায়।
পরে ট্রাম্প কানাডাকে ৫১তম অঙ্গরাজ্য এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোকে গভর্নর বলে উল্লেখ করার পর যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি বয়কটের সিদ্ধান্ত নেন তারা।
নিউ ইয়র্ক থেকে পানামা খাল হয়ে যাওয়ার কথা ছিল তাদের একটি ক্রুজ ভ্রমণ। সেটিও বাতিল করে একই কোম্পানির রোম ও বার্সেলোনা রুটের ক্রুজে যান তারা। সেখানে প্রাচীন স্থাপনা ঘোরা ও স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেওয়ার অভিজ্ঞতা তাদের ভালো লাগে।
রুশো বলেছেন, নিউ ইয়র্কের মানুষের দোষ না থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের সবকিছুর ওপর প্রেসিডেন্টের নীতির প্রভাব পড়ে। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার দ্বৈত নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও তারা এখন শীতের সময় ফ্লোরিডা বা অ্যারিজোনায় থাকার ‘স্নোবার্ড’ জীবনও বাদ দিয়েছেন। প্রয়োজন ছাড়া সীমান্ত পার হন না এবং সেখানে অর্থ খরচও এড়িয়ে চলেন।
যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ থেকে দূরে থাকছেন ভ্যাঙ্কুভারের অবসরপ্রাপ্ত নিক স্মিথও। ২০১৬ সালে ট্রাম্প প্রথমবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি সন্তানদের নিয়ে সিয়াটল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন জাতীয় উদ্যানে সড়কপথে ভ্রমণ বন্ধ করেছিলেন। জো বাইডেন ক্ষমতায় আসার পর আবার ভ্রমণ শুরু করলেও ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ফের তা বন্ধ করেছেন।
এমনকি অন্য দেশে যাওয়ার সময় যুক্তরাষ্ট্রের কোনো শহরে বিমান পরিবর্তন করতেও তিনি এখন অনাগ্রহী। গত শরতে বন্ধুদের সঙ্গে মেক্সিকো সিটি যাওয়ার সময় ভ্যাঙ্কুভার থেকে সরাসরি ফ্লাইট নিয়েছিলেন। চলতি বছর স্ত্রী সিলভিয়াকে নিয়ে প্রথমবার ঘুরে এসেছেন মরক্কোও। মারাকেশ, ফেজ ও এসাউইরা শহর ঘুরেছেন তারা। রমজান মাসে মুসলিমদের ধর্মীয় আচার কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা তাদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে।
মরক্কোতে গিয়ে নিক স্মিথ প্রথমবারের মতো রমজানের পরিবেশ ও আবহ অনুভব করেনস্মিথ জানিয়েছেন, ট্রাম্প হোয়াইট হাউজ ছাড়লেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যাবেন, বিষয়টি এমন নয়। কানাডার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বাস্তব পদক্ষেপ দেখতে চান তিনি।
জীবনের বিভিন্ন সময়ে অসংখ্যবার যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ করেছেন ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার পাওয়েল রিভারের বাসিন্দা ক্রিস্টি মিচেলও। জাতীয় উদ্যানে হাইকিং, আমেরিকান ফুটবল ম্যাচ দেখা এবং আরভি নিয়ে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ঘুরে ফ্লোরিডা যাওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।
কিন্তু বর্তমান প্রশাসনের নীতিতে হতাশ হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ ও কেনাকাটা বন্ধ করেছেন মিচেল। যুক্তরাষ্ট্রের বদলে নিজের দীর্ঘদিনের একটি স্বপ্ন পূরণের সুযোগ নেন তিনি। ৫০তম জন্মদিন উদ্যাপন করতে লাস ভেগাসে যাওয়ার পরিকল্পনার পরিবর্তে স্পেনে ৭৯০ কিলোমিটার দীর্ঘ ক্যামিনো ফ্রান্সেস পথ পাড়ি দিয়ে হেঁটে যান।
এই ভ্রমণে বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়াই তার কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। মিচেল জানিয়েছেন, পথে দেখা অনেক মানুষের জীবনে পরিবর্তনের সময় চলছিল। সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষের সঙ্গে গভীর ও সুন্দর কথোপকথনের সুযোগ পেয়েছেন তিনি।
মিচেল ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রে আবার যেতে চান। তবে তার জন্য হোয়াইট হাউজে নতুন নেতৃত্ব এবং কানাডা-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের পুনর্মিলন প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
সূত্র: বিবিসি