গাজীপুরের টঙ্গী পূর্ব থানার ভেতরে গ্রেপ্তার হওয়া এক বিএনপি নেতার ছবি তুলতে গিয়ে বিজয় টেলিভিশনের টঙ্গী প্রতিনিধি মোর্শেদ আলম খোকনের ওপর হামলাচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, থানার অভ্যন্তরে শৃঙ্খলা এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে টঙ্গীজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) গভীর রাতে টঙ্গী পূর্ব থানা পুলিশের এসআই বায়েজিদের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে টঙ্গী পূর্ব থানা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক বেল্লাল হোসেন সানিকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ জানায়, টঙ্গীর পাগার এলাকার জিনু মার্কেটে অস্ত্রের মহড়া ও চাঁদাবাজির একটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
জানা যায়, বুধবার সকালে আদালতে পাঠানোর জন্য গ্রেপ্তার বেল্লাল হোসেন সানিকে থানা থেকে বের করে পুলিশের গাড়িতে তোলা হচ্ছিল। এ সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা পেশাগত দায়িত্বের অংশ হিসেবে ছবি ও ভিডিও ধারণ করছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এ সময় গ্রেপ্তার ব্যক্তির কয়েকজন অনুসারী সাংবাদিকদের ছবি তুলতে বাধা দেন। একপর্যায়ে তারা বিজয় টেলিভিশনের টঙ্গী প্রতিনিধি মোর্শেদ আলম খোকনের দিকে তেড়ে গিয়ে হামলার চেষ্টা করেন। অভিযোগ রয়েছে, তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ারও চেষ্টা করা হয়।
উপস্থিত সাংবাদিকদের কয়েকজন দ্রুত এগিয়ে এসে তাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন। এতে বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়। তবে থানার ভেতরে কিছু সময় উত্তেজনা ও হট্টগোলের সৃষ্টি হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, পুরো ঘটনাটি টঙ্গী পূর্ব থানার ওসি মেহেদী হাসান এবং টঙ্গী পূর্ব থানা বিএনপির সভাপতি সরকার জাবেদ আহমেদ সুমনের সামনেই ঘটে। পরে বিএনপির সভাপতি সরকার জাবেদ আহমেদ সুমন পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন এবং বিষয়টিকে ভুল বোঝাবুঝি বলে উল্লেখ করেন। উপস্থিত সূত্রগুলোর দাবি, তিনি সাংবাদিকদের কাছেও দুঃখ প্রকাশ করেন।
ঘটনাটি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, একজন গ্রেপ্তার আসামিকে থানা থেকে বের করার সময় কীভাবে বিপুলসংখ্যক রাজনৈতিক নেতাকর্মী থানার ভেতরে অবস্থান করছিলেন। এছাড়া উপস্থিত কয়েকজনের দাবি, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে গাড়িতে তোলার সময় তার হাতে হাতকড়া ছিল না, যা নিয়েও বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ভুক্তভোগী সাংবাদিক মোর্শেদ আলম খোকন বলেন, ‘আমি প্রতিদিনের মতোই পেশাগত দায়িত্ব পালন করছিলাম। গ্রেপ্তার আসামির ছবি তুলতে গেলে কয়েকজন ব্যক্তি আমার ওপর হামলার চেষ্টা করেন এবং আমার মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ারও চেষ্টা চালান। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, ঘটনাটি ঘটেছে থানার ভেতরে। একজন সাংবাদিক হিসেবে সেখানে নিরাপত্তা পাওয়ার কথা থাকলেও আমি উল্টো হামলার শিকার হতে বসেছিলাম।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি শুধু সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করছিলাম। কোনো ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য ছিল না। অথচ আমাকে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে এবং ছবি তুলতে বাধা দেওয়া হয়েছে।’
ঘটনার সময় উপস্থিত কয়েকজন সাংবাদিকের অভিযোগ, পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ওসি মেহেদী হাসান মোর্শেদ আলম খোকনের মোবাইল ফোন নিজের কাছে নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। পরে সাংবাদিকরা থানা থেকে বের হওয়ার সময় ওসি বিষয়টিকে ‘ভুল বোঝাবুঝি’ বলে উল্লেখ করেন।
এ বিষয়ে টঙ্গী পূর্ব থানা বিএনপির সভাপতি সরকার জাবেদ আহমেদ সুমন বলেন, ‘এটি একটি ভুল বোঝাবুঝির ঘটনা। আমরা চাই না কোনো সাংবাদিকের সঙ্গে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটুক। উপস্থিত নেতাকর্মীদের শান্ত করা হয়েছে।’
স্থানীয় ব্যবসায়ী আব্দুল কাদের বলেন, ‘সাংবাদিকরা সমাজের চোখ। তাদের ওপর থানার ভেতরে হামলার চেষ্টা খুবই দুঃখজনক। নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত।’
শিক্ষক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। থানার ভেতরে এমন অভিযোগ জনগণের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করবে।’
এ বিষয়ে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) দক্ষিণ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। থানার ভেতরে এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই কাম্য নয়। অভিযোগটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’